
শীতের বরফগলা নদীর মতোই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে কানাডার রাজনৈতিক ভূচিত্র। বিশ্বজুড়ে যখন বৈচিত্র্যের সংকোচন ও বিভেদের দেয়াল উঁচু হয়ে উঠছে, তখন কানাডা তার গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন ইতিহাস রচনা করছে—বর্ণ, ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য সমান সুযোগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে। সদ্য সমাপ্ত ফেডারেল নির্বাচনে বিভিন্ন পেশা, বয়স ও জাতিগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা ১৫ জন মুসলিম প্রার্থীদের বিজয় সেই বহুত্ববাদী চেতনার এক বাস্তব রূপ। এঁরা কেউ শরণার্থী, কেউ প্রবাসে জন্মানো দ্বিতীয় প্রজন্ম, কেউবা একক প্রচেষ্টায় গড়া সমাজকর্মী, আবার কেউ অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেরিয়ে আসা জনসেবায় উৎসর্গিত মানুষ। তাঁদের বিজয় শুধু একক সাফল্যের গল্প নয়; বরং এটি কানাডার অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির, সহনশীল সমাজের, এবং আশা-ভরসার এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এ লেখায় নির্বাচিত মুসলিম সংসদ সদস্যদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।
আবদেলহাক সারি: কমিউনিটি সংগঠক থেকে সংসদ সদস্য
আবদেলহাক সারি কুইবেকের বোরাসা থেকে লিবারেল পার্টির হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি স্থানীয় মারি-ক্লারাক ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং পাবলিক সিকিউরিটি কমিশনের ভাইস-চেয়ারম্যান ছিলেন। অভিবাসী সমাজের মধ্যে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে তিনি দীর্ঘদিন সামাজিক উন্নয়নে কাজ করেছেন।
তিনি আফ্রিকা ও কানাডায় এতিমদের সহায়তাকারী সংগঠন “Soleil des Orphelins”-এর সহ-সভাপতি এবং কোভিডকালে ত্রাণ উদ্যোগের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। জনগণের সাথে নিবিড় সংযোগের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে জনভিত্তি গড়ে তুলেছেন।
ফয়সাল এল-খুরি: অভিবাসী প্রকৌশলী থেকে অভিজ্ঞ এমপি
লেবাননে জন্ম নেওয়া ফয়সাল এল-খুরি ১৯৭৬ সালে যুদ্ধের সময়ে কানাডায় পাড়ি জমান। বর্তমানে তিনি কুইবেকের লাভাল—লে ইলস থেকে পুনরায় লিবারেল পার্টির সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ফয়সাল কানাডার বহুজাতিক সমাজে একজন সচেতন ও বিচক্ষণ কণ্ঠস্বর। ২০১৫ সাল থেকে তিনি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন, যেখানে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি তিনি সমাজসেবায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।
ফারেস আল সৌদ: তরুণ সমাজসেবী থেকে রাজনীতিক
মন্ট্রিয়ালে জন্ম নেওয়া এবং মিসিসাগায় বেড়ে ওঠা ফারেস আল সৌদ এবার মিসিসাগা সেন্টার থেকে লিবারেল এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং খাদ্যব্যাংক ও রেডক্রসের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন।
তিনি সরকারি প্রশাসনে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছেন। তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী বাসস্থান, হেলথকেয়ার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সহায়তা—যা তরুণ প্রজন্মকে যথার্থ প্রতিনিধিত্ব দেয়।
সিমা আকান: ইতিহাস গড়া প্রথম তুর্কি এমপি
সিমা আকান এইবার অন্টারিওর ওকভিল ওয়েস্ট থেকে লিবারেল পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন। তিনি কানাডার সংসদে নির্বাচিত প্রথম তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী এমপি।
বহুজাতিক সমাজে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। অভিবাসী ও ইসলামোফোবিয়া বিরোধী কার্যক্রমের জন্য তিনি তুর্কি কমিউনিটির গর্ব।

আলি এহসাসি: ইরানি বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক কণ্ঠ
