ন্যাম ভবনে দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ: সাবেক জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ৪ ও প্রথম স্ত্রী ১ দিনের রিমান্ডে

ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর – সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের রহস্যজনক ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের মামলায় বহিষ্কৃত জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গাজী নজরুলের ৪ দিন এবং মাকছুদা বেগমের ১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সোমবার দুপুর ২টা ২২ মিনিটে কড়া নিরাপত্তায় আসামিদের মাইক্রোবাসে করে ঢাকার সিএমএম আদালতে এনে হাজতখানায় রাখা হয়। পরবর্তীতে তাদের আদালতের এজলাসে তোলা হলে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের মধ্যে জোর আইনি লড়াই চলে।
রিমান্ড শুনানির আইনি যুক্তি-তর্ক
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. শামসুজ্জোহা সরকার আসামিদের গভীরভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের স্বপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান রিমান্ড আবেদন বাতিল করে জামিনের জন্য আর্জি জানান। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে বিচারক রিমান্ডের এই আদেশ দেন।
রিমান্ড আবেদনে যে ৫ কারণ দেখায় পুলিশ
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জমা দেওয়া রিমান্ড আবেদনে ৫টি সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেন:
উপস্থিতি ও প্ররোচনা: মরিয়ম গলায় ফাঁস দেওয়ার সময়ে আসামিরা ফ্ল্যাটে উপস্থিত ছিলেন কি না এবং আত্মহত্যায় তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো প্ররোচনা ছিল কি না তা উদঘাটন করা।
মানসিক নির্যাতন: ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করতে মানসিক চাপ, হুমকি বা ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল কি না তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা।
পলাতক আসামির তথ্য সংগ্রহ: মামলার ৩ নম্বর আসামি মরিয়মের মামা ওবায়দুল রহমানের ভূমিকা ও অবস্থান শনাক্ত করে তাকে গ্রেপ্তার করা।
অজ্ঞাতদের সম্পৃক্ততা: ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তি বা আসামির ইন্ধন রয়েছে কি না তা শনাক্ত করা।
রহস্য উদঘাটন: মামলার মূল রহস্য উন্মোচন করা।
যেভাবে ঘটলো এই ট্র্যাজেডি
রোববার সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে নিহতের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। এতে গাজী নজরুল, মাকছুদা বেগম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুল রহমানকে আসামি করা হয়। ওবায়দুল রহমান বর্তমানে পলাতক।
এজাহারে নিহতের বাবা অভিযোগ করেছেন, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন কারণে গাজী নজরুল ও মাকছুদা তার মেয়েকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। পুলিশ ঘটনার ঘর থেকে মরিয়মের লেখা দাবি করা কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করেছে, যদিও নিহতের বাবা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে চিরকুটগুলোর হাতের লেখা সত্যিই তার মেয়ের কি না, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
ভিডিও বিতর্ক ও রাজনীতি থেকে বহিষ্কার
উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ে মগবাজারের একটি হোটেলে গাজী নজরুলের সাথে মরিয়মের একটি অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ভিডিওটি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ (AI) দিয়ে তৈরি দাবি করা হলেও, পরবর্তীতে গাজী নজরুল পোস্ট দিয়ে তরুণীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করেন। সামাজিক বিতর্ক ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে জামায়াতে ইসলামী তাকে বহিষ্কার করে।
বর্তমানে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। মরিয়মের অকাল মৃত্যুর পেছনের আসল সত্য এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেই উন্মোচিত হবে।
এনএন/ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬







