
বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরা এখন টরন্টোয়। কানাডায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে এবং বড় বড় প্রকল্পে পুঁজি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে সরাসরি আলোচনায় অংশ নিতেই তাঁরা Canada Investment Summit-এ যোগ দিয়েছেন। কানাডায় এ ধরনের আয়োজন এই প্রথম। সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে ১২০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করে। এই বিপুল বিশ্বপুঁজির একটি অংশ কানাডার জ্বালানি, খনিজ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে আকৃষ্ট করাই এই সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইতোমধ্যে অতিথিদের স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বার্তা সহজ, লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী। কানাডার কাছে এমন সব সম্পদ, দক্ষতা ও সুযোগ রয়েছে, যার প্রয়োজন আগামী দিনের বিশ্বের। এখন সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সময়। কার্নির ভাষায়, “Canada has what the world wants.”
দুই দিনের এই সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, পেনশন ফান্ড, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ও বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরা অংশ নিচ্ছেন। অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান BlackRock-এর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী Larry Fink, Blackstone-এর প্রেসিডেন্ট ও চিফ অপারেটিং অফিসার Jon Gray, সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান Temasek Holdings-এর প্রধান নির্বাহী Dilhan Pillay, নেদারল্যান্ডসের বৃহৎ পেনশন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান APG-এর প্রধান Annette Mosman এবং অস্ট্রেলিয়ার Macquarie Group-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী Shemara Wikramanayake। তাঁদের পাশাপাশি এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় কোম্পানি ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী এবং প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীরাও সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
তাঁদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে কানাডার ১৬০টির বেশি বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প। জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, বন্দর ও পরিবহন, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনশিল্প, প্রতিরক্ষা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নানা খাতে ছড়িয়ে আছে এসব প্রকল্প। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কানাডীয় কোম্পানি ও প্রকল্প উদ্যোক্তাদের সরাসরি যুক্ত করে নতুন বিনিয়োগের পথ খুলে দেওয়াই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য।
প্রধানমন্ত্রী কার্নির লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে কানাডায় মোট এক ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। সরকার নিজেও প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ডলারের মূলধনী বিনিয়োগ ও প্রণোদনার মাধ্যমে সরকারি, বেসরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকে এগিয়ে নিতে চায়। অর্থাৎ কানাডা শুধু বিনিয়োগকারীদের ডাকছে না, তাদের সামনে প্রকল্প, অবকাঠামো, সরকারি সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সুযোগও সাজিয়ে দিচ্ছে।
কানাডার এই আহ্বানের পেছনে রয়েছে বাস্তব শক্তি। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের নিচে ছড়িয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বিপুল সম্ভার। নিকেল, তামা, ইউরেনিয়াম, পটাশ, গ্রাফাইট, টাংস্টেনসহ আধুনিক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বহু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রয়েছে এখানে। একই সঙ্গে কানাডা পরিচ্ছন্ন ও প্রচলিত দুই ধরনের জ্বালানিরই অন্যতম বড় উৎস। জলবিদ্যুৎ, পারমাণবিক শক্তি, তেল, গ্যাস, নতুন প্রজন্মের জ্বালানি প্রযুক্তি, সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশটির ভূমিকা আরও বড় হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শুধু মাটির নিচের সম্পদ নয়, কানাডার বড় শক্তি তার মানুষও। উচ্চশিক্ষিত জনশক্তি, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান, গবেষণা ও প্রযুক্তির সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য আইনি কাঠামো বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। কানাডার ১৬টি মুক্তবাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ৫১টি দেশের প্রায় দেড় বিলিয়ন ভোক্তার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার রয়েছে। ফলে কানাডায় গড়ে ওঠা ব্যবসা ও শিল্পের সামনে শুধু দেশীয় বাজার নয়, রয়েছে বিশ্বের বিশাল বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ।
কানাডার ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যখন বিশ্বের বৃহত্তম বিনিয়োগকারীদের সামনে কানাডার সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছেন, ঠিক তখনই দেশের পাঁচটি বড় ব্যাংক ৩২৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির প্রতি নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন আস্থা সাধারণ মানুষের জন্যও সাহস জাগানিয়া। এটি নতুন সম্ভাবনার বার্তা দেয়, একই সঙ্গে তুলে ধরে কানাডার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাস।
