
সকাল তখনো আসেনি পুরোপুরি, টরন্টোর আকাশে ছড়িয়ে ছিল ফিকে নীল ধোঁয়ার মতো অন্ধকার। লেক অন্টারিওর ধারে বসে থাকা ইটোবিকোর লেকশোর বুলেভার্ড ঘুম ভাঙানো আলোয় ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল। কুয়াশা ভেজা পাতাগুলো বাতাসে কাঁপছিল আর ছিমছাম রাস্তাগুলো নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিল শহরের চিরচেনা কোলাহলের। ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সগুলোর একটায়, কোয়েন স্ট্রিটের কো-অপারেটিভ হাউজিংয়ের এক ইউনিটে, এক বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবার ঘুমিয়ে ছিল—যেন সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু যে ভোরে সূর্য ওঠে রক্ত রাঙা আলো নিয়ে, সে ভোর আর কখনো স্বাভাবিক থাকে না।
২৯ মে, ২০০৬। ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৫টা ৩০ মিনিট স্পর্শ করছে। রান্নাঘরে ঢুকে পড়েন সাব্বির মাহমুদ, বয়স ৪৫, এক সময়ের ব্যাংককর্মী। তার হাতে একটি ছুরি। ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে চেয়ে থাকেন কিছুক্ষণ—তবে সে দৃষ্টিতে ভালোবাসা ছিল না, ছিল না অনুতাপও। এক পশুর মতো আচমকা ছুরিটি বসিয়ে দেন স্ত্রীর বুকে।
চিৎকারে কেঁপে উঠে ঘরের নিঃস্তব্ধতা। পাশে ঘুমিয়ে থাকা ১৩ বছরের কন্যা জেবা—গ্রেড ৮ এর শিক্ষার্থী, ঘুম ভেঙে দেখে তার সামনে ঘটে চলেছে বিভীষিকাময় এক হত্যাকাণ্ড। তার বাবা তার মাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করছেন একের পর এক। প্রথমে যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারে না সে। মনে হয়, বোধহয় ভয়ানক কোনো দুঃস্বপ্ন। কিন্তু যখন রক্তের ছিটে লাগে তার হাতে, তখন সে ফিরে আসে বাস্তবতায়।
মায়ের মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে থোকা থোকা রক্ত। বুকে বয়ে যাচ্ছে লাল নদী। সে ছুরিটা টেনে বের করার চেষ্টা করে। রক্ত থামাতে চায়। কিন্তু পারে না। চোখের সামনে তার মা মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। নিঃশ্বাস থেমে যায়। নিথর হয়ে যান।
জেবা তখন শুধুই কাঁদছিল না, সে জিজ্ঞাসা করছিল নিজেকে—“আমি কীভাবে মুখ দেখাবো এই সমাজে? আমি তো এক খুনীর মেয়ে! আমার দুই ছোট ভাইকে কীভাবে মানুষ করবো? আমি কোথায় থাকবো? আমি কীভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাবো?”

