সম্পাদকের পাতা

বিশ্বকাপে অন্যরকম জাপানি দর্শক

নজরুল মিন্টো

খেলা শেষ হয়ে গেছে। মাঠের আলো তখনও জ্বলছে। স্কোরবোর্ডে জমে আছে শেষ ফলাফলের সংখ্যা। গ্যালারি থেকে দর্শকদের ঢল নামছে ধীরে ধীরে। কেউ মোবাইলে শেষ ছবি তুলছে, কেউ জার্সি গুটিয়ে ব্যাগে রাখছে, কেউ আবার ম্যাচের উত্তেজনা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে তর্কে মেতে উঠেছে। ঠিক সেই সময় চোখে পড়ে এক অন্যরকম দৃশ্য। জাপানি দর্শকদের একটি দল স্টেডিয়াম ছাড়ছে না। তারা ব্যাগ হাতে আসনের নিচে, সারির ফাঁকে ফাঁকে, গ্যালারির সিঁড়িতে পড়ে থাকা কাগজ, কাপ, খাবারের প্যাকেট কুড়িয়ে নিতে শুরু করেছে।

প্রথম দেখায় দৃশ্যটি বিস্ময় জাগায়। বিশ্বকাপের মতো মহা-আয়োজনে দর্শকরা সাধারণত খেলা দেখে চলে যায়। পরিষ্কারের দায়িত্ব থাকে স্টেডিয়াম কর্মীদের। কিন্তু জাপানি দর্শকদের কাছে বিষয়টি যেন অন্যরকম। তারা মাঠে আসে দলকে সমর্থন করতে, আবার মাঠ ছাড়ার আগে জায়গাটিকে সম্মান জানাতেও ভুলে না। তাদের কাছে ব্যবহৃত আসন শুধু একটি টিকিটের জায়গা নয়, এটি সবার ব্যবহারের একটি জায়গা। সেই জায়গা নোংরা রেখে চলে যাওয়া তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না।

২০২৬ বিশ্বকাপে জাপান ও নেদারল্যান্ডসের ম্যাচের পরও এমন দৃশ্য ধরা পড়ে বিশ্বমাধ্যমের ক্যামেরায়। টেক্সাসের আরলিংটনে অনুষ্ঠিত গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচ ২-২ গোলে ড্র হয়। শেষ দিকে দাইচি কামাদার গোলে জাপান সমতা ফেরায়। কয়েক মিনিট আগেও জাপানি সমর্থকদের হাতে থাকা নীল ব্যাগ ছিল উল্লাসের অংশ। গোলের পর সেই ব্যাগ তারা উঁচিয়ে ধরেছিল, নেচেছিল, গেয়েছিল। খেলা শেষ হতেই সেই একই ব্যাগ হয়ে উঠল আবর্জনা সংগ্রহের পাত্র। স্টেডিয়ামের আসন থেকে তারা ময়লা কুড়িয়ে ব্যাগে ভরতে লাগল।

এই দৃশ্য অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে জাপানের প্রথম অংশগ্রহণের সময় থেকেই তাদের স্টেডিয়াম পরিষ্কারের অভ্যাস বিশ্বমাধ্যমের নজর কাড়ে। এরপর ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপেও একই ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। ২০১৮ বিশ্বকাপে জাপান দল হেরে যাওয়ার পর ড্রেসিংরুম পরিষ্কার করে ধন্যবাদ নোট রেখে গিয়েছিল। ২০২২ সালে কাতারে জাপানি দর্শকরা আরবি, ইংরেজি ও জাপানি ভাষায় লেখা বার্তা-সংবলিত ব্যাগে আবর্জনা সংগ্রহ করেছিল।

জাপানিদের এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে তাদের সামাজিক শিক্ষা। জাপানের অনেক স্কুলে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিজের শ্রেণিকক্ষ, করিডোর, খেলার মাঠ পরিষ্কার করতে শেখানো হয়। সেখানে পরিচ্ছন্নতা শুধু কর্মচারীর কাজ নয়, বরং সবার দায়িত্ব। এই শিক্ষার মাধ্যমে শিশুরা বুঝে যায়, যে জায়গা তারা ব্যবহার করে, সেটি গুছিয়ে রেখে যাওয়া সামাজিক আচরণের অংশ। পরে তারা বড় হলে সেই অভ্যাস স্টেডিয়াম, অফিস, রাস্তাঘাট, ট্রেন স্টেশন, পার্কসহ জনজীবনের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

