
বিশ্বকাপের মাঠে কখনও কখনও সবচেয়ে বড় গল্পটি বড় দলের নয়। সেটি লুকিয়ে থাকে আটলান্টিকের ছোট দ্বীপে, মধ্যপ্রাচ্যের মরু-হাওয়ায়, মধ্য এশিয়ার দীর্ঘ অপেক্ষায়, অথবা সমুদ্র পেরিয়ে ছড়িয়ে থাকা অভিবাসী মানুষের বুকের ভেতর। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্সের নাম শুনলে ফুটবলের ইতিহাস নিজেই যেন উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডান বা উজবেকিস্তানের নাম উচ্চারণ করলে সামনে আসে আরেক ধরনের সৌন্দর্য। সেখানে ট্রফির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে উপস্থিতি, জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে পরিচয়।
২০২৬ বিশ্বকাপ এই কারণেই আলাদা। ৪৮ দলের নতুন কাঠামো শুধু টুর্নামেন্ট বড় করেনি; ফুটবলের মানচিত্রও আরও প্রসারিত করেছে। ফিফা নিজেই কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানকে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথমবারের অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, উত্তর আমেরিকার এই আসরে এই চার দেশ প্রথমবার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়াচ্ছে।
কেপ ভার্দে, আটলান্টিকের বুকে ছড়িয়ে থাকা ছোট দ্বীপপুঞ্জ। সেনেগালের উপকূল থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে তার অবস্থান। জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি। অথচ সেই দেশই বিশ্বকাপে এসে স্পেনের মতো ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়েছে, তারপর উরুগুয়ের বিপক্ষেও ২-২ ড্র করে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ গোলের স্মৃতি লিখেছে। ফুটবলের হিসাব-নিকাশে এটি হয়তো একটি ফলাফল। কিন্তু কেপ ভার্দের মানুষের কাছে এটি জাতীয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
কেপ ভার্দের গল্পে সমুদ্র আছে, উপনিবেশের ইতিহাস আছে, অভিবাসী মানুষের দীর্ঘ পথ আছে। দলটির অনেক ফুটবলার জন্মেছেন ইউরোপে, কেউ নেদারল্যান্ডসে, কেউ আয়ারল্যান্ডে, কেউ অন্য কোনো দেশে। কিন্তু জার্সির রং, পতাকার মানে আর দেশের ডাক তাদের এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। ছোট একটি দ্বীপদেশের জন্য বিশ্বকাপ তাই শুধু খেলা নয়; এটি পৃথিবীর কাছে বলার সুযোগ, আমরাও আছি।
কুরাসাওয়ের গল্প আরও বিস্ময়কর। ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই ছোট দ্বীপটির জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ ষাট হাজার। জনসংখ্যার হিসাবে এটি বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া সবচেয়ে ছোট দেশ। ডাচ শাসন, ক্যারিবীয় সংস্কৃতি, অভিবাসী ফুটবলার আর ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে তাদের দল। কোচ ডিক অ্যাডভোকাট এই আসরের সবচেয়ে বয়স্ক কোচদের আলোচনায়, আর তাহিথ চংয়ের মতো খেলোয়াড়দের মাধ্যমে দ্বীপটির ফুটবল পরিচয় নতুনভাবে সামনে এসেছে।
কুরাসাওয়ের শক্তি হয়তো জনসংখ্যায় নয়, মাঠের অভিজ্ঞতায়ও নয়। তাদের শক্তি হলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠা। পৃথিবীর মানচিত্রে অনেকেই হয়তো আঙুল দিয়ে কুরাসাও খুঁজে পেতে সময় নেবে। কিন্তু বিশ্বকাপের পর সেই নাম আর এত অচেনা থাকবে না। ফুটবল কখনও কখনও ভূগোলের বইয়ের কাজও করে। একটি ছোট দেশকে কোটি মানুষের আলোচনায় এনে দেয়।
