
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের ঠিক ওপারে, হাডসন নদীর পশ্চিম তীরে নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের জার্সি সিটি। একদিকে হাডসন, অন্যদিকে হ্যাকেনস্যাক নদী। দুই নদীর মাঝখানে গড়ে ওঠা শহরটি আয়তনে খুব বড় নয়, মাত্র ১৫ বর্গমাইলের মতো। তবু এখানে বাস করেন তিন লাখের বেশি মানুষ। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসীদের বসতি এই শহরে।
এই বহুজাতিক শহরের সামিট অ্যাভিনিউতে রয়েছে ছোট্ট একটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ। নাম Korai Kitchen। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এর ভেতরের রান্নাঘর থেকেই বাংলাদেশের ঘরোয়া খাবার পৌঁছে গেছে আমেরিকার মূলধারার খাদ্যআলোচনায়। রান্নাঘরে কড়াই চড়েছে। সরিষার তেলের গন্ধে মিশে আছে কাঁচামরিচের ঝাঁজ। কোথাও ভর্তা তৈরি হচ্ছে, কোথাও রুই মাছ ভাজা হচ্ছে, কোথাও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে মুরগির রোস্ট। আর মৌসুম এলে পেছনের ছোট্ট জায়গায় ফলানো লাউও চিংড়ির সঙ্গে উঠে যায় কড়াইয়ে।
এ রান্নাঘরের প্রধান মানুষটির হাতে কোনো নামী রন্ধনশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদ নেই। বড় কোনো হোটেলের রান্নাঘরে কাজ করার অভিজ্ঞতাও নেই। তাঁর সবচেয়ে বড় বিদ্যালয় ছিল নিজের সংসার। স্বামী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন ও অতিথিদের জন্য কয়েক দশক ধরে রান্না করতে করতেই তাঁর হাতে গড়ে উঠেছে সেই স্বাদ।
তাঁর নাম নূর-ই গুলশান রহমান। পাশে আছেন তাঁর মেয়ে নূর-ই ফারহানা রহমান। মা-মেয়ে মিলে গড়ে তুলেছেন Korai Kitchen। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু করা এই ছোট্ট রেস্তোরাঁ এখন শুধু জার্সি সিটির পরিচিত নাম নয়, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি খাবারেরও একটি স্বতন্ত্র পরিচয়। ২০২৫ সালে The New York Times রেস্তোরাঁটিকে তিন-তারকা স্বীকৃতি দেয়। পরের বছর, ২০২৬ সালে, পত্রিকাটির America’s Best Restaurants তালিকাতেও জায়গা করে নেয় Korai Kitchen।
গুলশান রহমান ১৯৮৬ সালে ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। অভিবাসী জীবনের চেনা সংগ্রাম ছিল তাঁর পরিবারেও। সংসার চালাতে তাঁর স্বামী নানা কাজ করেছেন। পরে দুজনেই ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। গুলশান কখনও হাতে তৈরি ঘরসজ্জার জিনিস বানিয়েছেন, কখনও গয়নার নকশার কাজ করেছেন, আবার স্বামীর কনভেনিয়েন্স স্টোরও সামলেছেন। রেস্তোরাঁ ব্যবসা তখনও তাঁদের চিন্তার অনেক বাইরে।
তাঁর রান্নার গল্প শুরু হয়েছিল আরও আগে, বাংলাদেশে। বিয়ের পর মাত্র ১৬ বছর বয়সে রান্নাঘরের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত সখ্য গড়ে ওঠে। প্রথম দিকের রান্না সব সময় যে সফল হতো, তা নয়। একবার শ্বশুরের জন্য এমন ডিমের তরকারি করেছিলেন, যা তাঁর নিজের ভাষায় প্রায় খাওয়ার অযোগ্য হয়েছিল। শ্বশুর অবশ্য নববধূর মন রাখতে সেটিও খেয়েছিলেন। অর্ধশতাব্দী পরে সেই একই নারী আমেরিকার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রন্ধনস্বীকৃতির তালিকায় নিজের নাম দেখবেন, তখন কি কেউ ভেবেছিল?
