সম্পাদকের পাতা

বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটায় বাংলাদেশি তরুণী নীলিমা

নজরুল মিন্টো

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটায় (Meta) যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশি তরুণী নীলিমা হাকিম মৌ। সেখানে তিনি Linguistic Engineer, বাংলায় যাকে বলা যায় ভাষা প্রকৌশলী, হিসেবে কাজ করছেন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও বড় পরিসরে কাজ করছে। ভাষাবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থীর এমন একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে যাওয়ার গল্প তাই স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল জাগায়।

নীলিমার এই অর্জনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য। এখনও অনেক পরিবারে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় নির্বাচনের সময় প্রশ্ন ওঠে, মানবিকের বিষয় পড়ে ভবিষ্যতে কী করা যাবে? প্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার বিজ্ঞান কিংবা প্রকৌশলের বাইরে অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের সুযোগ কতটা? নীলিমার পথচলা সেই পুরোনো ধারণার সামনে নতুন একটি বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রযুক্তির সঙ্গে এখন ভাষা, মনোবিজ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের আচরণ সম্পর্কিত জ্ঞানেরও প্রয়োজন বাড়ছে।

নীলিমার শিকড় কুষ্টিয়ায়। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে। ২০১৬ সালে সেখান থেকে স্নাতক এবং ২০১৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ভাষা কীভাবে গড়ে ওঠে, মানুষ কীভাবে ভাষা শেখে, সমাজের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক কী, একটি ভাষা কেন বদলে যায় কিংবা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, এসবই ভাষাবিজ্ঞানের পড়াশোনার অংশ। সেখানকার সেই শিক্ষাজীবনই পরে তাঁকে আরও বিস্তৃত গবেষণার দিকে নিয়ে যায়।

উচ্চশিক্ষার জন্য এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তাঁর পরবর্তী গন্তব্য ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের Ball State University। সেখানে Linguistics ও TESOL বিষয়ে আরেকটি মাস্টার্স করেন তিনি। TESOL মূলত যাঁদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়, তাঁদের ইংরেজি শেখানোর পদ্ধতি ও কৌশল নিয়ে পড়াশোনা। ২০২২ সালে তিনি এই ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

Ball State-এ নীলিমা শুধু শিক্ষার্থী ছিলেন না, শিক্ষকতাও করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের লেখালেখি ও গবেষণাভিত্তিক রচনার কোর্স পড়িয়েছেন তিনি। নতুন একটি দেশে এসে ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে শিক্ষক হিসেবে তাঁর কাজও নজর কাড়ে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে Ball State University তাঁকে মাস্টার্স পর্যায়ে Excellence in Teaching Award দেয়।

সেখান থেকে নীলিমার যাত্রা এগিয়ে যায় আরও উচ্চতর গবেষণার দিকে। তিনি ভর্তি হন ভার্জিনিয়ার George Mason University-তে ভাষাবিজ্ঞানের পিএইচডি প্রোগ্রামে। বর্তমানে তিনি সেখানে পিএইচডি প্রার্থী ও গবেষণা সহকারী। তাঁর গবেষণার মধ্যে রয়েছে বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণ, সমাজ ও ভাষার সম্পর্ক, দ্বিতীয় ভাষা শেখার প্রক্রিয়া, কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে ভাষা বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের লেখালেখিকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, এমন নানা বিষয়।

এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁকে নিয়ে গেছে আলাস্কার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষার কাছে। তিনি Akuzipik নামে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা একটি ভাষা নিয়ে গবেষণা করছেন। আলাস্কার St. Lawrence Island-এ ব্যবহৃত এই ভাষাকে নথিবদ্ধ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত তিনি। Hawrami নামে আরেকটি বিপন্ন ভাষা নিয়েও তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু শব্দ হারিয়ে যাওয়া নয়। সেই ভাষায় ধরে রাখা মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয়েরও অনেক কিছু হারিয়ে যেতে পারে। ফলে নীলিমার এই গবেষণার গুরুত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারের সীমানা ছাড়িয়ে একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষার সঙ্গেও যুক্ত।