জেনেভায় জন্ম নেওয়া আলি এহসাসি ইরানীয় বিপ্লবের সময়ে পরিবারসহ কানাডায় আসেন। তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, ওসগুড হল এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
ইরান সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে সোচ্চার এই নেতা Preventing Genocide অল-পার্টি গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করছেন।
আহমেদ হুসেন: শরণার্থী থেকে মন্ত্রী
সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া আহমেদ হুসেন কিশোর বয়সে শরণার্থী হিসেবে কানাডায় আসেন। তিনি একজন আইনজীবী এবং অভিবাসন, বৈচিত্র্য, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এবং আবাসন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ইয়র্ক সাউথ—ওয়েস্টন থেকে পুনরায় নির্বাচিত।
জিয়াদ আবুলতাইফ: ব্যবসায়ী থেকে কনজারভেটিভ এমপি
লেবানন থেকে আগত জিয়াদ আবুলতাইফ ১৯৯০ সালে কানাডায় আসেন। তিনি একটি আসবাব বিতরণ কোম্পানির মালিক এবং ২০১৫ সাল থেকে এডমন্টন ম্যানিং থেকে এমপি।
তিনি রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও আর্থিক শৃঙ্খলার পক্ষপাতী। বাজেট সচেতনতা, ক্ষুদ্র ব্যবসা উন্নয়ন এবং কমিউনিটি স্থিতিশীলতায় তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
তালিব নূরমোহাম্মদ: বৈশ্বিক চিন্তক
অটোয়ায় জন্ম নেওয়া ও ভ্যাঙ্কুভারে বেড়ে ওঠা তালিব নূরমোহাম্মদ একজন পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ। তিনি প্রিন্সটন, হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।
ভ্যাঙ্কুভার গ্রানভিল থেকে নির্বাচিত এই তরুণ রাজনীতিক সামাজিক ন্যায়বিচার, উদ্ভাবন ও বৈচিত্র্যের পক্ষে সংসদে এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ।

শফকাত আলী: মুসলিম কণ্ঠ
পাকিস্তান বংশোদ্ভূত শফকাত আলী ২০২১ সালেই নির্বাচিত হয়েছিলেন ব্র্যাম্পটন সেন্টার থেকে। এবার তিনি ব্র্যাম্পটন-চিংকুসি পার্ক নামের নতুন নির্বাচনী এলাকা থেকে আবারও লিবারেল পার্টির হয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। শফকাত নিজে দীর্ঘদিন রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি একজন পিতাও—তাঁর দুই সন্তান স্কুলে পড়ে।
তিনি ইসলামিক সোসাইটির একজন কার্যকর সদস্য, স্থানীয় মসজিদের সঙ্গে যুক্ত, এবং নিয়মিত দাতব্য কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শফকাতের কাছে রাজনীতি মানে “কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং কমিউনিটির অভ্যন্তরীন সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজা।”
সমীর জুবেরি: মানবাধিকার কর্মী থেকে সংসদ সদস্য
সমীর জুবেরি কুইবেকের পিয়েরেফঁস–ডলার্ড থেকে লিবারেল পার্টির হয়ে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর পিতামাতা স্কটিশ-ইতালিয়ান এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত।
তিনি গণিতে স্নাতক এবং আইনশাস্ত্রে ডিগ্রিধারী। সংসদে তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিটির চেয়ারে ছিলেন এবং উইঘুর মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে এম-৬২ প্রস্তাব পাসে নেতৃত্ব দেন। তাঁর কাজ বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক নীতির পক্ষে এক নিরলস সংগ্রাম।
আসলাম রানা: প্রকৌশলী থেকে জনপ্রতিনিধি
পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া আসলাম রানা ২০০৩ সালে কানাডায় আসেন। এইবার তিনি অন্টারিওর হ্যামিল্টন সেন্টার থেকে লিবারেল পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
তিনি পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং পাঁচ সন্তানের জনক। কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার উন্নয়নে তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় সক্রিয় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো পরিবার-কেন্দ্রিক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
