স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে পিসির উন্মুক্ত মনোনয়ন, লড়াইয়ে ডা. তরুণ ও মোরশেদ নিজাম
নজরুল মিন্টো

স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আবারও অন্টারিও রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে। টরন্টোর পূর্ব প্রান্তের এই বহুসাংস্কৃতিক রাইডিংয়ে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। এনডিপি ও লিবারেল পার্টি ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে নেমেছে। এবার সবার নজর প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির দিকে।
দীর্ঘদিন ধরেই এ আসনে পিসি প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছিল। কে পাবেন দলের মনোনয়ন, এ প্রশ্ন ঘুরছিল দলীয় মহল, কমিউনিটি অঙ্গন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে। বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির ভেতরে আগ্রহ ছিল বেশি। কারণ এ আসনে পিসির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুই পরিচিত মুখ, ডা. এ এস এম নূরুল্লাহ তরুণ এবং সিপিএ মোরশেদ নিজাম।
এদিকে এ আসনে পিসির সম্ভাব্য হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন সাবেক কাউন্সিলর গ্যারি ক্রফোর্ড। কিন্তু তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যায়। এতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ঘিরে আলোচনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টি স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য উন্মুক্ত মনোনয়ন প্রতিযোগিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ৯ জুলাই ২০২৬ মনোনয়ন সভায় দলীয় সদস্যরা ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, ন্যায্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে এবার স্থানীয় পিসি সদস্যদের ভোটেই নির্ধারিত হবে, কে হবেন স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে দলের পতাকাবাহী।
স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের এই মনোনয়ন বাছাইয়ে ভোট দিতে পারবেন কেবল স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট অন্টারিও পিসি কনস্টিটুয়েন্সি অ্যাসোসিয়েশনের বৈধ ও সক্রিয় সদস্যরা।
দলীয় সদস্যপদের ক্ষেত্রে কানাডার সাধারণ নির্বাচনের মতো শুধু নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধতা থাকে না। অন্টারিওতে বসবাসকারী ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সী যে কেউ, যিনি পিসি পার্টির নীতি ও সংবিধান সমর্থন করেন এবং অন্য কোনো অন্টারিও প্রাদেশিক রাজনৈতিক দলের সদস্য নন, তিনি দলীয় সদস্য হতে পারেন। ফলে কানাডীয় নাগরিকের পাশাপাশি স্থায়ী বাসিন্দা বা বৈধভাবে অন্টারিওতে বসবাসরত অন্যরাও দলীয় নিয়ম অনুযায়ী সদস্যপদ গ্রহণ করতে পারেন, যদি তাঁরা সংশ্লিষ্ট রাইডিংয়ের বাসিন্দা হিসেবে নিবন্ধিত থাকেন।
এই মনোনয়ন লড়াইয়ে ডা. এ এস এম নূরুল্লাহ তরুণের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় আছে। তিনি একজন চিকিৎসক, কমিউনিটি সংগঠক এবং কনজারভেটিভ রাজনীতির সক্রিয় মুখ। ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে তিনি কনজারভেটিভ পার্টি অব কানাডার প্রার্থী হিসেবে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ১৬ হাজার ৬৬৫ ভোট পান। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে স্থানীয় নির্বাচনী মাঠ, ভোটারদের মনোভাব এবং দলীয় কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।
ডা. তরুণ ২০০১ সালে কানাডায় আসেন। অভিবাসী জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি কানাডায় চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবায় রেসিডেন্সি শেষ করে তিনি ম্যানিটোবায় চিকিৎসা পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে ২০১৩ সালে স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে ফিরে এসে পরিবারসহ এখানেই বসবাস, কাজ এবং সন্তানদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ গড়ে তোলেন।
তিনি বর্তমানে পরিবার চিকিৎসক হিসেবে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট এবং গ্রেটার টরন্টো এরিয়ার মানুষের সেবা দিয়ে আসছেন। তিনি Beaches Family Health Group-এর লিড ফিজিশিয়ান এবং Comprehensive Healthcare Network বা CHN-এর মেডিকেল ডিরেক্টর। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের অধীনে ছয়টি প্রাইমারি কেয়ার ক্লিনিক এবং একটি স্পেশালিটি সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেবা পান।