এই অভ্যাসের ভেতরে আছে জাপানিদের জীবনযাপনের একটি দর্শন। তারা মনে করে, কোথাও গেলে, কিছু ব্যবহার করলে, কোনো জনপরিসরে অংশ নিলে সেই জায়গাকে সম্মান করে ফিরে আসতে হবে। জায়গা যাই হোক, সেটি শুধু নিজের নয়, অন্যেরও। তাই নিজের আনন্দের পর অন্যের জন্য ময়লা, বিশৃঙ্খলা বা অসুবিধা রেখে যাওয়া তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। খেলা শেষে ব্যাগ হাতে তাদের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যটি আসলে সেই মানসিকতারই প্রকাশ।

তবে বিষয়টি শুধু সৌন্দর্য বা ভদ্রতার গল্প নয়। এটি নাগরিকতার গল্প। আমরা অনেক সময় নাগরিক দায়িত্বকে শুধু আইন, কর, ভোট বা রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখি। কিন্তু নাগরিকতা শুরু হয় আরও ছোট জায়গা থেকে। নিজের চেয়ার গুছিয়ে রাখা, খাবারের প্যাকেট মাটিতে না ফেলা, জনসমাগমের জায়গা ব্যবহার করার পর সেটি অন্যের জন্য পরিষ্কার রাখা, এগুলোও নাগরিকতার অংশ। জাপানি দর্শকরা বিশ্বকাপের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে এই ছোট কাজের মধ্য দিয়ে বড় শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। জাপানি দর্শকরা এই কাজ প্রচারের জন্য করে না। তারা ক্যামেরা ডাকেন না, বক্তৃতা দেন না, স্লোগান দেন না। তাদের কাছে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং অস্বাভাবিক হলো ব্যবহৃত জায়গা নোংরা রেখে চলে যাওয়া। এই সাধারণত্বের মধ্যেই তাদের শক্তি। যা অন্যদের কাছে বিস্ময়, তাদের কাছে তা দৈনন্দিন অভ্যাস।

২০২৬ বিশ্বকাপে এই দৃশ্য আরও বেশি আলোচনায় আসে যখন আমেরিকান ফুটবলের এনএফএল খেলোয়াড় এবং ফক্স স্পোর্টসের বিশ্বকাপ প্রতিনিধি জেমিস উইনস্টন জাপানি দর্শকদের সঙ্গে আবর্জনা সংগ্রহে যোগ দেন। তাকেও নীল ব্যাগ হাতে আসনের সারি থেকে ময়লা তুলতে দেখা গেছে। একজন বাইরের মানুষ যখন এই সংস্কৃতির অংশ হয়ে যান, তখন বোঝা যায়, একটি ভালো অভ্যাস কখনও কখনও দেশের সীমাও পেরিয়ে যায়।

বাংলাদেশি, কানাডিয়ান কিংবা বিশ্বের যেকোনো সমাজের জন্য এই দৃশ্য ভাবনার জায়গা তৈরি করে। আমরা জনপরিসরকে কতটা নিজের বলে ভাবি? মেলা, কনসার্ট, খেলা বা কমিউনিটি অনুষ্ঠান শেষে আমরা জায়গাটি কী অবস্থায় রেখে আসি? পার্ক, রাস্তা বা গ্যালারির মতো সবার ব্যবহারের জায়গাগুলো আমরা কতটা সম্মান করি? আমরা কি মনে করি, টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছি বলে নোংরা করার অধিকারও কিনে নিয়েছি?

বিশ্বকাপের মাঠে শুধু ফুটবল খেলা হয় না। সেখানে পৃথিবীর নানা সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচয় ঘটে। মাঠে এক দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে খেলে, কিন্তু গ্যালারিতে মানুষ মানুষকে চিনতে শেখে। জাপানি দর্শকদের স্টেডিয়াম পরিষ্কারের দৃশ্য আমাদের শেখায়, ভালো আচরণও এক ধরনের আন্তর্জাতিক ভাষা। সেটি বুঝতে অনুবাদ লাগে না।

এনএন/ ২০ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language