উত্তর আমেরিকা

ট্রাম্পের নীতিতে ইউক্রেনের রাশিয়াবিরোধী সামরিক সক্ষমতা কমছে, দাবি প্রতিবেদনে

ট্রাম্পের নীতি

ওয়াশিংটন, ২১ সেপ্টেম্বর- যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কৌশল ও নীতি বাস্তবে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক তৎপরতাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনার আড়ালে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ না করায় দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে, যা রাশিয়ার দীর্ঘপাল্লার হামলাকে আরও সহজ করে তুলছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন নিজেদের সক্ষমতায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও তেল শোধনাগারে সফল হামলা চালিয়ে মস্কোর ওপর চাপ তৈরি করছে। ঠিক সেই সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিয়েভকে রাশিয়ার ভূখণ্ডে এসব হামলা বন্ধ রাখার অনুরোধ জানাচ্ছেন। ফলে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা কমানোর এই নীতি রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

স্থলযুদ্ধের ক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনী তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্রের ওপর কম নির্ভরশীল। নিজেদের সামরিক কৌশলের মাধ্যমে তারা সেখানে বিভিন্ন সাফল্য অর্জন করছে এবং রুশ সামরিক শক্তির ওপর আঘাত হানছে। ‘অপারেশন ভিভাল্ডি’ নামের একটি গোপন ও কৌশলী অভিযানের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় বাহিনী লাইমান এলাকা থেকে রুশ বাহিনীকে পেছনে সরিয়ে দিয়ে লুগানস্ক অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে

তৃতীয় আর্মি কোরের অধিনায়ক জেনারেল আন্দ্রি বিলেতস্কি জানিয়েছেন, কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে চার ধাপের এই অভিযানের প্রথম ধাপ সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ছোট ও প্রশিক্ষিত পদাতিক দল, ড্রোন প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার এবং নিয়মিত রসদ সরবরাহের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় বাহিনী বড় ধরনের প্রাণহানি ছাড়াই ভূখণ্ড পুনর্দখল করছে। এই অভিযানে রুশ বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ইউক্রেনীয় ডেপুটি কমান্ডার মাকসিম জোরিনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এই অভিযানেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রুশ কর্মকর্তা ও সেনাকে বন্দি করা সম্ভব হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি রুশ সেনা হতাহত হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াই স্থলযুদ্ধে ইউক্রেন নতুন কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পেরেছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।

তবে স্থলভাগের এই অগ্রগতির বিপরীতে আকাশ ও দীর্ঘপাল্লার যুদ্ধে ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন ইউক্রেনকে অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ বন্ধ রাখায় দেশটি রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে অনেকটাই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। রাশিয়া নিয়মিত হাজার হাজার ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, পানি ও মৌলিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কিয়েভের সক্ষমতা সীমিত। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মস্কো শীত মৌসুমে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর মধ্যে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইউক্রেনের কাছে কিছু পুরনো প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বিক্রির অনুমোদনের যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটিকে সমালোচকেরা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আসন্ন শীতে এসব ব্যবস্থা ইউক্রেনকে রুশ হামলা থেকে কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীরব অবস্থান এবং প্যাট্রিয়ট সরবরাহ না করার সিদ্ধান্ত রাশিয়ার জন্য বড় সামরিক সুবিধা তৈরি করছে।

অন্যদিকে, কিয়েভ নিজেদের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাশিয়ার অভ্যন্তরে গভীর কৌশলগত হামলা চালাচ্ছে। এ কারণে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদন ও তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম বাড়ছে—এমন কারণ দেখিয়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইউক্রেনকে রুশ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছেন। তবে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বাড়ার মূল কারণ ইরানকেন্দ্রিক সংকট হলেও ট্রাম্প ইউক্রেনের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন এবং কিয়েভকে তাদের কার্যকর কৌশলগত হামলা বন্ধ করতে বলছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।

ট্রাম্প একপর্যায়ে ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয় পক্ষ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে দাবি করলেও বাস্তবে ইউক্রেনীয় বাহিনী সিজরান ও ইয়ারোস্লাভল শোধনাগারে হামলা অব্যাহত রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ট্রাম্পের এই দাবি প্রকাশ্যে খণ্ডন করে জানিয়েছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের হামলা ও প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। পুরো পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েও ইউক্রেন নিজেদের সক্ষমতায় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে মার্কিন প্রশাসনের কিছু নীতি রাশিয়ার সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এস এম/ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language