সম্পাদকের পাতা

বাংলার এক হতভাগ্য মাঝির গল্প

নজরুল মিন্টো

রাত শেষ হয়ে আসছিল। ঢাকার আকাশে তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। বাড়িটি নিস্তব্ধ। গাছের পাতাগুলো নিশ্চুপ, রাস্তাঘাট ফাঁকা, চারপাশে ঘুমন্ত নগরীর গভীর নীরবতা। অশুভ সময় যেন তার শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাতের শেষ প্রহর বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল এক ভয়ংকর বিপর্যয়। ভেতরের মানুষগুলো তখনও জানতেন না, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এই নিঝুম বাড়ির ভেতর লেখা হতে যাচ্ছে ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়।

যে বাড়িতে কয়েক বছর আগেও মানুষের নিরন্তর আসা যাওয়া ছিল, মুহূর্তের মধ্যে সেই বাড়ির কক্ষ, করিডর আর সিঁড়ি রক্তে ভিজে গেল। একের পর এক গুলিতে লুটিয়ে পড়তে লাগলেন একেকজন। সিঁড়িতে পড়ে গেলেন সেই মানুষটিও, যাঁর ডাকে একদিন কোটি কোটি মানুষ ঘর ছেড়ে পথে নেমেছিল, যাঁর তর্জনী হয়ে উঠেছিল বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, যাঁর নেতৃত্বে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল একটি নতুন দেশ।

তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির বঙ্গবন্ধু। বাড়িটি ঢাকার ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর। দিনটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৫ বছর।

এ গল্পটি বাংলার এক মাঝির গল্প। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে এসেছিল, “মুজিব বাইয়া যাও রে, নির্যাতিত দেশের মাঝে…”। সেই গানের মাঝির রূপক যেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। দেশের মানুষ যেন তাঁর হাতে বৈঠা তুলে দিয়ে বসিয়েছিল জাতির নৌকার গলুইয়ে। সামনে উত্তাল স্রোত, চারদিকে ঝড় তুফান, পথজুড়ে বিপদ। কিন্তু মাঝির চোখ ছিল একটি গন্তব্যে। সেই গন্তব্যের নাম স্বাধীনতা।

সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর মূল্যও কম দিতে হয়নি তাঁকে। আন্দোলনের রাজপথ, কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠ, মৃত্যুর হুমকি, সবকিছু পেরিয়েছেন তিনি। জীবনের মোট ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে কাটিয়েছেন। প্রায় ১৩ বছর। গোটা জীবনের প্রায় এক চতুর্থাংশ। একজন মানুষের রাজনৈতিক জীবনের পরিচয় দিতে কখনো কখনো একটি সংখ্যাই যথেষ্ট, ৪ হাজার ৬৮২ দিন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। ঢাকার রেসকোর্স ময়দান তখন জনসমুদ্র। কোনো লিখিত বক্তব্য নয়। কোনো পাণ্ডুলিপি দেখে নয়। কবি না হয়েও সেদিন তিনি যেন ইতিহাসের এক মহাকাব্য পাঠ করতে মঞ্চে উঠেছিলেন। সেই দৃশ্যকেই নির্মলেন্দু গুণ অমর করে লিখেছেন,

“শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি।”

সেদিন তাঁর প্রতিটি বাক্য লাখো মানুষের বুকের ওপর আছড়ে পড়ছিল ঢেউয়ের পর ঢেউ হয়ে। তারপর এলো সেই মুহূর্ত। বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হলো, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল প্রকাশিত Newsweek তাঁকে “Poet of Politics”, অর্থাৎ রাজনীতির কবি বলে অভিহিত করেছিল। প্রতিবেদনে তাঁর অসাধারণ জনসম্মোহনী বক্তৃতাশক্তির কথাও বলা হয়েছিল।

২০১৭ সালে ইউনেসকো বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে Memory of the World International Register-এ অন্তর্ভুক্ত করে। বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হয়ে যায় বাঙালির স্বাধীনতার সেই ডাক। একজন রাজনৈতিক নেতার ভাষণ এভাবে বিশ্বস্মৃতির অংশ হয়ে ওঠা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়।

