
অভিবাসনের দীর্ঘ ও জটিল আবেদনপ্রক্রিয়ায় পরিবারের একজন সদস্যের নাম বাদ পড়ে গেছে। কখনো নিয়ম না বোঝা বা ভুল পরামর্শে, কখনো নথিপত্রের অভাব, পারিবারিক টানাপোড়েন কিংবা দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকায়। যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিখোঁজ স্বজনের খোঁজ মিলেছে কানাডায় আসার পর। আবার কারও সন্তান জন্মেছে আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায়, কিন্তু সময়মতো সেই তথ্য জানানো হয়নি। কারণ যা-ই হোক, কানাডার অভিবাসন আইনে নামটি বাদ পড়লে পরে সেই সদস্যকে স্পনসর করার সুযোগ আজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে যেত।
এমন কঠোর পরিণতি থেকে কিছু পরিবারকে রক্ষা করতে ২০১৯ সালে বিশেষ একটি নীতি চালু করেছিল কানাডা সরকার। গত ১০ সেপ্টেম্বর সেই নীতির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ফলে আগের আবেদনে উল্লেখ না করা স্বামী, স্ত্রী, জীবনসঙ্গী ও সন্তানকে স্পনসর করার বিশেষ সুযোগ এখন আর পাওয়া যাবে না।
ইমিগ্রেশন রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা জানিয়েছে, ২০১৯ সালের ৩১ মে থেকে ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া যোগ্য আবেদনগুলো আগের নীতিতেই নিষ্পত্তি করা হবে। তবে এরপর জমা পড়া নতুন আবেদন আর সেই বিশেষ সুযোগ পাবে না।
কানাডায় স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার আবেদনের সময় পরিবারের সব সদস্যের তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক। স্বামী, স্ত্রী, কমন-ল পার্টনার, নির্ভরশীল সন্তান এবং সেই সন্তানের নির্ভরশীল সন্তানও এর মধ্যে পড়ে। তাঁরা আবেদনকারীর সঙ্গে কানাডায় না এলেও আবেদনে তাঁদের নাম থাকতে হয় এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করতে হয়।
এই কঠোর নিয়মের উদ্দেশ্য ছিল তথ্য গোপন ও অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানো। কিন্তু পরিবারের সদস্যের নাম বাদ পড়ার সব ঘটনাই প্রতারণা নয়। বিশেষ করে শরণার্থীদের ক্ষেত্রে যুদ্ধ, নিপীড়ন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও নথিপত্রের অভাব বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে। পারিবারিক নির্যাতন, ভুল পরামর্শ কিংবা আবেদনপত্র বুঝতে না পারার কারণেও এমনটি ঘটে।
এই নিয়মের ভুক্তভোগী শুধু মূল আবেদনকারী নন, তাঁর স্বামী, স্ত্রী, জীবনসঙ্গী কিংবা সন্তানও। আজীবন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে অভিবাসন অধিকারকর্মী এবং হাউস অব কমন্সের নাগরিকত্ব ও অভিবাসনবিষয়ক স্থায়ী কমিটি উদ্বেগ জানিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দুই বছরের জন্য পরীক্ষামূলক নীতিটি চালু হয়। করোনা মহামারির সময় ২০২১ সালে এর মেয়াদ আরও দুই বছর এবং ২০২৩ সালে আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছিল।
তবে এই সুযোগ সবার জন্য ছিল না। পুনর্বাসিত শরণার্থী, কানাডায় আশ্রয় পাওয়ার পর স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া ব্যক্তি এবং পরিবারের সদস্য হিসেবে স্পনসর হয়ে আসা ব্যক্তিরাই তাঁদের আগের আবেদনে উল্লেখ না করা স্বামী, স্ত্রী, জীবনসঙ্গী বা নির্ভরশীল সন্তানকে স্পনসর করতে পারতেন।
নীতিটির মেয়াদ শেষ হলেও মানবিক ও সহানুভূতিশীল বিবেচনায় ছাড় চাওয়ার পথ খোলা রয়েছে। তবে এটি নিয়মিত স্পনসরশিপের বিকল্প নয় এবং অনুমোদনের নিশ্চয়তাও নেই। প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে যাচাই করবেন অভিবাসন কর্মকর্তা। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্বামী, স্ত্রী বা জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রভাব, পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক নির্ভরতা, কানাডার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক, স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও নিজ দেশে সম্ভাব্য দুর্ভোগ বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। কোনো শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিবেচনায় নেওয়া হবে তার সর্বোত্তম স্বার্থও। কেন ছাড় দেওয়া প্রয়োজন, তার পক্ষে কাগজপত্র ও প্রমাণ দেওয়ার দায়িত্ব আবেদনকারীর।
একটি অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে স্বামী, স্ত্রী, জীবনসঙ্গী কিংবা সন্তানকে আজীবন পরিবার থেকে দূরে রাখা কতটা ন্যায়সংগত, নীতিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। বিশেষ ছাড়টি ফিরিয়ে আনা হবে, নাকি প্রতিটি আবেদন মানবিক বিবেচনায় আলাদাভাবে যাচাই করা হবে? কানাডা সরকার শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র:
Immigration, Refugees and Citizenship Canada, September 11, 2026







