সম্পাদকের পাতা

ট্রাম্পের চাপের মুখে কানাডার তথ্য সুরক্ষায় অন্টারিওর নতুন পরিকল্পনা

নজরুল মিন্টো

সীমান্তের ওপারে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। অথচ সেই যুক্তরাষ্ট্রকেই এখন কানাডার তথ্য-নিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে প্রকাশ্যে তুলে ধরছেন অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি, রাজনৈতিক চাপ এবং অনিশ্চিত নীতির মধ্যে এবার নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: কানাডীয়দের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্যের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে? ফোর্ডের উত্তর স্পষ্ট, কানাডার তথ্য কানাডাতেই রাখতে হবে। আর সে লক্ষ্যেই অন্টারিওতে বড় আকারের ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে তাঁর সরকার।

সোমবার অটোয়ায় অ্যাসোসিয়েশন অব মিউনিসিপ্যালিটিজ অব অন্টারিওর সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায় ডাগ ফোর্ড সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে বলেন, কানাডা যদি নিজস্ব ডেটা অবকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে কানাডীয়দের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত হবে কানাডার তথ্যের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের হাতে ছেড়ে দেওয়া।

এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক বাক্যবাণ নয়। বর্তমান বিশ্বে তথ্য এখন অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম প্রধান সম্পদ। ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি নথি, ব্যবসায়িক তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং থেকে শুরু করে নাগরিকদের দৈনন্দিন ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের বিপুল অংশ সংরক্ষিত থাকে ডেটা সেন্টারে। ফলে এসব তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে এবং কোন দেশের আইন ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকছে, সেটি এখন জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

ফোর্ডের সরকার সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই সম্প্রতি Data Centre Playbook নামে নতুন একটি কাঠামো ঘোষণা করেছে। এর লক্ষ্য অন্টারিওতে নতুন ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহার, পরিবেশ, পানির ব্যবহার, শব্দদূষণ এবং স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা। অন্টারিওতে বর্তমানে প্রায় ১০০টি ডেটা সেন্টার চালু রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের কারণে আগামী বছরগুলোতে এ ধরনের স্থাপনার চাহিদা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্টারিও সরকার বলছে, নতুন ডেটা সেন্টারগুলোকে তাদের ব্যবহৃত বিদ্যুতের পুরো খরচ বহন করতে হবে। ফোর্ডের মতে, অন্টারিওর নিজস্ব শক্তিই বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যথেষ্ট। প্রদেশটিতে রয়েছে পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জমি, শীতল আবহাওয়া এবং দক্ষ কর্মীবাহিনী।

প্রাদেশিক সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে হবে। কমিউনিটি সেন্টার, পার্ক, সড়ক এবং ব্রডব্যান্ড অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মতো বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ অন্টারিও শুধু তথ্য সংরক্ষণের জন্য জায়গা দিতে চায় না, এর বিনিময়ে স্থানীয় অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠীর জন্যও দৃশ্যমান সুবিধা নিশ্চিত করতে চায়।

অর্থনৈতিক হিসাবও যথেষ্ট বড়। কুইন্স পার্কের অনুমান অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে অন্টারিওর অর্থনীতিতে ১২২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি আনতে পারে এবং বছরে ১৭ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। ফলে বিষয়টি শুধু ডেটা নিরাপত্তার নয়, ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেরও।

ডাগ ফোর্ডের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক হুমকিতে কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও তথ্য অবকাঠামোতেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর দাবি এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণ করা অন্টারিওর হাতে নেই, কিন্তু নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেদের হাতে রাখার ক্ষমতা আছে, ফোর্ডের এই বক্তব্যের মূল সুর সেখানেই। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ যত বাড়বে, কানাডায় অর্থনৈতিক ও ডিজিটাল স্বাধীনতার দাবি ততই জোরালো হবে। সেই বাস্তবতায় অন্টারিওর ডেটা সেন্টার উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তি বিনিয়োগের পরিকল্পনা নয়, এটি কানাডার তথ্য-সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করারও একটি ঘোষণা।

এনএন/ ১৮ আগস্ট ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language