দক্ষিণ এশিয়া

পাকিস্তান-চীন সীমান্ত কমিশন নিয়ে ভারতের আপত্তি, নতুন করে উত্তেজনা

পাকিস্তান-চীন সীমান্ত কমিশন

দিল্লি,২১ সেপ্টেম্বর- হিমালয়ের বিতর্কিত একটি অঞ্চলকে ঘিরে পাকিস্তান ও চীনের সীমান্ত-সংক্রান্ত সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তান ও চীন ‘পাকিস্তান-চীন বাউন্ডারি জয়েন্ট কমিশন’ কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথ জরিপ, বাণিজ্য এবং মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলা হলেও ভারত এই উদ্যোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

নয়াদিল্লির দাবি, পাকিস্তান ও চীন যে অঞ্চল নিয়ে সীমান্ত-সংক্রান্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার একটি অংশ ভারতের ভূখণ্ড। তাই ওই ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তানের তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি বা ব্যবস্থা করার আইনগত অধিকার নেই বলে মনে করে ভারত।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, “পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনও সীমান্ত নেই”—এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট ও ধারাবাহিক।

তিনি নতুন কমিশনকে ‘আইনগত ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিকেও ভারত কখনও স্বীকৃতি দেয়নি বলে জানিয়েছেন।

কোথায় মূল বিরোধ?

পাকিস্তান-চীন সীমান্তের যে অঞ্চলটি নিয়ে ভারতের আপত্তি সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে শাকসগাম উপত্যকা অন্যতম। প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলটি ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান চীনের কাছে হস্তান্তর করে।

ভারতের দাবি, শাকসগাম উপত্যকা সাবেক জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ এবং বর্তমানে ভারত যাকে লাদাখের অংশ হিসেবে দাবি করে। তাই ১৯৬৩ সালের ওই চুক্তিকে নয়াদিল্লি অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। ভারত কখনও এই চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি।

অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থান ভিন্ন। ইসলামাবাদ জম্মু ও কাশ্মীরকে একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড হিসেবে দেখে এবং ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিকে বৈধ বলে মনে করে। ফলে ওই চুক্তির ভিত্তিতে চীনের সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে বলে পাকিস্তানের অবস্থান।

নতুন কমিশন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পাকিস্তান জানিয়েছে, নতুন কমিশনের মাধ্যমে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথ সীমান্ত জরিপ, বাণিজ্য প্রবাহ এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো হবে। কমিশনের প্রথম বৈঠকও ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

তবে এটি পুরোপুরি নতুন কোনো কাঠামো নয়। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়েছে, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিতেই একটি যৌথ সীমান্ত কমিশনের ব্যবস্থা ছিল। ২০১৩ সালের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত চুক্তিতেও এই কমিশন গঠনের ভিত্তি রাখা হয়। ফলে সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে আগে থেকে থাকা ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

দিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকবের মতে, এটি পুরোপুরি নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং আগে থেকেই থাকা একটি কাঠামোকে কার্যকর করার পদক্ষেপ। তার মতে, চীন তার বিভিন্ন সীমান্তকে আরও সুসংহতভাবে চিহ্নিত ও ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের অন্যান্য সীমান্তে অস্থিতিশীলতার সময় চীন-পাকিস্তান সীমান্তে চলাচল ও যোগাযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়টিও এর পেছনে থাকতে পারে।

ভারতেরীর এবং লাদাখ ভারতের আপত্তির নেপথ্যে কাশ্মীর ও লাদাখ

ভারতের আপত্তি শুধু একটি সীমান্ত কমিশনকে ঘিরে নয়; এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাশ্মীর বিরোধও সরাসরি জড়িত।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এসব ভূখণ্ডের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নয়াদিল্লি মেনে নেবে না। ভারতের বক্তব্য, পাকিস্তান যেসব অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করে, সেসব ভূখণ্ড নিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে ব্যবস্থা করার অধিকার ইসলামাবাদের নেই।

জয়সওয়াল আরও বলেছেন, ভারত ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিকে কখনও স্বীকৃতি দেয়নি এবং ওই চুক্তিকে অবৈধ ও অকার্যকর বলে মনে করে। তার ভাষায়, ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে চীন ও পাকিস্তানের যেকোনো ধরনের সীমান্ত সহযোগিতা নয়াদিল্লির কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরও বড় বিষয়

