সম্পাদকের পাতা

অবসরের বয়সে শুরু হওয়া এক সাম্রাজ্যের নাম KFC

নজরুল মিন্টো

পঁয়ষট্টি বছর বয়সে অনেকেই কাজ গুটিয়ে বিশ্রামের কথা ভাবেন। কিন্তু সেই বয়সে একজন মানুষ বিশ্রামের বদলে গভীর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হলেন। বহু বছর ধরে চালানো তাঁর রেস্তোরাঁটি ক্রেতা হারাতে শুরু করল। একসময় ব্যবসাটি বিক্রি করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় রইল না। হাতে ছিল সামান্য সঞ্চয়, সীমিত পেনশনের অর্থ, একটি পুরোনো গাড়ি, কয়েকটি প্রেসার কুকার এবং নিজের তৈরি বিশেষ মসলা। চাইলে তিনি এখানেই থেমে যেতে পারতেন। কিন্তু থামলেন না। গাড়িতে চড়ে বেরিয়ে পড়লেন এক রেস্তোরাঁ থেকে আরেক রেস্তোরাঁয়, নতুন সম্ভাবনার খোঁজে। রেস্তোরাঁর কিচেনে ঢুকে নিজের তৈরি মসলা ও বিশেষ কৌশলে মুরগি ভেজে মালিকদের খাওয়াতেন। খাবারটি পছন্দ হলে তিনি প্রস্তাব দিতেন, তাঁর মসলা ও রান্নার কৌশল ব্যবহার করে তাঁরা মুরগি বিক্রি করবেন। বিনিময়ে বিক্রি হওয়া প্রতিটি মুরগির জন্য তাঁকে সামান্য অর্থ দেবেন।

এই মানুষটির পরিচয় তখনো ছড়িয়ে পড়েনি। আজ তাঁর সাদা স্যুট, কালো বো টাই ও সাদা দাড়ির মুখটি বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবসায়িক প্রতীকগুলোর একটি। তাঁর নাম কর্নেল হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স। তবে তিনি সেনাবাহিনীর কর্নেল ছিলেন না। ‘কেন্টাকি কর্নেল’ ছিল অঙ্গরাজ্যের দেওয়া একটি সম্মানসূচক উপাধি। যে মানুষটিকে আমরা এখন একটি বহুজাতিক খাদ্যসাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে চিনি, তাঁর জীবনের বড় অংশ কেটেছে কাজ বদলাতে বদলাতে এবং বারবার নতুন করে শুরু করতে।

স্যান্ডার্সের জন্ম ১৮৯০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের হেনরিভিলের কাছে। পাঁচ বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান। সংসার চালাতে মা বাইরে কাজে যেতেন, আর ছোট হারল্যান্ডকে দুই ভাইবোনের দেখাশোনার পাশাপাশি রান্নাও করতে হতো। খুব অল্প বয়সেই রুটি, সবজি ও মাংস রান্না শিখে ফেলেন তিনি। তেরো বছর বয়সে বিদ্যালয় ছেড়ে খামারে কাজ নেন। এরপর কখনো ট্রামের কর্মী, কখনো রেলওয়ের ফায়ারম্যান, কখনো বীমা বিক্রেতা, কখনো ফেরি পরিচালনাকারী, কখনো টায়ার বিক্রেতা হয়েছেন। কোনো কাজই তাঁকে দীর্ঘস্থায়ী নিশ্চয়তা দেয়নি।

চল্লিশ বছর বয়সে তাঁর জীবনে রান্না আবার ফিরে আসে। ১৯৩০ সালে কেন্টাকির করবিনে একটি সড়কের পাশে সার্ভিস স্টেশন পরিচালনার সময় তিনি পথচারী ও গাড়িচালকদের জন্য খাবার তৈরি শুরু করেন। শুরুতে আলাদা কোনো রেস্তোরাঁ ছিল না। নিজের ডাইনিং টেবিলেই অতিথিদের বসিয়ে খাবার পরিবেশন করতেন। তাঁর রান্নার খবর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ শুধু গাড়িতে জ্বালানি নিতে নয়, স্যান্ডার্সের খাবার খেতেও সেখানে থামতে শুরু করে।

সমস্যা ছিল সময়। প্রচলিত পদ্ধতিতে মুরগি ভাজতে বেশ সময় লাগত। আগে থেকে ভেজে রাখলে স্বাদ নষ্ট হতো, আর অর্ডারের পর রান্না করলে ক্রেতাকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতো। স্যান্ডার্স তাই প্রেসার কুকারে মুরগি ভাজার এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেন, যাতে তুলনামূলক কম সময়ে রান্না হলেও ভেতরের কোমলতা ও বাইরের মচমচে ভাব বজায় থাকে। ১৯৩৯ সালের দিকে তিনি ১১ ধরনের ভেষজ ও মসলার মিশ্রণও চূড়ান্ত করেন। রেসিপিটি গোপন রাখা হয়েছিল, কিন্তু এর স্বাদ দ্রুত মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।

