সম্পাদকের পাতা

জাকির হত্যা মামলার আড়ালে কে এই শিবলি খান?

নজরুল মিন্টো

জাকির হাসান হত্যা মামলায় শিবলি খানের ভূমিকা ও আদালতের নথি
১৯৮৭ সালের হিউস্টন হত্যা মামলায় সৈয়দ রব্বানীর পাশাপাশি শিবলি খানের নামও আদালতের নথিতে উঠে আসে।

জাকির হাসানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে লিখতে গিয়ে একটি নাম বারবার ফিরে আসে। সৈয়দ মোহাম্মদ রব্বানী। আদালত, আপিল, মৃত্যুদণ্ড, হারিয়ে যাওয়া রিট, তিন দশকের অপেক্ষা, সবকিছু মিলিয়ে রব্বানীর নামই শেষ পর্যন্ত এই মামলার সবচেয়ে পরিচিত নাম হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই একই আদালতের নথি খুললে আরেকটি নাম প্রায় সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে আসে। শিবলি খান।

জাকির হাসানের গল্পে তিনি কোনো পার্শ্বচরিত্র নন। হত্যার রাত থেকে শুরু করে লুইজিয়ানা যাত্রা, নিউইয়র্কে অস্ত্রসহ দেখা যাওয়া, আবার হিউস্টনে ফেরা, গ্রেপ্তার, এমনকি কে সরাসরি গুলি চালিয়েছিল সেই প্রশ্ন পর্যন্ত শিবলি খানের উপস্থিতি ছড়িয়ে আছে পুরো মামলাজুড়ে। অথচ চার দশক পর এসে তাঁর নাম নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটিই থেকে গেছে: শেষ পর্যন্ত শিবলি খানের কী হয়েছিল?

এই লেখা তাই জাকির হাসান হত্যা ও সৈয়দ রব্বানীকে নিয়ে আগের প্রতিবেদনেরই ধারাবাহিকতা। আগের লেখায় ছিল ২৮ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি অভিবাসীর অসমাপ্ত আমেরিকান স্বপ্ন এবং মাত্র কয়েকশ ডলারের ডাকাতি কীভাবে তাঁর জীবন শেষ করে দিয়েছিল। এবার সেই ঘটনার আরেক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে খোঁজা। আদালতের নথিতে যাঁর নাম বারবার এসেছে রব্বানীর সহযোগী হিসেবে, কখনও সম্ভাব্য সরাসরি শ্যুটার হিসেবে, কখনও পালিয়ে যাওয়া সঙ্গী হিসেবে, তিনি শিবলি খান।

ঘটনার শুরু ১৯৮৭ সালের ১ নভেম্বর। হিউস্টনের Quick-n-Easy কনভেনিয়েন্স স্টোরে সকালে পাওয়া যায় মোহাম্মদ জাকির হাসানের মরদেহ। তিনি দোকানের পেছনের বাথরুমের মেঝেতে রক্তের মধ্যে পড়ে ছিলেন। খুব কাছ থেকে তিনটি গুলি করা হয়েছিল তাঁকে। আদালতে পরে সাক্ষ্য আসে, জাকির ছিলেন পরিশ্রমী ও মিতব্যয়ী এবং একদিন নিজের একটি কনভেনিয়েন্স স্টোর কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছিলেন।

তদন্তের একপর্যায়ে সামনে আসে সৈয়দ রব্বানী ও শিবলি খানের নাম। তাঁদের দুজনকেই চিনতেন হাসানুর রহমান। আদালতে রহমান বলেন, শিবলি নিয়মিত তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের চাবি ধার নিতেন, সেখানে গিয়ে টেলিভিশন দেখতেন, বিয়ার পান করতেন। রব্বানীও প্রায় সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকতেন। অর্থাৎ রব্বানী ও শিবলির সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ, এবং অন্তত আদালতের সাক্ষ্য অনুযায়ী তাঁরা প্রায়ই একসঙ্গে চলাফেরা করতেন।