সীমান্ত বিরোধের সঙ্গে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)-এর বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। চীনের কাশগর থেকে পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত এই অবকাঠামো প্রকল্পের একটি অংশ ভারত দাবিকৃত পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে গেছে। এ কারণে ভারত দীর্ঘদিন ধরে সিপিইসির বিরোধিতা করে আসছে।

তাই সীমান্ত কমিশনকে শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ, সিপিইসি-নির্ভর অবকাঠামো এবং কাশ্মীর প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতি-বিশেষজ্ঞ হুসেইন হাক্কানি মনে করেন, নতুন কমিশনের উদ্যোগে বাস্তবিক ও রাজনৈতিক—দুই ধরনের বিষয়ই রয়েছে। তার মতে, সীমান্ত সহযোগিতা বাড়ানো, অবৈধ সীমান্ত পারাপার ঠেকানো এবং সিপিইসির সঙ্গে যুক্ত কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষার পাশাপাশি এটি ভারতের প্রতি একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।

ভারত-চীন সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও তাৎপর্যপূর্ণ

এই উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ভারত ও চীন নিজেদের সীমান্ত উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে। দুই দেশের মধ্যে হিমালয় অঞ্চলের লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) ঘিরে কয়েক বছর ধরে সামরিক উত্তেজনা রয়েছে।

ফলে একদিকে ভারত-চীন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে চীন ও পাকিস্তান নিজেদের পারস্পরিক সীমান্ত সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। ভারতীয় কৌশলগত মহলে এ বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কমিশন গঠনের অর্থ এই নয় যে হিমালয়ে ভারতের সঙ্গে চীন-পাকিস্তানের তাৎক্ষণিক সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক জ্যাকবের মতে, এই উদ্যোগের কারণে এলএসিতে এখনই কোনো প্রত্যক্ষ বা দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।

চীনের কৌশলগত হিসাব

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা চীনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। কাশ্মীর প্রশ্নে চীন ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের অবস্থানের কাছাকাছি থেকেছে এবং গিলগিট-বালতিস্তানসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে ভারতীয় নয়, পাকিস্তানি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা বজায় রেখেছে—এমনটাই উল্লেখ করেছেন হাক্কানি।

তার মতে, পাকিস্তানকে কাশ্মীর প্রশ্নে আশ্বস্ত করা চীনের জন্য একই সঙ্গে কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও গভীর হয়, অন্যদিকে ভারতকে চীন ও পাকিস্তান—দুই প্রতিবেশীকে ঘিরে নিরাপত্তা-সমীকরণ বিবেচনা করতে হয়।

তবে এই পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক সামরিক প্রভাব নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এর গুরুত্ব মূলত দীর্ঘমেয়াদে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে।

বিরোধের কেন্দ্রে ‘সীমান্ত’ নাকি ভূরাজনীতি?

সব মিলিয়ে, চীন-পাকিস্তান সীমান্ত কমিশন নিয়ে ভারতের আপত্তি শুধু মানচিত্র বা সীমান্তরেখার প্রশ্ন নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে কাশ্মীরের বিতর্কিত মর্যাদা, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি, লাদাখের ওপর ভারতের দাবি, সিপিইসি এবং চীন-পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারত্ব।

হাক্কানির ভাষায়, ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধের মূল দ্বন্দ্ব শুধু মানচিত্র বা সীমারেখা নিয়ে নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাবও জড়িত। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নতুন কোনো প্রক্রিয়া চালু হলেও তা কয়েক দশকের পুরোনো কাশ্মীর ও সীমান্ত বিরোধের মৌলিক প্রশ্নগুলো সমাধান করছে না।

বরং চীন ও পাকিস্তান যেখানে নিজেদের সীমান্ত সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে, সেখানে ভারত সেই উদ্যোগকে তার সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত দাবির পরিপন্থী হিসেবে প্রত্যাখ্যান করছে। ফলে হিমালয়ের এই দুর্গম অঞ্চল ঘিরে ভারত-চীন-পাকিস্তানের ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি অধ্যায় সামনে এসেছে।

এস এম/ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language