
ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, আড্রিয়াটিক সাগরের নীল জলরেখা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট দেশ ক্রোয়েশিয়া। একদিকে সমুদ্র, দ্বীপ আর পাথুরে উপকূল, অন্যদিকে সবুজ পাহাড়, নদী আর বিস্তৃত সমতলভূমি। সেই ক্রোয়েশিয়ার পূর্বাঞ্চলে রয়েছে ব্রডস্কি ভারোশ নামের এক শান্ত, নির্জন গ্রাম। সাধারণ সেই গ্রামের একটি বাড়ির ছাদে একদিন আকাশ থেকে নেমে এসেছিল একটি সাদা সারস। আর সেই সারসকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল এমন এক কাহিনী, যা পরে শুধু ক্রোয়েশিয়া নয়, পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষকে অবাক করে দিয়েছিল।
সালটি ১৯৯৩। গ্রামের কাছাকাছি মাছ ধরতে গিয়েছিলেন স্টিয়েপান ভোকিচ। তিনি ছিলেন স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত কেয়ারটেকার। সেদিন তিনি দেখেন, জলাভূমির কাছে একটি আহত সাদা সারস ছটফট করছিল। ডানা ভাঙা, আকাশে ওড়ার কোনো শক্তি নেই। সারসেরা আকাশের পাখি। তাদের জীবন ঋতুর সঙ্গে বাঁধা। শীত এলে তারা উড়ে যায় দূর দেশে, বসন্তে আবার ফিরে আসে নিজ ঠিকানায়। অসহায় সারসটি তার যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিল না। কিন্তু তার চোখে ছিল বেঁচে থাকার গভীর আকুতি।
ভোকিচ পাখিটিকে ফেলে আসতে পারেননি। তিনি তাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। নাম দিলেন মালেনা। ক্রোয়েশিয়ান ভাষায় যার অর্থ ছোট্ট মেয়ে। নামটি যেন তার ভাগ্যের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে গেল। মালেনা আর শুধু আহত একটি পাখি রইল না, সে হয়ে উঠল ভোকিচের সংসারের সদস্য।
ভোকিচ তার জন্য ঘরের কাছে বাসা তৈরি করলেন। গরমের দিনে ছাদের ওপরে, শীতের দিনে নিরাপদ আশ্রয়। খাবারের জন্য তিনি মাছ জোগাড় করতেন। কখনও তাকে নিয়ে হাঁটতে যেতেন, কখনও নদীর ধারে নিয়ে বসতেন। যে পাখির ঠিকানা ছিল আকাশ, সে পাখি মানুষটির কাছে পেল জীবনের নিরাপত্তা। আর এক বৃদ্ধ মানুষ পেলেন নিঃসঙ্গ জীবনের এক সঙ্গী।
বছর কেটে যায়। সারসেরা দলবেঁধে আসে, আবার দূরে মিলিয়ে যায়। মালেনা তাকিয়ে থাকে। অন্যরা যখন ডানা মেলে আফ্রিকার পথে পাড়ি দেয়, সে তখন নিজের বাসা থেকে শুধু চেয়ে দেখে। তার চোখের সামনে ঋতু বদলায়, শীত নামে, বসন্ত ফিরে আসে।
এরপর এক বসন্তে গল্পের মোড় বদলে যায়। মালেনার বাসার কাছে এসে নামে এক পুরুষ সারস। সারসটি মালেনার পাশে এসে বসে, তারপর থাকতে শুরু করে। ভোকিচ তার নাম দেন ক্লেপেতান। আহত, উড়তে অক্ষম মালেনার সঙ্গে সে পুরো বসন্ত কাটিয়ে একসময় চলে যায় আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের পথে।
সেই ছিল শুরু। এরপর প্রতি বছর ঠিক একই সময় সে ফিরে আসে। তার জীবনের কেন্দ্র হয়ে উঠল এই ছাদ, এই বাসা, এই অপেক্ষা। দীর্ঘ পথ। মরুভূমি, সাগর, পাহাড়, ঝড়, শিকারি, ক্ষুধা, ক্লান্তি, সব পেরিয়ে তাকে ফিরতে হতো। এই পথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার। কী বিস্ময়! একটি পাখি প্রতি বসন্তে হাজার হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে ফিরে আসত সেই একই বাড়ির একই বাসায়, যেখানে অপেক্ষা করত তার উড়তে না পারা প্রেমিকা মালেনা।
খবরটি এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, গ্রাম থেকে শহর, তারপর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের মানুষ, সাংবাদিক, পাখিপ্রেমী, সাধারণ পাঠক, সবাই অপেক্ষায় থাকত, কবে ফিরবে ক্লেপেতান। বসন্ত এলেই যেন ব্রডস্কি ভারোশের সেই বাড়ির ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকত ক্রোয়েশিয়ার মানুষ। ক্লেপেতান ফিরলে যেন শুধু একটি পাখি ফিরত না, ফিরে আসত ভালোবাসা, অপেক্ষা আর বিশ্বাসের এক অবিশ্বাস্য গল্প।
সময় যায়, ঋতু বদলায়, কিন্তু ক্লেপেতান ঠিকই ফিরে আসত। ক্রোয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম তার ফেরার খবর করত। কখনও সে দেরি করলে দেশের মানুষের উৎকণ্ঠা বাড়ত। কেউ ভাবত, এবার বুঝি আর ফিরবে না। তারপর কোনো এক সকালে দেখা যেত, ধুলোমাখা, ক্লান্ত, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই সাদা সারস আবার এসে দাঁড়িয়েছে মালেনার পাশে।
মালেনা উড়তে পারত না, কিন্তু সংসার থেমে থাকেনি। ভোকিচের সহায়তায় ক্লেপেতান ও মালেনা বছরের পর বছর ছানা লালন করেছে। তাদের বাসা থেকে মোট ৬৬টি ছানা বড় হয়ে পৃথিবীর পথে উড়েছে। মা মাটিতে আটকে থাকলেও সন্তানরা আকাশ পেয়েছে। ক্লেপেতান তাদের উড়তে শিখিয়েছে, তারপর ঋতু এলে তাদের নিয়ে দক্ষিণের পথে পাড়ি দিয়েছে।
বছরের পর বছর এভাবেই চলেছে অপেক্ষা ও ফিরে আসার এই গল্প। তারপর ২০২১ সালে মালেনার জীবনের দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হয়। প্রায় ২৮ বছর স্টিয়েপান ভোকিচের স্নেহে বেঁচে থাকার পর সে মারা যায়। বাড়ির সামনে আপেল গাছের নিচে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। যে পাখি আকাশ হারিয়েছিল, সে শেষ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা নিয়ে পৃথিবী ছাড়ে।
ক্লেপেতান ও মালেনার কাহিনী এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু না, ততদিনে পাখি যুগলের এই গল্প মানুষের মনে ঠাঁই করে নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে এটি হয়ে ওঠে ভালোবাসার এক হৃদয়ছোঁয়া উপাখ্যান।
তথ্যসূত্র:
Keggie Carew-এর How an Injured Stork Changed A Nation নিবন্ধসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের আলোকে।