চিকিৎসক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা, অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘ সম্পৃক্ততা পিসির মনোনয়ন দৌড়ে তাঁকে আলোচনায় রেখেছে।
অন্যদিকে মোরশেদ নিজামও পিসি মনোনয়ন লড়াইয়ে আরেক আলোচিত নাম। তিনি একজন চার্টার্ড প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দীর্ঘদিনের স্কারবোরোবাসী এবং প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির সক্রিয় সদস্য। পেশাগত দক্ষতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং কমিউনিটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে অনেকে পিসির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখছেন।
অভিবাসী জীবনের বাস্তবতা মোরশেদ নিজামের কাছে অচেনা নয়। কানাডায় এসে নতুন করে জীবন গড়া, পেশাগত স্বীকৃতি অর্জন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করা এবং একই সঙ্গে কমিউনিটির কাজে যুক্ত থাকা, এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের প্রতিদিনের সংকট কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। তিনি CPA Ontario সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টিং প্র্যাকটিস পরিচালনা করছেন।
একজন হিসাববিদ হিসেবে তিনি অর্থনীতি, করব্যবস্থা এবং আর্থিক জটিলতা বোঝেন। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে বোঝেন ছোট ব্যবসায়ীদের চাপ, খরচ, নীতিনিয়ম এবং টিকে থাকার লড়াই। তাঁর সমর্থকদের মতে, এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং মধ্যবিত্ত অভিবাসী পরিবারগুলোর বাস্তব সমস্যার কাছাকাছি নিয়ে যায়।
কমিউনিটি অঙ্গনেও মোরশেদ নিজামের উপস্থিতি দৃশ্যমান। তিনি স্কারবোরো বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত আছেন। জোসেফ ব্র্যান্ট পাবলিক স্কুলে তিনি সাবেক কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। টরন্টো বাংলা স্কুলের চিফ প্যাট্রন হিসেবেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। জানা যায়, যে স্কুলটি একসময় মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয়েছিল, সেটি এখন শতাধিক শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
খেলাধুলার ক্ষেত্রেও তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা রয়েছে। বেঙ্গল স্ট্রাইকার্স ক্রিকেট ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তরুণদের খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন। তাঁর অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে মূলধারার পেশায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। বিশেষ করে টরন্টো পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং জরুরি সেবাখাতে তরুণদের কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে তিনি কাজ করতে চান।
স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে এই মনোনয়ন প্রতিযোগিতা তাই শুধু দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার সঙ্গেও জড়িত। একদিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোক্তা ডা. তরুণ, অন্যদিকে হিসাববিদ, ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি সংগঠক মোরশেদ নিজাম। দুজনের পেশাগত পটভূমি আলাদা, অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রও আলাদা। কিন্তু দুজনই স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার দাবি নিয়ে দলীয় সদস্যদের সামনে যেতে চাইছেন।
গত ৯ মে অন্টারিও লিবারেল পার্টির মনোনয়নযুদ্ধে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আহসানুল হাফিজের বিজয় ইতিমধ্যে কমিউনিটিতে আলোড়ন তৈরি করেছে। তিনি ফেডারেল রাজনীতির পরিচিত মুখ নাথানিয়াল এরস্কিন স্মিথকে পরাজিত করে লিবারেল মনোনয়ন পান। এনডিপি তাদের প্রার্থী হিসেবে ফাতিমা শাবানকে ঘোষণা করেছে। এখন পিসি মনোনয়ন ঘিরে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে স্থানীয় রাজনীতিতে।
ইলেকশনস অন্টারিও জানিয়েছে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনটি ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শূন্য ঘোষণা করা হয় এবং আইন অনুযায়ী ৫ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে উপনির্বাচন ডাকতে হবে। ফলে সময় খুব বেশি নেই। ৯ জুলাইয়ের মনোনয়ন সভা শুধু পিসি পার্টির জন্য নয়, স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ এই ভোটেই নির্ধারিত হবে, স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের নির্বাচনী লড়াইয়ে পিসির হয়ে কে নামবেন মাঠে।
এখন প্রশ্ন একটাই, পিসি সদস্যরা কাকে বেছে নেবেন। ডা. তরুণ, মোরশেদ নিজাম, নাকি শেষ মুহূর্তে আসা অন্য কোনো মুখ। উত্তর মিলবে ৯ জুলাই।
এনএন/ ১৬ জুন ২০২৬