গুলশানের সন্তানদের বন্ধুরা তাঁর রান্না খেয়ে প্রায়ই বলত, ‘আন্টি, আপনার একটা রেস্তোরাঁ খোলা উচিত।’ প্রথমে তিনি কথাগুলো সৌজন্য হিসেবেই নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার পরও একই কথা বলে গেছে। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে তিনি ছোট পরিসরে ক্যাটারিং শুরু করেন। মানুষ বারবার তাঁর রান্নার কাছে ফিরে আসতে থাকে। সেখান থেকেই বাড়তে থাকে সাহস।
২০১৮ সালে যখন Korai Kitchen খোলা হলো, গুলশানের বয়স তখন ৬১। মা-মেয়ের কারওই রেস্তোরাঁ চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না। ফারহানা কাজ করতেন ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতে। পরিকল্পনা ছিল, কয়েক সপ্তাহ মাকে সাহায্য করবেন; পরে একজন জেনারেল ম্যানেজার পাওয়া গেলে নিজের কাজে ফিরে যাবেন। কিন্তু আর ফেরা হয়নি।
প্রথম সপ্তাহান্তে বিশেষ প্রচারের কারণে রেস্তোরাঁ ভরে গেল। মনে হলো, শুরুটাই বুঝি সফল। কিন্তু তার পরই হঠাৎ খদ্দের কমে গেল। ফারহানার মনে প্রশ্ন উঠল, তাঁরা কি ভুল করে ফেলেছেন? অন্যদিকে মা রান্নাঘরে গান শুনতে শুনতে আনন্দ করে রান্না করে যাচ্ছেন। মেয়ের হিসাব বলছে সাবধান হতে হবে, মায়ের মন বলছে এগিয়ে যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো মায়ের বিশ্বাসই।
মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে লাগল Korai Kitchen-এর কথা। কেউ ওয়াশিংটন ডিসি থেকে গাড়ি চালিয়ে খাবার খেতে এলেন। কেউ আবার নিউইয়র্কের JFK-এর বদলে Newark বিমানবন্দরে নামার পরিকল্পনা করলেন, যাতে ফেরার পথে Korai Kitchen থেকে খাবার নিয়ে যেতে পারেন। এক সময় সপ্তাহান্তে খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত। তবে এই সাফল্যের বড় কারণ শুধু ভালো রান্না নয়। মা-মেয়ে শুরু থেকেই ঠিক করেছিলেন, বাংলাদেশি খাবারকে তাঁরা অন্য কোনো পরিচয়ের আড়ালে রাখবেন না।
আমেরিকায় বহু বছর ধরে বাংলাদেশি মালিকানাধীন অনেক রেস্তোরাঁ ‘Indian restaurant’ পরিচয়ে ব্যবসা করেছে। বাজারের বাস্তবতায় তার ঐতিহাসিক কারণও ছিল। কিন্তু গুলশান ও ফারহানা বেছে নিলেন অন্য পথ। তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মজার স্লোগান হয়ে উঠল #NoChickenTikkaMasala। অর্থাৎ এখানে মিলবে সেই খাবার, যা বাংলাদেশের ঘরের টেবিলে উঠে আসে—ভর্তা, ডাল, মাছ, সবজি, খিচুড়ি, মুরগির রোস্ট, চিংড়ি, মাংস। এমনকি Uber Eats ও Yelp-এ আলাদা ‘Bangladeshi’ বিভাগ রাখার বিষয়েও তাঁরা উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি সহজ: খাবারের সঙ্গে দেশের নামটিও যেন হারিয়ে না যায়।
Korai Kitchen-এ খাবার পরিবেশনও যেন বাংলাদেশের কোনো ঘরে দাওয়াত খাওয়ার স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। এখন তাদের সীমিত ডাইন-ইন আয়োজনের নাম Amma’s Dawat। শুক্রবার ও শনিবার রাতে তিন ঘণ্টার এই আয়োজনে একের পর এক পদ পরিবেশন করা হয়। ‘দাওয়াত’ শব্দটির অর্থও অতিথিদের বুঝিয়ে দেন ফারহানা। এখানে শুধু খাবার বিক্রি করা হয় না; বাংলাদেশি খাবার কীভাবে খেতে হয়, ভাতের সঙ্গে ভর্তা বা ডাল কীভাবে মেশে, এমনকি হাত দিয়ে খাওয়ার সংস্কৃতিও তুলে ধরা হয়।
