সম্পাদকের পাতা

মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে কানাডা থেকে বহিষ্কারের দাবিতে লক্ষাধিক মানুষের স্বাক্ষর

নজরুল মিন্টো

কানাডার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একের পর এক মন্তব্য করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হুকস্ট্রা এখন দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছেন। কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলা এবং দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সেই ক্ষোভ আরও বেড়েছে। প্রকাশ্য প্রতিবাদে নেমেছেন কানাডীয়রা। কানাডার মাটিতে বসে এই রাষ্ট্রদূতের অকূটনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাচ্ছেন তাঁরা। একই সঙ্গে তাঁকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ঘোষণা করে কানাডা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে শুরু হওয়া পিটিশনে ইতিমধ্যে এক লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। স্বাক্ষরের সংখ্যা দ্রুত বেড়েই চলেছে।

পিটিশনটি শুরু করেছেন ক্যালগেরির বাসিন্দা লিয়ান ওয়াকার। গত ২১ জুলাই কানাডার হাউস অব কমন্সের পিটিশন ব্যবস্থায় এটি স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত হয়। শুরুতে ওয়াকারও ভাবেননি, তাঁর এই উদ্যোগ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এত বড় জনসমর্থন পাবে। কিন্তু ১৩ আগস্টের মধ্যেই স্বাক্ষর এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। পিটিশনটি আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত খোলা থাকবে। এই বিপুল সাড়া একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। কানাডার সার্বভৌমত্বকে খাটো করে দেখা, দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার কথাকে স্বাভাবিক করে তোলা কিংবা কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে একজন বিদেশি রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ কানাডীয়রা মেনে নিতে প্রস্তুত নন।

পিটিশনের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট। কানাডা সরকারকে হুকস্ট্রাকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করতে হবে এবং ওয়াশিংটনকে তাঁকে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে সরিয়ে নিতে বলতে হবে। একই সঙ্গে হুকস্ট্রার আচরণ ভিয়েনা কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন এবং কানাডার রাজনৈতিক বিষয়ে মার্কিন কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে। পিটিশনে অভিযোগ করা হয়েছে, একজন বিদেশি রাষ্ট্রদূতের যে কূটনৈতিক সীমারেখা মেনে চলার কথা, হুকস্ট্রা বারবার তা অতিক্রম করেছেন।

ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ প্রসঙ্গ। ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। হুকস্ট্রা সেই বক্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখার পরিবর্তে ট্রাম্পের কানাডাবিষয়ক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকি কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথাকে একসময় তিনি ‘term of endearment’ বা স্নেহসূচক অভিব্যক্তি হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছিলেন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশকে আরেক দেশের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার কথাকে কানাডীয়রা নিছক রসিকতা কিংবা স্নেহের ভাষা হিসেবে দেখছেন না। তাদের কাছে এটি দেশের স্বাধীন অস্তিত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন।

হুকস্ট্রাকে ঘিরে বিতর্ক এখানেই থেমে নেই। ২০২৫ সালের কানাডার ফেডারেল নির্বাচনের পরিবেশকে তিনি ‘anti-American’ বলে বর্ণনা করেছিলেন বলে পিটিশনে অভিযোগ করা হয়েছে। কানাডার রাজনীতিকেরা মার্কিন শুল্কনীতির বিরোধিতা করলে কিংবা কানাডীয়দের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুললেও তিনি প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন। আলবার্টার রকি পর্বতমালার পর্যটন শহর ব্যানফে এক আলোচনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘uninformed’ বা যথেষ্ট অবহিত নন বলে ইঙ্গিত করা হলে হুকস্ট্রা তীব্র আপত্তি জানান। একই অনুষ্ঠানে কানাডীয়দের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে সীমান্তের প্রিক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থাও নতুন করে দেখা হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একের পর এক এমন বক্তব্যকে কানাডীয়রা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তে একটি বিদেশি রাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন।

পিটিশনে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ এসেছে। মিশিগানভিত্তিক একটি ভোটার আইডেন্টিফিকেশন অ্যাপের সঙ্গে হুকস্ট্রার যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ওই অ্যাপটি আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটি উদ্যোগে সম্ভাব্য সমর্থকদের তথ্য খুঁজতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্টের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের একাধিক বৈঠকের বিষয়ও সামনে এসেছে। কানাডার একটি অংশকে বিচ্ছিন্ন করার আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মার্কিন যোগাযোগের অভিযোগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তার ওপর সেই প্রক্রিয়ায় কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নাম উঠে আসায় বিষয়টি এখন সরাসরি দেশের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

এই পিটিশনের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। গ্রিন পার্টির নেতা এলিজাবেথ মে এটি স্পনসর করেছেন এবং হাউস অব কমন্সে উপস্থাপনের কথা রয়েছে। পিটিশনটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদে উপস্থাপিত হলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারকে ৪৫ দিনের মধ্যে জবাব দিতে হবে। ফলে এক লাখের বেশি মানুষের স্বাক্ষর এখন আর শুধু অনলাইনে জমে থাকা প্রতিবাদ নয়। কানাডীয়দের সেই ক্ষোভ সরাসরি দেশের সংসদে পৌঁছাতে যাচ্ছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো সময়টি। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এমনিতেই কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি দুই দেশের বাণিজ্যে বড় চাপ তৈরি করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য আলোচনা এখনো চলছে। ঠিক এমন সময়ে ওয়াশিংটনের প্রধান কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে কানাডা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে এক লাখের বেশি মানুষ নাম লিখিয়েছেন। সংখ্যাটি প্রতিদিন বাড়ছে। ফলে এটি এখন শুধু একজন রাষ্ট্রদূতকে ঘিরে ক্ষোভ নয়, কানাডার সঙ্গে কী ভাষায় এবং কী আচরণে সম্পর্ক রাখতে হবে, ওয়াশিংটনের প্রতি সেই বার্তাও ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কানাডীয়দের বার্তাটি সম্ভবত স্বাক্ষরের সংখ্যার মধ্যেই লেখা হয়ে গেছে। প্রতিবেশী যত শক্তিশালীই হোক, বন্ধুত্ব যত পুরোনোই হোক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক যত গভীরই হোক, একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্ব দরকষাকষির বিষয় নয়। কানাডা কারও ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো দেশ নয়। নিজের ভূখণ্ড, নিজের রাজনীতি এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কানাডারই। সেই অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে কানাডীয়রা মাথা নত করতে জানে না।

তথ্যসূত্র:
The Daily Beast
CBC News
The Canadian Press


Back to top button
🌐 Read in Your Language