চার বছরের দানিয়েল আর আঠারো মাসের রাকিন তাকিয়ে ছিল বোনের দিকে। তারা কাঁদছিল না। শিশুসুলভ অস্থিরতা ছিল না তাদের মধ্যে। হয়তো কোনোভাবে তারা অনুভব করেছিল—তাদের জীবনে কিছু একটা চিরতরে বদলে গেছে। রাকিনের চোখ গড়িয়ে পড়েছিল মাত্র দুটি অশ্রু। হয়তো সেই দুই ফোঁটাতেই ছিল তার অনুচ্চারিত বিদায়—‘মা, বিদায়।’
টরন্টো শহর—কানাডার বহু সংস্কৃতির মিলনমেলা। শেরবোর্ণ স্ট্রিট থেকে শুরু করে ইটোবিকোর লেকশোর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে নানা জাতিগোষ্ঠীর অভিবাসী পরিবার। কেউ কেউ এসেছে জীবনের নতুন সম্ভাবনায়, কেউ এসেছে একে অপরের হাত ধরে ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে। মেহরুন নেসা মিতা ও সাব্বির মাহমুদ এসেছিলেন ২০০১ সালে, বাংলাদেশ থেকে। মিতার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা, আর সাব্বিরের বাড়ি নোয়াখালী। তারা শুরু করেছিলেন এক নতুন জীবন।
প্রথমে তারা থাকতেন শেরবোর্ণ এলাকায়। পরে চলে আসেন লেকশোরের কো-অপারেটিভ হাউজিং-এ, কোয়েন স্ট্রিটের এক ইউনিটে। সাব্বির কাজ করতেন স্কোশিয়া ব্যাংকে। কিন্তু মাসখানেক আগে কাজ চলে যায়। তখন থেকেই তার মেজাজ আরও চড়চড় করে উঠছিল।
প্রতিবেশীরা জানায়, এই দম্পতির মধ্যে সম্পর্ক ছিল বিষাক্ত। হাসি ছিল না, প্রেম ছিল না। ছিল কেবল সন্দেহ, হুমকি, আর নির্যাতন। সাব্বির সবসময় মিতাকে সন্দেহ করতেন। মারধোর করতেন। এমনকি একবার মিতা পুলিশও ডাকেন। কিন্তু কোন ব্যবস্থা হয়নি। আগের বছর একবার সাব্বির গ্রেফতারও হয়েছিলেন, কিন্তু কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।
জেবা জানিয়েছে, সে বহুবার তার মাকে অনুরোধ করেছিল—এই দানব পিতাকে ছেড়ে চলে যেতে। কিন্তু মিতা বলেছিলেন, “এটা করলে গুনাহ হবে।” এই ধর্মীয় ভীতির শিকলে বাঁধা পড়ে তিনি থেকে গিয়েছিলেন—আর হয়তো সেই সিদ্ধান্তই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
জেবা বলে—“আল্লাহ নিশ্চয়ই আমার মায়ের উপর খুশি। নিশ্চয়ই উনি বেহেশতে যাবেন।” তবে তার ভয় এখন আরও গভীর। সে আশঙ্কা করছে—তার পিতা যদি জেল থেকে বেরিয়ে আসে, তবে হয়তো তাকেও হত্যা করবে।
ঘটনার পর খুনি স্বামী নিজেই ৯১১-এ ফোন করে। পুলিশের কাছে সাহায্য চায়। পুলিশ এসে দেখতে পায় এক নারীর নিথর দেহ, আর ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে থাকা রক্তের গন্ধ। গ্রেফতার করে সাব্বির মাহমুদকে। তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ডিগ্রি খুনের অভিযোগ আনা হয়। পুলিশ জানায়, সে দুটি ছুরি ব্যবহার করে। প্রথম ছুরিটি স্ত্রীর বুকের হাড়ে ভেঙে যায়। এরপর রান্নাঘর থেকে সে আরেকটি ছুরি আনে এবং কাজ সম্পূর্ণ করে।
মিতার ভাই আবদুল্লাহ আল কাফি বাদল নিউ ইয়র্ক থেকে খবর পেয়ে টরন্টো আসেন। স্থানীয় নাগেট মসজিদে মিতার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শত শত বাংলাদেশি অংশগ্রহণ করেন। কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। পরে মিতার মরদেহ দাফন করা হয় পিকারিং গোরস্থানে।
আল্লাহ নিশ্চয়ই জেবার মায়ের ওপর খুশি। যিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সহ্য করেছেন নির্যাতন, রক্ষা করেছেন পারিবারিক বন্ধন—তিনি নিশ্চয়ই পবিত্রতার মর্যাদা পেয়েছেন পরপারে। তাঁর আত্মা যেন চিরশান্তিতে বিশ্রাম নিক—এ প্রার্থনাই আজ সকলের হৃদয়ের নিঃশব্দ উচ্চারণ।









