
কপালের নাম গোপাল! আর লটারির দেশ কানাডা! গল্পটা এমন, যেখানে ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় প্রতিদিন। কানাডার লোকেরা লটারিকে সংক্ষেপে বলে ‘লটো’। কত রকমের লটো যে এখানে আছে তা দেখে মাথা ঘুরে যেতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে আগত বাঙালিদের মধ্যে খুব কম লোকই আছেন, যারা কখনো লটো খেলেননি। আমার জানা মতে একজন বাঙালি দুবার লটো পেয়ে মিলিয়নারের তালিকায় নাম তুলে ফেলেছেন। আরও একজন পেয়েছেন ২৫ হাজার ডলার। দশ, বিশ, পঞ্চাশ ডলার পাওয়া তো নিত্য দিনের ব্যাপার!
আমার বন্ধুদের আবার লটো নিয়ে আলাদা আলাদা গল্প আছে। প্রতিটি ড্রতেই তাদের কারো কারো কান ঘেঁষে নম্বর যায়। আমার এক বন্ধু সে যে নম্বরটা কাটে, তার ঠিক আগের কিংবা পরের নম্বরটি আসবেই। বন্ধুর এই দুর্ভাগ্য নিয়ে রসিকতার শেষ নেই, কিন্তু তার আফসোসও ফুরোয় না। আমি অবশ্য নিয়মিত লটো খেলোয়াড় নই। তবুও দোকানে গেলে দু-একটা টিকেট কাটার সুযোগ মিস্ করি না।
গত সপ্তাহে শপার্স ড্রাগমার্টে গিয়ে চারখানা টিকেট কিনলাম। পরদিন সকালে পত্রিকা খুলে নম্বর মেলাতে বসে দেখি- একটাও লাগেনি! হতাশ হয়ে এনকোর-এর নম্বরে চোখ বোলাতে গিয়ে বুকের ভেতরটা হঠাৎই নড়েচড়ে উঠলো।

প্রথম নম্বর মিলেছে! দ্রুততার সাথে দ্বিতীয়, তৃতীয় নম্বর মিলাতেই আমার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে লাগলো। চারপাশে কেউ নেই দেখে একাই লাফালাফি শুরু করলাম। চতুর্থ নম্বরটাও মিলিয়ে দেখি, ওরে বাবা! বন্ধুর মতো আমিও ‘কান ছুঁয়ে’ গেছি। শেষে নিচে গিয়ে কোরিয়ান দোকানদারের হাতে টিকেট ধরিয়ে দিলাম। দোকানদার হাসিমুখে ৫০ ডলারের একটি নোট দিলেন। কানাডার জীবনে এটা আমার প্রথম অর্জন। তারপর ১০০০ ডলার সর্বোচ্চ পেয়েছি!
লটো আসলে ভাগ্যের খেলা। ইতিহাস বলে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লটারি খেলা হয় স্পেনে। এই স্প্যানিশ লটারি ‘এল গর্ডো’ নামে বিখ্যাত। প্রতিবছর বড়দিনে এই লটারিতে কোটি কোটি ইউরো জেতেন ভাগ্যবানরা।
লটারির ইতিহাস বহু পুরনো। চীনে খ্রিস্টপূর্ব ২০৫ সালে প্রথম লটারির প্রচলন হয়। ইউরোপে এর বিস্তার ঘটে রোমান সাম্রাজ্যের আমলে। কানাডার লটারির ইতিহাস খুব বেশি পুরনো না হলেও, জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছে অনেক দেশকেই পেছনে ফেলে। এখানে মানুষ শখের বসে লটো কাটে। লাগলে পকেটে পুরে নেয়, না লাগলে টিকেটটা ছিঁড়ে ফেলে দেয়- এতেই আনন্দ। তবে নেশাখোর প্লেয়ারও আছে বৈকি!
আশ্চর্যের বিষয়, কানাডায় লটো নিয়ে বিভিন্ন কমিউনিটিতে সিরিয়াস গবেষণাও আছে। সম্প্রতি জানতে পারলাম, আমাদের বাংলাদেশ কমিউনিটির কয়েকজন নাকি গত কয়েক বছর ধরে নিবিড়ভাবে লটোর গবেষণায় নিমগ্ন। তাদের কাছে লটোর ইতিহাস মুখস্থ, আর একেকজন তাদের ঘরে নাকি লটো সংক্রান্ত প্রচুর বই-পুস্তকও জমা করেছেন।

এসব গবেষকেরা দুই বা তিন ডলারের টিকেট কাটেন না, তারা একসাথে ৮০ থেকে ১০০, কখনো বা গ্রুপভিত্তিক ২০০-৩০০ ডলার পর্যন্ত টিকেট কিনে ভাগ্য পরীক্ষা করেন।
লটোর সবচেয়ে মজার গল্পগুলো আসে সেই মানুষদের কাছ থেকে, যাদের জীবনে হঠাৎ ধনী হওয়ার ঘটনা ঘটে গেছে। আমেরিকায় এমন একজনের গল্প প্রচলিত, যিনি একজন হোমলেস। একদিন কৌতূহলবশত মাত্র এক ডলার দিয়ে একটি লটোর টিকেট কিনলেন। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলেন, তিনিই জিতেছেন ৪ কোটি ডলার! ভিখারি থেকে কোটিপতি! ভাগ্যের খেলা বুঝি এমনই।
তবে লটো জিতে মানুষ নানারকম পাগলামিও করে। কানাডার ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা হঠাৎ বড় লটো পেয়ে পাগলের মতো আনন্দে রাতদিন পার্টি করেছেন, তারপর কয়েক মাসেই সব টাকা উড়িয়ে আবার নিঃস্ব হয়ে গেছেন। আবার উল্টোটাও আছে। কেউ কেউ লটোর টাকা মানবতার কল্যাণে দান করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।