তাঁর গবেষণাও ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিপন্ন ও আদিবাসী ভাষা নিয়ে কাজের জন্য ২০২৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাবিজ্ঞান সংস্থার গবেষণা সহায়তা পান। চলতি বছর বহুভাষী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক লেখালেখি নিয়ে গবেষণার জন্য আরও একটি পুরস্কার লাভ করেন। এসব স্বীকৃতি তাঁর গবেষণার পরিধি ও গুরুত্বকেই তুলে ধরে।

গবেষণার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতৃত্বেও সক্রিয় নীলিমা। George Mason University-র স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি এবং দ্বিতীয় মেয়াদের জন্যও নির্বাচিত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

এই দীর্ঘ একাডেমিক ও গবেষণার পথ পেরিয়েই তাঁর পেশাগত জীবনে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা। এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে, ভাষাবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কী করেন?

বিষয়টি বুঝতে খুব বেশি প্রযুক্তি জানা প্রয়োজন নেই। আমরা যখন ফোনে কথা বলি, কোনো লেখা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করি, কণ্ঠস্বর দিয়ে ফোনকে নির্দেশ দিই কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কোনো প্রশ্ন করি, তখন যন্ত্রটিকে মানুষের ভাষা বুঝতে হয়। কিন্তু মানুষের ভাষা অঙ্কের সূত্রের মতো সরল নয়। একই কথা মানুষ নানাভাবে বলতে পারে। একই শব্দের অর্থ পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যেতে পারে। আবার পৃথিবীতে রয়েছে হাজার হাজার ভাষা ও উপভাষা।

কম্পিউটারকে মানুষের এই জটিল ভাষা বুঝতে শেখানোর কাজে তাই শুধু সফটওয়্যার প্রকৌশলীরাই নন, ভাষা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রয়েছে এমন বিশেষজ্ঞদেরও প্রয়োজন হয়। এখানেই ভাষা প্রকৌশলীদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

একজন ভাষা প্রকৌশলী ভাষার তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন, কোনো প্রযুক্তি মানুষের কথা বা লেখা ঠিকভাবে বুঝতে পারছে কি না তা পরীক্ষা করতে পারেন, অনুবাদের মান যাচাই করতে পারেন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাষা ব্যবহারে কোথায় ভুল করছে তা চিহ্নিত করার কাজে যুক্ত হতে পারেন। প্রযুক্তির সঙ্গে ভাষার এই সম্পর্ক নিয়ে নীলিমার আগের কাজের সঙ্গে নতুন পেশাটির যোগসূত্র তাই সহজেই বোঝা যায়।

একসময় ভাষাবিজ্ঞান পড়লে শিক্ষকতা কিংবা প্রচলিত কয়েকটি পেশার বাইরে কতটা সুযোগ রয়েছে, সেই প্রশ্ন অনেক শিক্ষার্থীর মনেই ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার সেই চিত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে। প্রযুক্তি যত বেশি মানুষের ভাষায় কথা বলতে এবং মানুষের নির্দেশ বুঝতে শিখছে, ভাষাকে গভীরভাবে বোঝেন এমন মানুষের প্রয়োজনও তত বাড়ছে।

নীলিমা হাকিম মৌয়ের গল্পের উল্লেখযোগ্য দিক এখানেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে তিনি সরাসরি মেটায় পৌঁছে যাননি। মাঝখানে রয়েছে আরেকটি মাস্টার্স, শিক্ষকতা, পুরস্কার, পিএইচডি গবেষণা, বিপন্ন ভাষা নিয়ে কাজ, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণা উপস্থাপন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতৃত্ব। ধাপে ধাপে অর্জিত এসব অভিজ্ঞতাই তাঁকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

নীলিমার গল্পটি তাই শুধু মেটায় একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। তাঁর পথচলা দেখিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিষয়ে পড়াশোনা করা হলো, সেটিই শেষ কথা নয়। অর্জিত জ্ঞানকে সময়ের পরিবর্তন ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে কতটা কাজে লাগানো যায়, ভবিষ্যতের পেশাজীবনে সেটিও বড় হয়ে উঠতে পারে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য নীলিমার এই পথচলা সেই সম্ভাবনারই একটি সুন্দর উদাহরণ।

তথ্যসূত্র:
George Mason University
Ball State University
American Association for Applied Linguistics
Meta Newsroom


Back to top button