হত্যার রাতেই শিবলি খানের আচরণ নিয়ে প্রথম অস্বাভাবিক তথ্যটি আসে। রাত দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে তিনি হাসানুর রহমানের বাসায় গিয়ে অস্বাভাবিক জোরে দরজায় ধাক্কা দেন এবং নাম ধরে ডাকতে থাকেন। রহমান দরজা খোলেননি। পরে গ্র্যান্ড জুরির সামনে তিনি বলেন, বাইরে শিবলির সঙ্গে রব্বানীর কণ্ঠও শুনেছিলেন।

কয়েক দিন পর জাকিরের হত্যার খবর জানার পর রহমান দুজনকে জিজ্ঞেস করেন। তাঁর সাক্ষ্য অনুযায়ী, রব্বানীকে তখন নার্ভাস দেখাচ্ছিল। তিনি রহমানকে বলেন, “তুমি এতে জড়িয়ো না।” একই সপ্তাহে আবার আলোচনা হলে, তখন রব্বানী ও শিবলি দুজনই অনেক বিয়ার পান করেছিলেন। রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, রব্বানী শেষ পর্যন্ত বলেন, তিনি ও শিবলি Quick-n-Easy দোকানে ছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের মামলায় আরও বলা হয়, রব্বানী রহমানকে জানিয়েছিলেন, তাঁরা জাকিরের দোকানে ডাকাতির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জাকির নিজের দোকান কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছেন, সেটিও তাঁরা জানতেন। পরে তাঁরা বুঝতে পারেন, জাকির তাঁদের চিনে ফেলেছেন। তিনি বেঁচে থাকলে পরিচয় বলে দিতে পারবেন। তখন তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রহমানের সাক্ষ্য অনুযায়ী, জাকির বিপদ টের পেয়ে কাউন্টারের নিরাপত্তা বোতাম চাপার চেষ্টা করেন। এরপর রব্বানী ও শিবলি তাঁকে কুলারের দিকে তাড়া করে গুলি করেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাকিরকে সরাসরি কে গুলি করেছিল, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তরও কখনও পাওয়া যায়নি। টেক্সাসের আদালত রব্বানীর মামলায় জুরিকে দুটি সম্ভাব্য তত্ত্ব বিবেচনার সুযোগ দিয়েছিল। রব্বানী নিজে গুলি করে থাকতে পারেন, আবার শিবলি গুলি চালিয়ে থাকতে পারেন এবং রব্বানী সহযোগী হিসেবে যুক্ত থাকতে পারেন। টেক্সাসের ‘ল অব পার্টিজ’ বা সহযোগী দায়বদ্ধতার আইনে একজন নিজে গুলি না চালালেও হত্যাকাণ্ডে সহায়তা বা সহযোগিতা করলে একই অপরাধে দোষী হতে পারেন। জুরি রব্বানীকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল, কিন্তু সরাসরি কে ট্রিগার টেনেছিল তা আলাদা করে নির্ধারণ করেনি।

হত্যার পর রব্বানী ও শিবলির চলাফেরা মামলাটিকে আরও জটিল করে তোলে। নিজের নিরাপত্তার ভয়ে হাসানুর রহমান পুলিশকে কিছু জানাননি। কিন্তু ৯ নভেম্বর তিনিই দুজনকে গাড়িতে করে লুইজিয়ানা নিয়ে যান এবং একটি গ্রেহাউন্ড বাসস্টেশনে নামিয়ে দেন। সেখান থেকে রব্বানী ও শিবলি নিউইয়র্কের টিকিট কাটেন।

২৩ নভেম্বর ব্রুকলিনে তাঁদের দেখা হয় মোহাম্মদ আবদুস সালামের সঙ্গে। আদালতে সালাম বলেন, সেদিন রব্বানী ও শিবলির কাছে দুটি পিস্তল দেখেছিলেন। পরে যখন আবার দেখেন, রব্বানীর হাতে অস্ত্র ছিল না, কিন্তু শিবলির কাছে একটি পিস্তল তখনও ছিল। একই দিন সালাম নিজের সদ্য কেনা খালি ব্রিফকেসের ভেতরে একটি বন্দুক খুঁজে পান। আগেই রব্বানী তাঁর কাছে ব্রিফকেসটি কোথায় রাখা এবং তালার নম্বর জানতে চেয়েছিলেন। সালাম অস্ত্রটি নিউইয়র্ক পুলিশের কাছে জমা দেন, পরে সেটি হ্যারিস কাউন্টির তদন্তকারীদের কাছে পাঠানো হয়।