জর্ডানের গল্প মধ্যপ্রাচ্যের আবেগ নিয়ে আসে। ২০২৪ সালের এশিয়ান কাপের ফাইনালে ওঠার পরই দেশটির ফুটবলে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। এবার তারা প্রথমবার বিশ্বকাপে। তাদের গ্রুপে ছিল অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া ও আর্জেন্টিনার মতো প্রতিপক্ষ। আলজেরিয়ার কাছে ২-১ গোলে হেরে নকআউট দৌড় থেকে ছিটকে গেলেও জর্ডানের জন্য এই বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় না। কারণ প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে ওঠার অভিজ্ঞতা অনেক সময় স্কোরলাইনের চেয়েও বড় হয়ে থাকে।
জর্ডানের মানুষের কাছে এই বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল মাঠে এগারোজন খেলোয়াড়ের লড়াই নয়। এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন আম্মান থেকে ইরবিদ, আকাবা থেকে বিদেশে থাকা জর্ডানিয়ান পরিবার, সবাই একই পতাকার নিচে নিজেদের স্বপ্ন দেখতে পারে। বড় দলকে হারানো না হারানো পরের বিষয়। প্রথমবার বিশ্বকাপে জাতীয় সঙ্গীত বাজা, সেটিই এক দেশের স্মৃতিতে বহু বছর থাকে।
উজবেকিস্তানের অপেক্ষা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ ও গভীর। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর স্বাধীন পথচলা শুরু করে দেশটি। ১৯৯৪ সালে ফিফা সদস্যপদ পাওয়ার পর বহুবার বিশ্বকাপের দরজায় গিয়ে ফিরে এসেছে তারা। এবার সেই দরজা খুলেছে। উজবেকিস্তান প্রথম মধ্য এশীয় দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। প্রায় চার দশকের অপেক্ষা শেষে এই যোগ্যতা অর্জন দেশটির ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে।
উজবেকিস্তানের ফুটবল পরিচয়ে আছে শৃঙ্খলা, ধৈর্য, ঘরোয়া লিগের ওপর নির্ভরতা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিভা। আবদুকোদির খুসানভের মতো ফুটবলার ইউরোপীয় মঞ্চে উজবেক ফুটবলের নতুন পরিচয় তৈরি করেছেন। বিশ্বকাপে তাদের সামনে ছিল কলম্বিয়া, পর্তুগাল ও ডিআর কঙ্গোর মতো প্রতিপক্ষ। কিন্তু যে দেশ এত বছর অপেক্ষা করে মঞ্চে উঠেছে, তার কাছে প্রথম বাঁশির শব্দই এক ধরনের বিজয়।
এই চার দেশের পথ আলাদা, কিন্তু বিশ্বকাপে তাদের উপস্থিতির অর্থ এক জায়গায় এসে মিলে যায়। এখানে শুধু ফুটবল খেলা হচ্ছে না; নিজেদের নাম, পতাকা ও ইতিহাসকে নতুনভাবে পৃথিবীর সামনে রাখা হচ্ছে। এতদিন যারা দূর থেকে বিশ্বকাপ দেখেছে, এবার তারা নিজেরাই সেই দৃশ্যের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই। বড় দলগুলো টুর্নামেন্টকে ইতিহাসের ভার দেয়, আর নতুন মুখগুলো তাকে নতুন বিস্ময় দেয়। তারা মাঠে নামলে শুধু একটি ম্যাচ শুরু হয় না; শুরু হয় পরিচয়ের এক নতুন পাঠ। স্কোরবোর্ডে তাদের নাম ওঠে, টেলিভিশনের পর্দায় তাদের পতাকা উড়ে, আর কোটি মানুষের মুখে উচ্চারিত হয় এমন সব দেশের নাম, যাদের গল্প হয়তো এতদিন বিশ্বমঞ্চে ঠিকভাবে শোনা হয়নি।
২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু আয়তনে বড় নয়; অনুভবেও বড়। কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডান ও উজবেকিস্তান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ফুটবলে ছোট দেশ বলে কিছু নেই। আছে ছোট মানচিত্র এবং বড় স্বপ্ন। আর কখনও কখনও সেই স্বপ্নই বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে ওঠে।
তথ্যসূত্র: FIFA; Al Jazeera; Reuters; The Guardian









