সম্পাদকের পাতা

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কানাডার ধন্যবাদ দেওয়া উচিত

নজরুল মিন্টো

ডোনাল্ড ট্রাম্প

আমি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। কানাডারও উচিত তাঁকে ধন্যবাদ জানানো। গত কয়েক মাস ধরে তাঁকে নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়েছে। সবাই ধরে নিয়েছেন, তিনি কানাডাকে কোণঠাসা করতে চাইছেন। কিন্তু অঙ্কের হিসাব বলছে অন্য কথা। তিনি বরং কানাডীয়দের নিজেদের পণ্য কিনতে উৎসাহিত করেছেন। কানাডার জনপ্রিয় ‘Buy Canadian’ প্রচারণাকে এতটা সফল করে তোলার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে একটি বিশেষ অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার জন্য কানাডা সরকারের কাছে প্রস্তাব করছি।

ম্যানিটোবার হাডসন উপসাগরের তীরে অবস্থিত পোর্ট অব চার্চিল ছয় বছর পর আবার শস্য রপ্তানি শুরু করেছে। বন্দরের প্রথম জাহাজে প্রায় ৩০ হাজার টন কানাডীয় গম পাঠানো হয়েছে ইউরোপের বাজারে। ২০২৬ সালে তিনটি জাহাজে এক লাখ টনের বেশি শস্য পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই বন্দর দিয়ে জিঙ্কের ঘনীভূত আকরিক রপ্তানি শুরু হয়েছে। ম্যানিটোবায় উৎপাদিত পটাশের প্রথম চালান পাঠানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

পোর্ট অব চার্চিলের এই পুনর্জাগরণ কেবল একটি জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার খবর নয়। পশ্চিম কানাডার কৃষিপণ্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের পথ এড়িয়ে হাডসন উপসাগর হয়ে ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে। বহু বছর অবহেলিত একটি বন্দর আবার কর্মচঞ্চল হচ্ছে, রেলপথে পণ্য আসছে এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ট্রাম্পকে এখানে ধন্যবাদ না দিলে তাই হিসাবটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ম্যাপল সিরাপের বাজারেও কানাডার পতাকা আরও উঁচুতে উঠেছে। ২০২৫ সালে কানাডা ১৮ কোটি ১৩ লাখ পাউন্ড ম্যাপল সিরাপ রপ্তানি করেছে। এর মূল্য ৮৪ কোটি ৪০ লাখ কানাডীয় ডলারের বেশি। আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।

ম্যাপল সিরাপ বরাবরই কানাডার পরিচয়ের অংশ। তবে ট্রাম্পের বদৌলতে পণ্যের গায়ে থাকা লাল ম্যাপল পাতাটি নতুন অর্থ পেয়েছে। এটি এখন শুধু উৎপত্তি দেশের পরিচয় নয়, অনেক ক্রেতার কাছে অর্থনৈতিক দেশপ্রেমের প্রতীক। দোকানে একই ধরনের দুটি পণ্য থাকলে কানাডীয় ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখন নিজের দেশের পণ্যটি খুঁজছেন।

এই পরিবর্তনের আরেকটি উদাহরণ অন্টারিওর লন্ডন শহরের Black Fly Beverage Company। কানাডীয় এই পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে বড় ধরনের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১০০টি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

এর চেয়েও মজার ঘটনা হলো, যেসব মার্কিন পানীয় ব্র্যান্ড কানাডার বাজারে প্রবেশে বাধার মুখে পড়েছে, তাদের কয়েকটি এখন কানাডীয় কোম্পানি Black Fly-এর দরজায় আসছে। তারা নিজেদের পণ্য কানাডাতেই তৈরি করাতে চায়। যেসব অর্ডার একসময় যুক্তরাষ্ট্রের কারখানায় যাওয়ার কথা ছিল, ট্রাম্পের শুল্কনীতি সেগুলোর কিছু এখন কানাডার কারখানায় পাঠাচ্ছে।

অ্যালুমিনিয়ামের হিসাবটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ টন অ্যালুমিনিয়াম আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ টন সরবরাহ করে কানাডা। অঙ্ক কষতে গিয়ে ট্রাম্প এখানে যে ভুল করেছেন, তার মাশুল দিতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। কানাডায় অবস্থিত মার্কিন প্রতিষ্ঠান Alcoa বছরে প্রায় নয় লাখ টন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন করে। সেই ধাতুর বেশির ভাগ যুক্তরাষ্ট্রে নিতে প্রতিষ্ঠানটিকে এখন এক বিলিয়ন ডলারের বেশি শুল্ক গুনতে হচ্ছে।

এই অর্থ বাতাসে মিলিয়ে যায় না। পণ্যের দামের সঙ্গে তা যুক্ত হয়। অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহারকারী মোটরগাড়ি নির্মাতা, পানীয়ের ক্যান প্রস্তুতকারক, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য শিল্পকে সেই বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়। শেষ পর্যন্ত তার একটি বড় অংশ গিয়ে পড়ে মার্কিন ক্রেতার ঘাড়ে।