সবচেয়ে বড় ঘোষণা এসেছে TD Bank থেকে। আগামী পাঁচ বছরে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতগুলোতে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ব্যাংকটি। অগ্রাধিকার পাচ্ছে জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ শিল্প, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অবকাঠামো খাত।
TD মনে করছে, কানাডা বড় ধরনের বিনিয়োগের এক নতুন যুগে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে। ব্যাংকটির হিসাবে, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতে ৩০০টির বেশি প্রকল্পে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যে অনুমোদিত অথবা বিবেচনাধীন রয়েছে। অনুকূল পরিস্থিতিতে এই বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এরপর এসেছে Scotiabank-এর বড় ঘোষণা। কানাডীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বড় প্রকল্পের সম্প্রসারণে আগামী পাঁচ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করবে ব্যাংকটি। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, তেল ও গ্যাস, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, উন্নত উৎপাদনশিল্প, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাত থাকবে এর আওতায়।
BMO-ও কানাডার আগামী দিনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ নিয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী ১০ বছরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতে সর্বোচ্চ ৭০ বিলিয়ন ডলারের নতুন মূলধন জোগানোর পরিকল্পনা করেছে ব্যাংকটি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থা, পাইপলাইন, সড়ক, বিমানবন্দর ও টার্মিনাল, খনি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কম্পিউটিং অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা এবং তেল-গ্যাস খাত এই অর্থায়নের আওতায় থাকবে।
RBC আবার নজর দিয়েছে এমন কানাডীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দিকে, যেগুলোর ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারের বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংকটি ১.৪ বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি এবং নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি খাতে বেড়ে ওঠা কানাডীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এর মাধ্যমে মূলধন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।
CIBC-ও এগিয়ে এসেছে। কানাডার ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিরক্ষা এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ২ বিলিয়ন ডলারের মূলধন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ব্যাংকটি। ব্যাংকটির মতে, এসব খাতে বিনিয়োগ শুধু একটি শিল্পকে বড় করে না, দেশের প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক শক্তিকেও বাড়ায়।
শুধু এই পাঁচ ব্যাংকের ঘোষিত অঙ্কই ৩২৩.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একটি বিষয় পরিষ্কার, কানাডার বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দেশের ভবিষ্যতের প্রতি বড় ধরনের আস্থা দেখাচ্ছে।
এই জায়গাতেই টরন্টোর Canada Investment Summit-এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। একদিকে বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীদের সামনে কানাডার প্রকল্প ও সম্পদ তুলে ধরা হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের বড় ব্যাংকগুলোও সেই ভবিষ্যতে বিপুল অর্থ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। সরকার, প্রদেশ, ব্যাংক, পেনশন ফান্ড ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এসব উদ্যোগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগও যুক্ত হলে আগামী এক দশকে কানাডার অর্থনীতির চেহারা ব্যাপকভাবে বদলে যেতে পারে।
এসব বিনিয়োগ বাস্তবে রূপ নিলে সম্ভাবনার তালিকাও ছোট নয়। নতুন খনি চালু হবে, বন্দর সম্প্রসারিত হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে, নতুন বাণিজ্য করিডোর তৈরি হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ডেটা সেন্টার ও কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে উঠবে। কানাডীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বড় হবে, তৈরি হবে নতুন কারখানা ও উৎপাদন কেন্দ্র। এর সঙ্গে বাড়বে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় ব্যবসা, নতুন সুযোগ তৈরি হবে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য।
টরন্টোর এই সম্মেলন তাই শুধু দুই দিনের একটি ব্যবসায়িক আয়োজন নয়। এটি বিশ্বের সামনে কানাডার নতুন পরিচয় তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ।
একটি বিশাল দেশ। মাটির নিচে বিপুল সম্পদ। রয়েছে শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষ, শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও গবেষণার সক্ষমতা এবং বিশ্বের বড় বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ। এখন সেই সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিনিয়োগের দরজাও খুলে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীরা সেই দরজায় এসে পৌঁছেছেন। দেশের ব্যাংকগুলোও সঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে।
কানাডার সামনে সুযোগ এখন অপার। প্রয়োজন সেই সুযোগকে প্রকল্পে, প্রকল্পকে বিনিয়োগে এবং বিনিয়োগকে আগামী প্রজন্মের সমৃদ্ধিতে পরিণত করা।
তথ্যসূত্র:
Canada Investment Summit 2026
Reuters, Sept. 14, 2026