ইয়াসির নাকভি: আন্দোলনকারীর সন্তান থেকে ন্যায়বিচারমন্ত্রী
করাচিতে জন্ম নেওয়া ইয়াসির নাকভি ১৯৮৮ সালে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে পরিবারসহ কানাডায় আসেন। তাঁর বাবা ছিলেন পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী।
তিনি ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও অটোয়া ল’ স্কুলে পড়াশোনা করেন। প্রদেশীয় রাজনীতিতে অন্টারিওর অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে Safe Access to Abortion আইন ও ডিজিটাল জাস্টিস অ্যাকশন প্ল্যান চালু করেন। এবার তিনি অটোয়া সেন্টার থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন।
ইকরা খালিদ: ন্যায়বিচারের কণ্ঠস্বর
লাহোরে জন্ম নেওয়া ইকরা খালিদ ১৯৯৮ সালে পরিবারসহ কানাডায় আসেন। বর্তমানে তিনি অন্টারিওর মিসিসাগা—এরিন মিলস থেকে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অপরাধবিদ্যা ও পেশাগত লেখালেখি এবং আমেরিকার কুলি ল’ স্কুল থেকে জুরিস ডক্টর ডিগ্রি অর্জন করেন। পার্লামেন্টে তিনি মানব পাচার, প্রবীণ নির্যাতন এবং রোহিঙ্গা গণহত্যা স্বীকৃতির মতো বিষয়ের পক্ষে সোচ্চার। ২০১৭ সালে তিনি ‘চাটেলেইনের ওম্যান অফ দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন।
সালমা জাহিদ: প্রত্যাবর্তনের প্রতীক
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সালমা জাহিদ ২০১৫ সাল থেকে অন্টারিওর স্কারবোরো সেন্টার থেকে লিবারেল এমপি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। সালমা শিক্ষা ও ব্যবসা শাস্ত্রে স্নাতক।
স্টেজ ৪ নন-হজকিন লিম্ফোমা থেকে সুস্থ হয়ে ২০১৮ সালে তিনি হিজাব পরিহিত প্রথম এমপি হন। নারী অধিকার, মুসলিম কমিউনিটির নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়ের বিষয়ে তিনি সংসদে সক্রিয়।
ওমর আল-গাবরা: সিরীয় শরণার্থী থেকে মন্ত্রী
ওমর আল-গাবরা অন্টারিওর মিসিসাগা সেন্টার থেকে পুনরায় লিবারেল পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি সৌদি আরবে জন্ম নেওয়া সিরীয় বংশোদ্ভূত একজন অভিবাসী, যিনি কিশোর বয়সে কানাডায় আসেন।
ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি এমবিএ করেন ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস থেকে। তিনি বাণিজ্যিক খাতে কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি, পরবর্তীতে মন্ত্রী (Minister of Transport) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জলবায়ু-সহিষ্ণু পরিবহন ব্যবস্থা, এভিয়েশন নিরাপত্তা ও ট্রানজিট নীতিমালায় তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে সংসদে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বে তাঁর সরব ভূমিকা তাঁকে মুসলিম সমাজে জনপ্রিয় করে তুলেছে। তিনি গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ এবং অভিবাসন বন্ধুত্বপূর্ণ নীতির একজন দৃঢ় সমর্থক।
এই নবনির্বাচিত মুসলিম এমপিরা কানাডার সংসদকে যে কেবল সংখ্যাগতভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তা নয়, তাঁরা নিয়ে এসেছেন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, বহুস্বর, এবং সমাজের নানা স্তরের মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চাহিদার প্রতিনিধিত্ব। তারা প্রমাণ করেছেন—কানাডার রাজনীতি এখন আর শুধুমাত্র প্রথাগত অভিজাত গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ক্রমশ পরিণত হচ্ছে একটি বহুজাতিক, বহু-সংস্কৃতির, বহুমাত্রিক মত ও মানসের মিলনমেলায়, যেখানে প্রত্যেক কণ্ঠস্বর মূল্যবান। এই নির্বাচনী সাফল্য শুধু মুসলিম সমাজের জন্য নয়, বরং কানাডার ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্যও এক আশাব্যঞ্জক সংকেত। বৈচিত্র্যের এ জয়যাত্রা চলুক—ভবিষ্যতের কানাডা হোক আরও উদার, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, আরও মানবিক।