তারপর এলো ২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। সেদিন সকালে ফারহানা ফোন করলেন মাকে। ফোনে মেয়ে কাঁদছেন শুনে গুলশান ভয় পেয়ে গেলেন। নিশ্চয়ই কোনো খারাপ খবর। কিন্তু কান্নাটা ছিল আনন্দের। James Beard Foundation-এর ২০২৪ সালের Best Chef: Mid-Atlantic বিভাগের সেমিফাইনালিস্টদের তালিকায় উঠে এসেছে Nur-E Gulshan Rahman-এর নাম। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যজগতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতিগুলোর একটি James Beard Awards। তালিকায় নিজের নাম দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি তাঁরা। আনুষ্ঠানিক তালিকায়ও Korai Kitchen-এর পাশে রয়েছে তাঁর নাম।
ঘটনার সবচেয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার মতো অংশটি ঘটেছিল সেই রাতেই। এত ফোন, এত অভিনন্দন, এত ব্যস্ততার মধ্যে সবাইকে খাওয়ানোর পর নিজের জন্য আর রান্না করার সময় পাননি গুলশান। যে নারী রান্না করে এত বড় স্বীকৃতি পেলেন, তিনি সেদিন রাতের খাবারে খেলেন এক বাটি সিরিয়াল।
এরপর স্বীকৃতির পরিধি আরও বড় হয়েছে। ২০২৫ সালে The New York Times-এর প্রধান রেস্তোরাঁ সমালোচক Ligaya Mishan Korai Kitchen-কে তিন-তারকা স্বীকৃতি দেন। ভর্তা, বেগুন ভাজা, রুই মাছ, কাবাব, বিফ কারি ও মুরগির রোস্ট তাঁর প্রশংসা কুড়ায়। একই বছর গুলশানের লাউ চিংড়ি The New York Times-এর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সেরা খাবারের তালিকায় জায়গা করে নেয়। মজার বিষয় হলো, সেই লাউয়ের কিছু আসে রেস্তোরাঁর পেছনের ছোট্ট জায়গায় ফলানো গাছ থেকে।
আর ২০২৬ সালে এই পথচলা পৌঁছাল আরেক ধাপে। The New York Times তাদের America’s Best Restaurants 2026 তালিকায় Korai Kitchen-কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ছোট্ট এই বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ সম্পর্কে পত্রিকাটি লিখেছে, এখানে মরিচ ও সরিষার তেলের স্বাদ স্পষ্ট, আর রান্নায় প্রতিটি চালের দানার দিকেও থাকে যত্নশীল নজর।
Korai Kitchen-এর এই পথচলা তাই শুধু একটি সফল রেস্তোরাঁর কাহিনি নয়। এটি এমন এক অভিবাসী নারীর কাহিনি, যিনি ষাট পেরিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। এটি এমন এক মায়ের কাহিনি, যাঁর পেশাগত রন্ধনশিক্ষা ছিল না, কিন্তু ছিল পঞ্চাশ বছরের রান্নাঘরের অভিজ্ঞতা। এটি এমন এক মেয়ের কাহিনি, যিনি নিজের পেশার পথ বদলে মায়ের স্বপ্নকে ব্যবসায় রূপ দিয়েছেন। আর এটি বাংলাদেশের ঘরের সাধারণ খাবারেরও কাহিনি—যে খাবারকে পশ্চিমা রুচির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বদলে ফেলার বদলে তারা বলেছে, বাংলাদেশি খাবারকে তার নিজের পরিচয়েই চিনতে হবে।
গুলশান রহমান একবার বলেছিলেন, সবার মধ্যেই একজন রাঁধুনি আছে। তিনি যদি পারেন, অন্যরাও পারে। কথাটি রান্নার চেয়েও বড়। জীবনে নতুন কিছু শুরু করার জন্য সব সময় অল্প বয়স, বড় পুঁজি, নামী ডিগ্রি কিংবা দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা লাগে না। কখনও কখনও প্রয়োজন হয় নিজের জানা কাজটির মূল্য বুঝতে পারা, আর সময় পেরিয়ে গেলেও শুরু করার সাহস রাখা।
৬১ বছর বয়সে যে নারী একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে দাঁড়িয়েছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর নাম পৌঁছে গেছে James Beard-এর তালিকায়, The New York Times-এর পাতায় এবং আমেরিকার সেরা রেস্তোরাঁগুলোর আলোচনায়। আর তাঁর হাত ধরে লাউ চিংড়ি, ভর্তা, রুই মাছ ও মুরগির রোস্টও যেন নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে একটি দেশকে, বাংলাদেশকে।
তথ্যসূত্র:
The New York Times
James Beard Foundation







