সম্পাদকের পাতা

এক আধুনিক অপরাধের নাট্যরূপ মন্ট্রিয়ল ব্যাংক জালিয়াতি

নজরুল মিন্টো

যেখানে আঙুলের ছাপে বন্দি আমাদের পরিচয়, আর ব্যাংকের লেনদেনে সাইবার চোখ সর্বক্ষণ নজর রাখে—সেই সময়ে যদি কেউ সাত লাখ আশি হাজার ডলারের বেশি অর্থ গায়েব করে দেয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে: প্রযুক্তি কি নিখুঁত? মানুষ কি সত্যিই এত সহজে ধরা পড়ে? ২০২১ সালে কানাডার মন্ট্রিয়লে ঘটে যাওয়া একটি চাঞ্চল্যকর ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় উঠে আসে এমনই এক জটিল প্রশ্ন।

এই কাহিনির নায়ক নয়, বরং প্রতারক—বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চারজন অভিবাসী, যারা কানাডার আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে গড়ে তোলে এক অভিনব আর্থিক অপরাধের নেটওয়ার্ক। মন্ট্রিয়লের ঠান্ডা হাওয়ায় তারা যেন রচনা করেছিল এক দুর্ধর্ষ অপরাধ নাটক, যার কেন্দ্রে ছিল ভুয়া কোম্পানি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, এবং ছায়ার মতো অদৃশ্য হওয়ার এক বিস্ময়কর পরিকল্পনা।

২০২০ সালের শেষদিকে মন্ট্রিয়লের National Bank of Canada-র Côte-des-Neiges শাখায় (স্থানীয়ভাবে ইন্ডিয়ান হেড এলাকা নামে অপ্রচলিত) তিনটি ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়—’Global Trade Nexus Inc.’, ‘Quebec BuildPro Ltd.’ এবং ‘TransAtlantic Holdings LLC’। কাগজে-কলমে এগুলো সম্পূর্ণ বৈধ প্রতিষ্ঠান বলে মনে হলেও, বাস্তবে এগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। জাল দলিলপত্র ও ভুয়া ঠিকানার মাধ্যমে খোলা এই অ্যাকাউন্টগুলোই পরবর্তীতে কানাডার ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যাংক জালিয়াতির সূচনা করেছিল।

অভিযুক্তরা সকলেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক। মোহাম্মদ রহিম, এই চক্রের প্রধান পরিকল্পনাকারী ও কৌশলবিদ, এক সময় টরন্টোর একটি মর্টগেজ ব্রোকারেজ ফার্মে কাজ করতেন, সেখান থেকেই তিনি ব্যক্তিগত ডেটা চুরি ও জালিয়াতির কৌশল আয়ত্ত করেন। আকিব হাসান ছিলেন একজন স্বঘোষিত ‘টেক স্পেশালিস্ট’, যিনি বাংলাদেশে আইটি পড়ে কানাডায় এসে বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে কাজ করতেন, কিন্তু পরে ডার্ক ওয়েবে সক্রিয় হয়ে পড়েন। জেসমিন ইসলাম, যিনি একসময় মন্ট্রিয়লের একটি স্থানীয় পোশাকের দোকানে চাকরি করতেন, এই চক্রে ছিলেন ক্যাশ লেনদেন ও জাল চেক জমা দেওয়ার দায়িত্বে। শফিকুল আলম ছিলেন তুলনামূলক অখ্যাত, কিন্তু পরে জানা যায় যে তিনি কানাডায় অভিবাসনের আগে চট্টগ্রামে একটি হুন্ডি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের সবাই কানাডায় অভিবাসী হয়ে স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছিলেন, কিন্তু প্রবাস জীবনের চমকপ্রদ আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের নামে জড়িয়ে পড়েন এক অপরাধী চক্রের মোহে।

প্রথমে তারা গড়ে তোলে একাধিক ভুয়া কোম্পানি। এরপর তৈরি করে ফটোশপ করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জাল CRA ট্যাক্স রিটার্ন এবং ভুয়া ইনভয়েস। এসব নথিপত্র ব্যবহার করে তারা চুরি করা SIN নম্বরের সাহায্যে মিথ্যা পরিচয়ে গ্যারান্টর দাঁড় করায় এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লোনের আবেদন করে। তবে তাদের সবচেয়ে অভিনব প্রতারণার কৌশল ছিল “চেক কাইটিং”। তারা একটি ব্যাংক থেকে আরেকটিতে জাল চেক ইস্যু করে, আর ক্লিয়ারিং টাইমের ফাঁক গলে সেই অর্থ তুলে নেয়। পুরো অপারেশন এতটাই নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত ছিল যে, মাত্র কয়েক মাসেই তারা প্রায় ৭৮০,০০০ ডলার হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয়।

এই টাকার একটা বড় অংশ হুন্ডি এবং ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাচার হয়। দুবাইয়ের “Golden Sands Trading FZE” নামের এক শেল কোম্পানির মাধ্যমে তৈরি হয় ভুয়া ইনভয়েস, আর বাংলাদেশের মোহাম্মদপুর থেকে টাকা চলে যায় নানা রুটে—বিকাশ, নগদ, এমনকি বিমানের লাগেজেও।

ঘটনার পেছনে ছিল আরেকটি রহস্যময় সত্তা—টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট (GhostLocker)। RCMP পরে জানতে পারে, এই ব্যক্তি Tor নেটওয়ার্কে “ShadowPenguin” নামে পরিচিত এবং পূর্বে রাশিয়ান ব্যাংক জালিয়াতিতে যুক্ত ছিল। GhostLocker ছিল Signal ও Telegram চ্যাট গ্রুপের মধ্যস্থ ব্যক্তি, যিনি এই পুরো অপারেশনে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেন।

ব্যাংকের পুরনো সফটওয়্যারটি (COBOL) ১৯৮০-এর দশকের, যা হ্যাকারদের জন্য সহজ লক্ষ্য। তারা একটি ম্যালিসিয়াস লিঙ্কের মাধ্যমে ব্যাংক কর্মীর কম্পিউটারে প্রবেশ করে (RAT ট্রোজান) এবং ডেটাবেসে জাল লেনদেন ঢুকিয়ে দেয় (SQL ইনজেকশন)। রাত দুইটা থেকে চারটার মধ্যে হ্যাকাররা ঢুকে পড়ে ব্যাংকের সার্ভারে। ফেক HR ইমেইলের মাধ্যমে ফিশিং হয় এক কর্মীর, আর তার পিসি ব্যবহার করেই ঢুকে পড়ে অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে। জাল লেনদেন অনুমোদন পায় এক সিনিয়র ম্যানেজারের মাধ্যমে, যিনি পরে $1.2 মিলিয়নের বিনিময়ে মিয়ামিতে একটি ভিলা কিনে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যান। সর্বশেষ, ব্যাংক ম্যানেজার-এর মিয়ামির ভিলাটি এখন FBI-র তদন্তাধীন, কারণ সেখানে রাশিয়ান হ্যাকারদের সাথে তার যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে।

২০২২ সালে RCMP গ্রেফতার করে রহিম ও আকিবকে। শফিকুল জামিন নিয়ে পালিয়ে যায়। জেসমিন কারাবন্দি। কিন্তু সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ছিল ২০২৪ সালের মার্চে রহিমের আত্মীয় শাদমান ইসলামের গ্রেফতার, যিনি ছিলেন মন্ট্রিয়লের এক রেস্টুরেন্ট মালিক এবং যার ফোনে দেখা যায় বাংলাদেশের একজন এমপির সাথে সংযোগ। সর্বশেষ, শফিকুল আলমের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ধরা পড়ে সে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অবস্থান করছে।

ক্রিপ্টো লেনদেনে ব্যবহার হয় Wasabi Wallet, Binance ও পরবর্তীতে Monero। ট্যাগ ছিল: “BDesh2021″। RCMP Chainalysis দিয়ে কিছু ফান্ড ট্র্যাক করতে পারলেও Monero-তে হোয়াইটওয়াশ হওয়া ফান্ড ফেরত পাওয়া যায়নি। একইসাথে, অভিযুক্তরা ব্যবহার করে AI-ডিপফেক ভয়েস ক্লোনিং—ব্যাংক ম্যানেজারের কণ্ঠ নকল করে ইমার্জেন্সি অথরাইজেশন করানো হয়।

এই পুরো কেসে একাধিকবার উঠে আসে বাংলাদেশের রাজনীতির নাম। ঢাকার একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির অ্যাকাউন্টে $300,000 জমা হয়, যার মালিক রহিমের শ্বশুর। এক প্রাক্তন মন্ত্রী ও এক BFIU কর্মকর্তা এই পাচারে জড়িত ছিলেন বলে সন্দেহ রয়েছে। ইন্টেলিজেন্স সূত্রে জানা যায়, তিনি ‘মৎস্য চাষ’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে $৭৫,০০০ লেনদেন করেন। বাংলাদেশ থেকে তথ্য চাওয়া হলেও তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনার পর কানাডা সরকার পাস করে “মন্ট্রিয়ল এক্ট ২০২৩”। $10,000-এর বেশি লেনদেনে বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক হয়। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলিকে CRA-তে রিপোর্ট করতে হয়। AI-ভিত্তিক ফ্রড ডিটেকশন টুল Darktrace চালু করে ব্যাংক।

এই ঘটনাটি নিছক একটি ব্যাংক জালিয়াতির গল্প নয়। এটি আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার, দুর্বল ব্যাংকিং সিকিউরিটি, আর আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেটের এক প্রতিচ্ছবি। যেখানে একটি ফেক ইনভয়েস, একটি ফিশিং ইমেইল, একটি ডিপফেক ভয়েস—একত্রে সৃষ্টি করে কোটি টাকার ধোঁকা। এবং এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু আইন দিয়ে নয়, প্রযুক্তি, সচেতনতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সম্ভব।

সূত্র:

  • CBC News (২০২২): “Montreal bank fraud: Bangladeshi-Canadian group accused of $780K scam”
  • Montreal Gazette (২০২৩): “Inside the $780K Montreal bank heist: Fake companies, crypto trails”
  • Gulf News (UAE, ২০২২): “Dubai shell company tied to Montreal fraud case”


Back to top button
🌐 Read in Your Language