এখন কানাডীয় অ্যালুমিনিয়াম ইউরোপের পথে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে ইউরোপে কানাডার অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানি ২৭৬ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ ট্রাম্প কানাডার পণ্যের জন্য মার্কিন দরজা সংকুচিত করতে গিয়ে ইউরোপের বড় দরজাটি খুলে দিয়েছেন।

কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিরল ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। দলীয় অবস্থানের পার্থক্য থাকলেও কানাডার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ফেডারেল রাজনীতির প্রধান সব দল একই অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। প্রাদেশিক সরকারগুলোও ‘টিম কানাডা’ হিসেবে অটোয়ার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে। কনজারভেটিভ প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড রাজনৈতিক পার্থক্য সরিয়ে রেখে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাবেক কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারও বলেছেন, কানাডার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। লিবারেল ও কনজারভেটিভদের এমন কাছাকাছি আনার ঐতিহাসিক কাজটির জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য।

দেশের ভেতরেও বিনিয়োগের নতুন জোয়ার দেখা যাচ্ছে। টরন্টোয় অনুষ্ঠিত Canada Investment Summit থেকে কানাডীয় ব্যবসা, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বিনিয়োগ ও অর্থায়নের অঙ্গীকার এসেছে। বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশের বিনিয়োগকারীরা এতে অংশ নিয়েছেন, যাঁদের প্রতিষ্ঠানগুলোর অধীনে রয়েছে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ। এই বিশাল অঙ্গীকারের মধ্যে কানাডার পাঁচটি বড় ব্যাংকই প্রায় ৩২৫ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার জোগান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। TD দেবে ১৫০ বিলিয়ন, Scotiabank ১০০ বিলিয়নের বেশি, BMO ৭০ বিলিয়ন, CIBC দুই বিলিয়ন এবং RBC প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার।

এটি শুধু হিসাবের খাতায় লেখা প্রতিশ্রুতি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নতুন খনি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক, বন্দর, তথ্যকেন্দ্র, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা কারখানা এবং হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। কানাডার ব্যাংকগুলো দেশের শিল্প ও অবকাঠামোর পেছনে নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল অর্থের চেকগুলোতে ব্যাংকের কর্মকর্তারা সই করেছেন ঠিকই, তবে কলমে কালি ভরে দেওয়ার কৃতিত্বটি ট্রাম্প দাবি করতেই পারেন।

এক বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে দ্রুত কর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করেছে সরকার। নতুন করসুবিধার ফলে কানাডায় ব্যবসায়িক বিনিয়োগের কার্যকর করহার প্রায় ১৩ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৪ শতাংশে নামবে। এই হার যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও কম। ফলে কানাডায় নতুন কারখানা, প্রযুক্তিকেন্দ্র ও বড় অবকাঠামো নির্মাণের আকর্ষণ আরও বাড়বে।

কানাডার বন্দর খুলছে। রপ্তানি বাড়ছে। কারখানা সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন কর্মী নিয়োগের পথ তৈরি হচ্ছে। মার্ক কার্নির নেতৃত্বে কানাডা খুঁজে নিচ্ছে নতুন বাজার ও বিনিয়োগের নতুন ঠিকানা। অন্যদিকে ট্রাম্পের ‘America First’ পরীক্ষার বিল জমা হচ্ছে মার্কিন ক্রেতাদের টেবিলে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশটির খাদ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি ছিল। বাড়িতে ব্যবহারের খাবারের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং রেস্তোরাঁর খাবারের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে জ্বালানির দাম এক বছরে বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। হিসাবটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল, তা ভেবে পাঠকের হয়রান হওয়ার দরকার নেই। অঙ্কটি একেবারেই সরল।

এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কানাডার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও উঁচু পর্যায়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার ধারণা সামনে এনেছেন। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় একটি নতুন জোট গড়ার আলোচনা চলছে। কানাডা আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নিজের বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়েছে। কানাডার জন্য ইউরোপের দরজাটি এত দ্রুত খুলে দেওয়ার কৃতিত্বও ট্রাম্পকে না দিয়ে উপায় কী!

তাঁর শুল্কনীতির কারণে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন অর্ডার ও চেকবই হাতে কানাডার দরজায় কড়া নাড়তে হচ্ছে। কানাডীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বাজার খুঁজছে, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে এবং নিজেদের দেশে উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে। বহুদিন বন্ধ পড়ে থাকা বন্দরও আবার কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে।

কানাডীয়দের নিজেদের দেশে নির্মাণ, নিজেদের পণ্য কেনা এবং নিজেদের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করার প্রয়োজনটি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ভাস্কর্য লেক অন্টারিওর মাঝখানে স্থাপন করা যেতে পারে। ভাস্কর্যের হাতে থাকবে ‘Buy Canadian’ লেখা একটি ফলক।

Back to top button
🌐 Read in Your Language