২৬ নভেম্বর রব্বানী ও শিবলি আবার হিউস্টনে ফিরে আসেন। প্রথমে যান হাসানুর রহমানের বাসায়, পরে কয়েক দিন থাকেন সাজেদুল চৌধুরীর বাসায়। তাঁদের আচরণে সন্দেহ হওয়ায় ১ ডিসেম্বর সাজেদুল পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ আসছে শুনে দুজন কাপড়চোপড় নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু বাইরে পুলিশ অপেক্ষা করছিল। নিউইয়র্কের নম্বরপ্লেট লাগানো একটি গাড়িতে চলে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর অস্ত্র নিয়ে যে তথ্য বেরিয়ে আসে, সেখানে শিবলির নাম আবার সামনে আসে। রব্বানী পুলিশকে বলেন, তাঁদের কাছে দেখতে প্রায় একই ধরনের দুটি অস্ত্র ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিবলির নির্দেশে ৩০ নভেম্বর দ্বিতীয় অস্ত্রটি একটি কনভেনিয়েন্স স্টোরের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। রব্বানীর দেওয়া মানচিত্র ধরে পুলিশ সেখান থেকে .৩৮ ক্যালিবারের Rohm রিভলভার ও একজোড়া গ্লাভস উদ্ধার করে। ফরেনসিক পরীক্ষায় জাকিরের বুক থেকে পাওয়া গুলিটি ওই অস্ত্র থেকেই ছোড়া হয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞ আদালতে মত দেন। নিউইয়র্কে পাওয়া অস্ত্রটিও ছিল একই ধরনের .৩৮ ক্যালিবার Rohm রিভলভার।

শিবলি খানকে ঘিরে রহস্য এখানেই শেষ হয় না। জাকির হত্যার প্রায় এক মাস পর আরেকটি ভয়াবহ মৃত্যুর তথ্য রব্বানীর সাজা নির্ধারণের সময় আদালতে ওঠে। খায়রুল কবির নামে এক ব্যক্তিকে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের বাথরুমে মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর দুই হাত পেছনে হাতকড়া পরানো ছিল। আগের দিন শিবলি তাঁর বাসায় গিয়েছিলেন। খায়রুলের বন্ধু মইনুদ্দিন সালেহ বলেন, শিবলি চলে যাওয়ার পর খায়রুল জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলেছিলেন, “পিন্টু বাইরে আছে।” আদালতের নথিতে ‘পিন্টু’ বলতে রব্বানীকেই বোঝানো হয়েছে। তবে এই তথ্য যতই রহস্য তৈরি করুক, প্রকাশিত রায়ে শিবলি বা রব্বানীকে খায়রুল কবির হত্যায় দোষী সাব্যস্ত করার কোনো তথ্য নেই।

তাই ঘটনাটি সন্দেহ বা প্রেক্ষাপট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রমাণিত দায় হিসেবে নয়।তারপরই শিবলি খানের গল্প যেন প্রকাশ্য নথিতে হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যায়।

রব্বানীর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৮৮ সালে তিনি মৃত্যুদণ্ড পান। ১৯৯৪ সালে তাঁর পক্ষে রিট আবেদন করা হয়। সেই আবেদন প্রায় ২৮ বছর ঝুলে থাকে। পরে ২০২৩ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়। গুরুতর মানসিক ও শারীরিক অসুস্থ অবস্থায় তিনি এখনও কারাগারে। তাঁর মামলা নিয়ে আদালত, সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার মহলে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।

