সম্পাদকের পাতা

কল্পনার এক উৎসবের নাম হ্যালোয়িন

নজরুল মিন্টো

অক্টোবরের শেষ দিনটা উত্তর আমেরিকার শিশুদের জন্য যেন এক স্বপ্নের রাত। সারাবছর অপেক্ষার পর তারা সেজে ওঠে জাদুকর, প্রেত, রাজকন্যা কিংবা ব্যাটম্যানের সাজে। ঘরে ঘরে কুমড়ার আলো, দরজায় দরজায় কণ্ঠে ভেসে আসে ‘ট্রিট অর ট্রিক!’—সেই ছোট্ট বাক্যে মিশে থাকে শত বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আধুনিকতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

হ্যালোয়িনের শেকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় দুই হাজার বছর আগের সেল্টিক ‘স্যাওইন’ (Samhain) নামক উৎসবে। তখনকার মানুষ বিশ্বাস করত, বছরের এই দিনটিতে জীবিত আর মৃতের জগৎ মিশে যায়। রোমান শাসন, খ্রিস্টীয় ধর্ম ও মধ্যযুগীয় ইউরোপের হাত ঘুরে সেই উৎসবটি রূপ নেয় আজকের হ্যালোয়িনে।

একসময় এ দিনকে নববর্ষের মতো ধরা হতো, যেখানে পুরোনো দেনাপাওনা মিটিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হতো। পরবর্তীকালে তা রূপ নেয় ভূতের পোশাক পরা, কুমড়া খোদাই আর ক্যান্ডি সংগ্রহের আনন্দঘন উৎসবে।

এই উৎসবের সবচেয়ে চেনা চিহ্ন সম্ভবত কমলা কুমড়ার মধ্যে জ্বলজ্বল করা আলো। কুমড়ার নাম “জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন”, যার পেছনে রয়েছে একটি পুরোনো আইরিশ লোককাহিনি। এক প্রতারক লোক, স্টিঙ্গি জ্যাক, মৃত্যুর পর না স্বর্গে না নরকে জায়গা পায়। সে তখন কুমড়ার ভেতরে আগুন জ্বেলে অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতে থাকে। এই গল্প থেকেই এসেছে কুমড়ার মধ্যে আলো জ্বালানোর প্রথা।

আমাদের দেশে কুমড়া মানেই তরকারি। কিন্তু উত্তর আমেরিকায় এই শাকসব্জি চাষ হয় মূলত হ্যালোয়িনের জন্য। বড় বড় কুমড়ার বাজার বসে অক্টোবর জুড়ে, যেখানে শত রকম কুমড়া বিক্রি হয় শুধুই এই একটি রাতের জন্য।

হ্যালোয়িনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো বাচ্চাদের পোশাক। কেউ সাজে জাদুকর, কেউ ডাইনী, কেউবা মমি, কেউ আবার চিরচেনা স্পাইডারম্যান। তারপর শুরু হয় ‘ট্রিট অর ট্রিক’ নামের এক মজার রীতি। শিশুরা পাড়ার বাড়ির দরজায় গিয়ে বলে এই বাক্যটি। যার মানে—ক্যান্ডি দাও, না হলে জাদু দেখাবো! বেশিরভাগ বাড়ি আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে, ক্যান্ডি দিয়ে ভরিয়ে দেয় ছোটদের ঝোলানো ব্যাগ।

অক্টোবরের হিমেল হাওয়ায় হ্যালোয়িন রাত যেন এক অদ্ভুত কল্পনাময় যাত্রা। শহরের রাস্তাগুলো ঝুলছে জাল, কঙ্কাল আর চিৎকার করা মুখের মুখোশে। দোকানে ভৌতিক সাউন্ড চলছে, স্কুলে চলছে কস্টিউম প্রতিযোগিতা। অনেক পরিবার মিলে রাতের ডিনারে জমায়েত হয়, শিশুদের হাসি-ঠাট্টায় ভরে যায় রাত।

বাড়ির সামনে যদি কুমড়ার আলো জ্বলে, তবে বুঝতে হবে তারা ‘ট্রিট অর ট্রিক’ এর জন্য প্রস্তুত। কেউ কেউ বাড়ির আঙিনায় ছোট ভূতের ট্রেইল বানায়—যেখানে শিশুরা প্রবেশ করেই আনন্দে হেসে ওঠে বা ভয় পেয়ে দৌড়ে পালায়!

হ্যালোয়িন কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি একধরনের লোকজ সংস্কৃতি। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, এমন কিছু কিছু ‘কুসংস্কার’ আছে, যা কারো ক্ষতি করে না, বরং আনন্দ ছড়ায়। মানুষ ভয়ের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পায়, আর শিশুরা এই রীতিতে শিখে সামাজিকতা, সাহস, আর সংস্কৃতির বহুত্ব।

বিশ্বায়নের যুগে হ্যালোয়িন এখন কেবল আমেরিকা-কানাডার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিশ্বের নানা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে।

কানাডা-আমেরিকায় বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারের কাছে হ্যালোয়িন একটি নতুন অভিজ্ঞতা। অনেক বাবা-মা শুরুতে দ্বিধায় থাকলেও পরে সন্তানের মুখে হাসি দেখে নিজেরাও উৎসবে মেতে ওঠেন।

অন্য সংস্কৃতিকে জানতে শিখলে নিজের সংস্কৃতিও আরও গভীরভাবে ধরা দেয়। তাই ক্যান্ডির ঝোলায় শুধু চকলেট নয়, জমা হোক শিশুর চোখের কল্পনা, এক টুকরো ইতিহাস আর অসংখ্য নতুন গল্প।

ট্রিট অর ট্রিক?—নিশ্চয়ই ট্রিট।

হ্যাপি হ্যালোয়িন!


Back to top button
🌐 Read in Your Language