১৯৫২ সালে উটাহ অঙ্গরাজ্যের সল্ট লেক সিটির কাছে পিট হারম্যানের রেস্তোরাঁয় তাঁর মুরগির প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু হয়। সেখানেই ‘Kentucky Fried Chicken’ নামটি জনপ্রিয় রূপ পেতে শুরু করে। কিন্তু স্যান্ডার্সের নিজের রেস্তোরাঁ তখন বিপদের মুখে। নতুন আন্তঃরাজ্য মহাসড়ক করবিনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ায় পথচারী ক্রেতা কমে যায়। ১৯৫৬ সালে তিনি রেস্তোরাঁ বিক্রি করে দেন। তখন তাঁর বয়স ৬৫।

এই জায়গাতেই গল্পটি অন্য দিকে মোড় নেয়। নতুন করে আরেকটি ব্যবসা গড়ে তোলার মতো বিপুল পুঁজি তাঁর কাছে ছিল না, ছিল না তরুণ বয়সের শারীরিক শক্তি। বহু রেস্তোরাঁ মালিক তাঁর কথা শুনলেও আগ্রহ দেখাতেন না। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত কিচেনে বাইরের একজনের রেসিপি চালু করা এবং প্রতিটি মুরগি বিক্রির জন্য তাঁকে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব অনেকের কাছেই তখন গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। কিন্তু এক জায়গায় সাড়া না পেলে তিনি পরের জায়গায় যেতেন। নিজের রেসিপি নিয়ে তাঁর আস্থা ছিল, কারণ তিনি দেখেছিলেন, মানুষ সেই খাবার খেয়ে আবার ফিরে আসে।

স্যান্ডার্সের ব্যবসার পরিকল্পনাটি ছিল সহজ ও বাস্তবসম্মত। তিনি নতুন রেস্তোরাঁ নির্মাণের জন্য কারও কাছে অর্থ চাননি, কোনো রেস্তোরাঁর মালিকানাও দাবি করেননি। মালিকেরা নিজেদের কিচেন, কর্মী ও ক্রেতা নিয়েই তাঁর মসলা ও রান্নার কৌশল ব্যবহার করে মুরগি বিক্রি করতেন। বিনিময়ে বিক্রি হওয়া প্রতিটি মুরগির জন্য স্যান্ডার্স পেতেন সামান্য অর্থ। এই ব্যবস্থাই পরে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি হিসেবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ৬০০-এর বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি গড়ে ওঠে।

ব্যবসা এত দ্রুত বড় হতে থাকে যে একসময় তা পরিচালনা করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৬৪ সালে ৭৩ বছর বয়সে তিনি দুই মিলিয়ন ডলারে কোম্পানিটি এক বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রি করেন। তবে স্যান্ডার্স হারিয়ে যাননি। তিনি কোম্পানির মুখপাত্র, পরামর্শক ও ব্র্যান্ড-দূত হিসেবে কাজ চালিয়ে যান। তাঁর চেহারা, পোশাক ও ব্যক্তিত্ব ব্র্যান্ডের কেন্দ্রেই থেকে যায়। সাদা স্যুট পরা মানুষটি বিজ্ঞাপন, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং রেস্তোরাঁ উদ্বোধনে হাজির হতে থাকেন। একসময় তাঁর মুখই হয়ে ওঠে KFC-এর সবচেয়ে বড় পরিচয়।

কানাডার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল গভীর। ১৯৬৫ সালে কানাডীয় ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সহায়তা করতে তিনি কানাডায় চলে আসেন এবং জীবনের বাকি সময় মিসিসাগার বাড়িতে কাটান। শেষ বয়সেও তিনি KFC-এর প্রচার ও কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খাবারের স্বাদ ও মান নিয়ে তাঁর উদ্বেগ কখনো কমেনি। ১৯৮০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর মুখ আজও KFC-এর লোগোতে রয়ে গেছে।

আজ বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে KFC-এর ৩৪ হাজারের বেশি রেস্তোরাঁ রয়েছে। অথচ এই সাম্রাজ্যের বিস্তারের বড় অধ্যায় শুরু হয়েছিল তাঁর অবসরের বয়সে। স্যান্ডার্সের জীবনকে শুধু ‘বৃদ্ধ বয়সে সফল হওয়ার গল্প’ বললে পুরো গল্প বলা হয় না। বহু বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি একটি স্বতন্ত্র রেসিপি তৈরি করেছিলেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন, মানুষ কী ধরনের খাবার পছন্দ করে এবং সেই পছন্দকে কীভাবে ব্যবসায় কাজে লাগাতে হয়। তাই পঁয়ষট্টি বছর বয়সে তিনি শূন্য থেকে শুরু করেননি; সঙ্গে ছিল দীর্ঘ জীবনে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা।

তাঁর গল্পের মূল্য এখানেই। কর্নেল স্যান্ডার্সের জীবন মনে করিয়ে দেয়, অবসরের বয়স ক্যালেন্ডারে লেখা থাকতে পারে; নতুন করে কাজ শুরু করার সাহসের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই।

তথ্যসূত্র:
KFC Global, “Our History,” accessed August 6, 2026


Back to top button