শিবলি খানকে নিয়ে এমন ধারাবাহিক নথি সামনে নেই। তবে প্রকাশ্য রেকর্ড থেকে অন্তত এটুকু জানা যায়, Shibli Ahmed Khan নামে ২০০৫ সালে দুটি পৃথক দণ্ড-পরবর্তী রিট আবেদন টেক্সাস কোর্ট অব ক্রিমিনাল আপিলসে যায়। আদালত উভয় আবেদনই শুনানি ছাড়াই এবং আলাদা লিখিত মতামত না দিয়ে খারিজ করে দেয়। দুই রিটের সঙ্গে যুক্ত ছিল দুটি ভিন্ন হ্যারিস কাউন্টি trial-court cause number, 508742-A এবং 489733-A। এতে বোঝা যায়, তাঁর নামে অন্তত দুটি আলাদা বিচারিক বিষয় ছিল। কিন্তু প্রকাশ্য এন্ট্রিতে অপরাধের নাম, সাজা কিংবা ওই মামলাগুলোর কোনটি জাকির হাসান হত্যা মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, তা পরিষ্কার নয়।

এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মানে শিবলি খান ১৯৮৭ সালের ঘটনার পর সম্পূর্ণভাবে নথি থেকে হারিয়ে যাননি। অন্তত ২০০৫ সাল পর্যন্ত তাঁর নামে দণ্ড-পরবর্তী আইনি কার্যক্রম চলছিল। কিন্তু এরপরের প্রশ্নগুলো এখনও উত্তরহীন। তিনি কোন মামলায় কী সাজা পেয়েছিলেন? জাকির হত্যা মামলায় তাঁর আলাদা বিচার হয়েছিল কি না? কারাগারে কত বছর ছিলেন? কখনও মুক্তি পেয়েছিলেন কি না? তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল কি না? তিনি এখনও জীবিত কি না? প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য নথি এসবের স্পষ্ট উত্তর দেয় না।

তথ্যসুত্র:
Harris County court records
Texas Court of Criminal Appeals
Houston Landing




FAQ

১. জাকির হাসান কে ছিলেন?

মোহাম্মদ জাকির হাসান ছিলেন বাংলাদেশি অভিবাসী, যিনি হিউস্টনের Quick-n-Easy কনভেনিয়েন্স স্টোরে কাজ করতেন। ১ নভেম্বর ১৯৮৭ তাঁকে দোকানের পেছনের বাথরুমে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।

২. শিবলি খান কে ছিলেন?

আদালতের নথিতে শিবলি খানকে সৈয়দ রব্বানীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাকির হাসান হত্যা মামলায় তাঁর চলাফেরা, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অস্ত্র-সংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

৩. জাকির হাসানকে কি শিবলি খান গুলি করেছিলেন?

এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। রব্বানীর বিচারে জুরিকে এমন একটি তত্ত্ব বিবেচনা করতে দেওয়া হয়েছিল যেখানে শিবলি গুলি চালিয়ে থাকতে পারেন; কিন্তু সাধারণ রায়ে জুরি আলাদা করে নির্ধারণ করেনি কে ট্রিগার টেনেছিল।

৪. সৈয়দ রব্বানীর কী হয়েছিল?

১৯৮৮ সালে তিনি মৃত্যুদণ্ড পান। ২০২৩ সালে টেক্সাসের সর্বোচ্চ ফৌজদারি আদালত মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে এবং নভেম্বরে তাঁকে প্যারোলের সম্ভাবনাসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পুনঃসাজা দেওয়া হয়।

৫. শিবলি খান এখন কোথায়?

প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য রেকর্ড থেকে তাঁর বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ২০০৫ সালে তাঁর নামে অন্তত একটি দণ্ড-পরবর্তী হেবিয়াস করপাস আবেদন টেক্সাস কোর্ট অব ক্রিমিনাল আপিলসে নথিভুক্ত হয়েছিল।

৬. শিবলি খান কি জাকির হাসান হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন?

উপলব্ধ রব্বানী মামলার প্রকাশিত রায় থেকে তাঁর পৃথক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না। তাই তাঁর চূড়ান্ত সাজা সম্পর্কে অতিরিক্ত দাবি করার আগে আলাদা trial-court record প্রয়োজন।

Back to top button
🌐 Read in Your Language