২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার বিশ্বব্যাপী শ্রোতা জরিপে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালির ভোটে শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচিত হন “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি”। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো জরিপের ফল নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়টি বাংলাদেশের মানচিত্রে লেখা।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কত বই লেখা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব বের করা কঠিন। বিভিন্ন গ্রন্থপঞ্জিভিত্তিক হিসাবে সংখ্যাটি ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। জীবনী, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, স্মৃতিকথা, কবিতা, গল্প, শিশুতোষ সাহিত্য থেকে বিদেশি ভাষার গ্রন্থ, শেখ মুজিবকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার।

আশ্চর্যের বিষয়, এত বইয়ের বিষয় যিনি, তিনিও নিজে বাংলা সাহিত্যে রেখে গেছেন তিনটি অসাধারণ গ্রন্থ, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং আমার দেখা নয়াচীন। রাজনীতির মানুষটির ভেতরে যে একজন পর্যবেক্ষক, গল্পকার ও সময়ের সাক্ষী ছিলেন, সেই মানুষটিকে এসব বইয়ে অন্যভাবে পাওয়া যায়।

তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন দুই বাংলার অসংখ্য কবি। কবিতার পাতায় তিনি কখনো জনক, কখনো বজ্রকণ্ঠ, কখনো স্বাধীনতার প্রতীক। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর আমার পরিচয় কবিতায় বাঙালির হাজার বছরের পথ অতিক্রম করে এসে বঙ্গবন্ধুর কাছে দাঁড়িয়েছেন।

“এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান।”

সৈয়দ হক শুধু এই একটি কবিতা লেখেননি। কোনো শোকগাথা নয়, মুজিবের রক্তাক্ত বাংলায়, বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে, টুঙ্গিপাড়ায়সহ বহু কবিতায় তিনি ফিরে গেছেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। শামসুর রাহমান, অন্নদাশঙ্কর রায়, নির্মলেন্দু গুণসহ আরও বহু কবির কলমেও শেখ মুজিব কখনো ইতিহাস, কখনো শোক, কখনো প্রতিবাদ, কখনো ভালোবাসা হয়ে ফিরে এসেছেন।

তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য গান। মুক্তিযুদ্ধের সময় গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা “শোনো একটি মুজিবরের থেকে” বাংলার সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। “যদি রাত পোহালে শোনা যেত” সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠে পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে। কোনো রাজনৈতিক নেতার জনপ্রিয়তার হিসাব নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে করা যায়। কিন্তু একজন মানুষ জাতির সংস্কৃতির কত গভীরে প্রবেশ করেছেন, তার আরেকটি মাপকাঠি হলো তাঁকে নিয়ে রচিত সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র ও শিল্পকর্ম।

বিশ শতকের স্মরণীয় গণনেতাদের মধ্যে শেখ মুজিবের স্থান ইতিহাসই নির্ধারণ করে দিয়েছে। একটি পরাধীন জনগোষ্ঠীকে নিজের জাতিসত্তা চিনতে শিখিয়ে, অধিকার আদায়ের সাহস জুগিয়ে এবং স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যাওয়া তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি। ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান তাই একটি অনিবার্য নাম।

এই গল্পের নাম বাংলার এক হতভাগ্য মাঝির গল্প। কারণ মাঝি ঝড় তুফান পেরিয়ে নৌকাটিকে তীরে পৌঁছে দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই তীরে নিজের জন্য নিরাপদ আশ্রয় পাননি।

গল্পের শেষটুকু তাই আর নতুন করে লেখার প্রয়োজন নেই। বহু বছর আগে অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলার এই মাঝিকে নিয়ে মাত্র দুটি পঙ্‌ক্তিতে যেন ইতিহাসের শেষ বাক্যটি লিখে রেখে গেছেন:

“যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”

এনএন/ ১৫ আগস্ট ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language