টাকার মান সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ: ডলার নেমে এলো ১২৩ টাকায়

ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর – টানা সাড়ে পাঁচ বছরের দীর্ঘ মন্দা ও চাপ কাটিয়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরেছে বাংলাদেশের মুদ্রা ‘টাকা’। রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য সংকট নিরসন এবং দ্রুত গতিতে রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে স্থানীয় মুদ্রার ওপর তীব্র চাপ কমেছে। এর ফলে দেশের অস্থির বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে যেখানে প্রতি ডলারের দর ছিল ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা, পরবর্তীতে সংকট বাড়ায় তা সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় গিয়ে ঠেকেছিল। তবে ২০২৫ সালের জুন থেকে অব্যাহত প্রচেষ্টায় চলতি বছরের দ্বিতীয় অর্ধে এসে সেই চিত্রে ঐতিহাসিক মোড় ঘুরেছে।
পরিসংখ্যানের চোখে ডলারের দর ও রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি
ডলারের মান হ্রাস: চলতি বছরের ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই টাকার মূল্য ০.৭৭% বেড়েছে। ফলে ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সার ডলার এখন কমে অবস্থান করছে ১২৩ টাকায়।
রেমিট্যান্সের জোয়ার: চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে ৭.৭০২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের চেয়ে ১৩.৮% বেশি।
রিজার্ভের বিশাল লাফ: গত ৮ সেপ্টেম্বর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬.৪৪ বিলিয়ন ডলারে (যেখানে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ২৪.৮৬ বিলিয়ন)। বিপিএম৬ (BPM6) হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৫৮.৮% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১.৫৩ বিলিয়ন ডলারে।
বাজারে এর প্রভাব: অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের বিশ্লেষণ
এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া জানান, রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ ও রিজার্ভ বৃদ্ধি দেশের লেনদেনের ভারসাম্যকে শক্তিশালী করেছে।
আমদানি ব্যয় হ্রাস: টাকা শক্তিশালী হওয়ার কারণে তেল, খাদ্যপণ্য, শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে স্থানীয় মুদ্রায় খরচ অনেক কমে যাবে।
মূল্যস্ফীতিতে লাগাম: আন্তর্জাতিক বাজারে দর ওঠানামা করলেও দেশে কম খরচে পণ্য পৌঁছাবে, যা অভ্যন্তরীণ বাজার ও ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে দারুণ সহায়তা করবে।
বিদেশি বিনিয়োগের আস্থা: সহজে এলসি (LC) খোলা ও পরিশোধের সুযোগ তৈরি হওয়ায় আমদানিকারক ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ ও তদারকি
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, রেমিট্যান্সের গতি ধরে রাখা ও বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার (Trade-based Money Laundering) রুখতে ব্যাংকিং চ্যানেলে নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে। বাজারে ডলারের অতিরিক্ত তারল্য তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই ব্যাংকগুলো থেকে সোয়াপ বা ক্রয়ের মাধ্যমে ডলার কিনে রিজার্ভ পুনর্গঠন করেছে।
টাকার এই মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো এবং সতর্কতামূলক আমদানি ব্যবস্থাপনা ধরে রাখার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এনএন/ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬







