সম্পাদকের পাতা

এক বাঙালি নারীর জীবন্ত স্মৃতি টরন্টোর রত্না লেন

নজরুল মিন্টো

টরন্টো ডাউনটাউনের রিজেন্ট পার্ক এলাকায় একটি রাস্তার নাম এখন ‘রত্না লেন’। এটি কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ নয়, কিংবা কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির নামে রাখা রাজপথও নয়। এই পথ এক বাংলাদেশি নারীর নিঃশব্দ উপস্থিতির স্মারক, যিনি প্রতিদিন এখান দিয়ে হেঁটেছেন, মানুষকে সহায়তা করেছেন, হয়ে উঠেছিলেন নির্ভরতার এক নাম। তিনি আজ আর নেই, কিন্তু তাঁর পদচিহ্ন যেন রয়ে গেছে এই পথের প্রতিটি বাঁকে। যারা আজ এখানে হাঁটেন কিংবা বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নেন, তাঁরা হয়তো জানেন না—এই পথ এক সময় ছিল এক নারীর নীরব যাত্রাপথ, যা আজ শহরের হৃদয়ে গাঁথা এক গভীর স্মৃতি।

রিজেন্ট পার্কের সকাল-দুপুর বিকেলগুলো শহরের অন্যসব জায়গার মতোই—মানুষ কাজে যায়, ফিরে আসে। কেউ স্কুলে যায়, কেউ দোকানে। অনেক পথচারীরই যাওয়া-আসার একটা নির্দিষ্ট পথ থাকে, এবং সে পথের বাঁকে বাঁকে গড়ে ওঠে অভ্যাস, চেনা মুখ, পরিচিত দৃশ্য। তেমনই এক পথ ছিল ডানডাস স্ট্রিটের ধারে, যেখান দিয়ে এক নারী নিয়মিত হেঁটে যেতেন—বন্ধুদের বাসায়, কমিউনিটি সেন্টারে, কিংবা কারও পাশে দাঁড়াতে, যাকে তিনি হয়তো খুব ভালো করে চিনতেন না। নারীটির নাম ছিল ইসমত আরা রত্না।

সিলেটের মেয়ে ইসমত আরা রত্না ২০০০ সালে কানাডায় আসেন। তিনি রিজেন্ট পার্ক এলাকায় বসবাস করতেন এবং স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে একজন সুপরিচিত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন তিন সন্তানের মা। তাঁর স্বামীর নাম মিসবাহ আহমেদ। রত্নার পরিবার ছিল বিস্তৃত—তাঁর পাঁচ ভাইয়ের পরিবারও টরন্টোয় বসবাস করত।

এই শহরে, যেখানে মানুষ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, রত্না ছিলেন ব্যতিক্রম। নিজের সময়ের মধ্যে থেকেও তিনি অন্যের জন্য সময় বের করতেন—যেমনটা সবাই পারে না। রত্না প্রবাসী বাঙালিদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করতেন, যেমন—ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টে সঙ্গ দেওয়া, ইমিগ্রেশন বা হাউজিং সংক্রান্ত কাজে সহায়তা, শিশুদের জন্য চাইল্ড কেয়ার সেবা খুঁজে দেওয়া, এবং ভাষাগত ও মানসিক সমর্থন প্রদান। তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা পার্ক পাবলিক স্কুল কমিউনিটিরও একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন।

২০১৯ সালের এক দুপুরে ডানডাস স্ট্রিট ইস্টের ফুটপাথ ধরে রত্না হেঁটে যাচ্ছিলেন, এক বন্ধুর বাসার দিকে। মাথার উপর ছিল নীল আকাশ, আর শহর ছিল যথারীতি ব্যস্ত—গাড়ির শব্দ, মানুষ চলাচল, জীবন ছুটে চলছিল তার নিজস্ব গতিতে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই একটা নিয়ন্ত্রণ হারানো গাড়ি, আছড়ে পড়ল ফুটপাথে। আগুনের মতো সেই ধাতব বিকটতা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল এমন এক জগতে, যেখান থেকে তার আর ফেরা হলো না।

এভাবেই এক নারী নিভে গেলেন। পুলিশ বলল—“Impaired Driving”। আইন বলল—“Criminal Negligence”। সংবাদমাধ্যম বলল—“Mother of Three Killed in Hit-and-Run”। কিন্তু যারা তাকে চিনত, তারা জানে, একজন ইসমত আরা রত্নার মৃত্যু মানে কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি পুরো কমিউনিটির হৃদয়ের ক্ষরণ।

ঘটনাস্থলে তিনি মারা যান। চালক পালিয়ে গেলেও, ধরা পড়ে গেল পুলিশ হাতে। অপরাধের তালিকায় ছিল ‘মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালানো’, ‘বেপরোয়া গতি’, ‘ঘটনাস্থল ত্যাগ’—তবে এসব ফৌজদারি অভিযোগ কোনোদিন পূরণ করতে পারবে না সেই শূন্যতা, যা রেখে গেছেন ইসমত আরা।

তিনি ছিলেন না কোনো লেখিকা, না সমাজসেবিকার স্বীকৃত মুখ। কিন্তু তাঁকে যাঁরা চিনতেন, তাঁরা জানতেন—সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধের চেয়ে বড় কোনো পদবি নেই। তাঁর মৃত্যুতে কেঁদেছে একটি গোটা মহল্লা।

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত—দুর্ঘটনা, মৃত্যু, শোক। কিন্তু না, বাস্তবতা আরও কিছু লিখে রেখেছিল। এই গল্পে আছে এক সম্মিলিত লড়াই—একটি কমিউনিটির, যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাঁকে ভুলে যাওয়া যাবে না।

চার বছর পর, ২০২৩ সালের ৮ জুলাই। রিজেন্ট পার্কে রত্না লেনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলো। লেন নয়, যেন স্মৃতির এক খোলা ক্যানভাস—যেখানে বসানো হয়েছে শিল্পকর্ম, বেঞ্চে বসে শিশুরা আঁকছে। এ এক লেন, যেখানে পথ নয়, পায়ের ছাপ কথা বলে।

রত্নার ভাতিজি নুজহাত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, “এই পথটি যেমন মানুষের মধ্যে বন্ধন গড়ার জায়গা, ঠিক তেমনই আমার ফুফুও ছিলেন এমন একজন, যিনি মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয় জোড়া লাগাতেন। তিনি ছিলেন আমাদের হৃদয়ের ঠিকানা।”

উদ্বোধনের দিন সবাই দাঁড়িয়ে ছিল, যখন “রত্না লেন” লেখা ব্যানার খোলা হলো ফুল দিয়ে সাজানো গেটের নিচে। একজন স্থানীয় নেতা বললেন, “এই লেন শুধু পাথর ও ইটের সমষ্টি নয়, এটি হৃদয়ের জায়গা। এটি একজন নারীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা।”

বাচ্চারা তখন ছবি আঁকছিল, কেউ রঙ তুলছিল লাল, কেউ নীল। একজন বলল, “আমি একটা মেয়ে আঁকছি, তার গায়ে শাড়ি, হাতে থলে, আর মুখে হাসি।”

তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “এটা কে?”

সে বলল, “রত্না আন্টি।”

রত্না লেন এখন আর শুধু একটি নাম নয়, এটি হয়ে উঠেছে জীবনের প্রতীক, যেখানে প্রতিটি পাথরে লেখা আছে স্মৃতির অক্ষর। ছোট ছোট শিশুরা যখন খেলে, মা-বাবারা যখন হাঁটে, প্রবীণরা যখন বেঞ্চে বসে রোদ পোহায়—তখন যেন অদৃশ্যভাবে ইসমত আরা রত্নাও হাঁটেন তাদের সঙ্গে। তাঁর চলার সেই শেষ পথ—ডানডাস স্ট্রিট ধরে রিজেন্ট পার্কের দিকে, এখন যেন প্রতিদিন কেউ না কেউ হাঁটছেন তাঁর হয়ে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language