সম্পাদকের পাতা

এক কাপ কফি, এক পৃথিবীর গল্প

নজরুল মিন্টো

আমি কফিপ্রেমী মানুষ। কফি আমার কাছে শুধু পানীয় নয়, এটি এক ধরনের সঙ্গ, অভ্যাস এবং মানসিক প্রস্তুতি। দিনের শুরুতে, কাজের ফাঁকে, লেখার টেবিলে, ভ্রমণের ক্লান্তিতে, আড্ডার উষ্ণতায় কিংবা গভীর রাতের ভাবনায় কফি বারবার ফিরে আসে। আমি প্রতিদিন কমপক্ষে চার কাপ কফি পান করি। অনেকে অবাক হয়ে বলেন, এত কফি খেয়ে ঘুম আসে কীভাবে? আমি হেসে বলি, কফি না খেলে আমার ঘুম আসে না। কফি আমাকে কাজ করার শক্তি দেয়, মনোযোগ দেয়, ভাবনার দরজা খুলে দেয়। কখনো কখনো মনে হয়, আমার অনেক লেখার কালি আসলে অর্ধেক শব্দ আর অর্ধেক কফি দিয়ে তৈরি।

বিশ্বের নানা দেশে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে আমার একটি নিজস্ব অভ্যাস তৈরি হয়েছে। নতুন কোনো শহরে পৌঁছালে আমি সাধারণত দুটি জিনিস খুঁজি। একটি বইয়ের দোকান, অন্যটি কফির দোকান। নিউইয়র্কের ইয়েমেনি ক্যাফের ঘন মসলাদার কফি, প্যারিসের রাস্তার পাশের ছোট্ট ক্যাফের এসপ্রেসো, রোমের বার কাউন্টারে দাঁড়িয়ে খাওয়া ক্যাপুচিনো, দুবাইর আরবি ঘাওয়া, বালি দ্বীপের কপি লুয়াক, আর টরন্টোর ইথিওপিয়ান কফি, প্রতিটি কাপ আমাকে সেই শহরের সঙ্গে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

বালির সবুজ পাহাড়ি অঞ্চলে Kopi Luwak শুধু কফি নয়, এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতার নাম।

সম্প্রতি টরন্টো স্টারের একটি প্রতিবেদনে পড়লাম, টরন্টোর জংশন ট্রায়াঙ্গলের পূর্ব প্রান্তে Roasters Pack Lab নামে একটি ব্যতিক্রমী কফিশপ গড়ে উঠেছে। পুরনো শিল্পঘরের ভেতর জায়গাটিতে আছে মাত্র একটি বার, বসার আসন মাত্র আটজনের। এটি প্রতিদিন খোলা থাকে না, নির্দিষ্ট কিছু সপ্তাহান্তে খোলে। সেখানে যেতে হলে আগে থেকেই রিজার্ভেশন করতে হয়, আর সেই রিজার্ভেশন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। শুনতে কফিশপের চেয়ে বেশি কিছু মনে হয়, বিশেষ অতিথিদের জন্য সাজানো কোনো শিল্প প্রদর্শনীর মতো। কফিশপটির মূল ভাবনা হলো, কফি দ্রুত পান করে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয় নয়; কফি হলো বোঝার, জানার এবং অনুভব করার বিষয়।

Roasters Pack Lab সাধারণ ক্যাফে নয়, অনেকটা জাপানি ওমাকাসে অভিজ্ঞতার মতো। সেখানে বারিস্তা শুধু কফি বানান না, কফির ইতিহাস, প্রক্রিয়া, স্বাদ, পানি, কাপ, তাপমাত্রা ও সময়ের ব্যাখ্যাও দেন। কফির দানা কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে প্রসেস করা হয়েছে, কোন উচ্চতায় জন্মেছে, পানির খনিজ গঠন কেমন, কাপের টেক্সচার স্বাদের অনুভূতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, এসব নিয়েও সেখানে আলোচনা হয়। এখানে কফি শুধু পানীয় থাকে না; হয়ে ওঠে শিল্প, বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়।

এই অভিজ্ঞতার দামও কম নয়। সেখানে Panama Gesha কফির এক কাপের দাম ৫৮ ডলার। কর যোগ করলে প্রায় ৬০ ডলার। এই কফি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ কফি হিসেবে পরিচিত। তবু শুধু নামের জন্য মানুষ যাচ্ছে না; তারা বুকিং করছে, অপেক্ষা করছে, কারণ তারা এক কাপ কফির সঙ্গে এক ধরনের স্মরণীয় মুহূর্তের স্বাদ নিতে চাইছে। টরন্টোর আরেকটি প্রিমিয়াম কফি ও ওয়েলনেস স্পট Denovia Cafe একসময় ৯৯ ডলারে Panama Gesha কফি বিক্রি করেছে। এতে বোঝা যায়, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও বিশেষ অভিজ্ঞতার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি।

কফির ইতিহাসও কম বিস্ময়কর নয়। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার কালদি নামের এক ছাগলপালক প্রথম কফির সম্ভাবনা লক্ষ করেন। বলা হয়, আনুমানিক ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি দেখেন, তাঁর ছাগলগুলো একটি বিশেষ গাছের লাল ফল খাওয়ার পর অস্বাভাবিক চঞ্চল হয়ে উঠছে। কৌতূহলী কালদি নিজেও ফলটি চেখে দেখেন এবং শরীরে এক ধরনের সতেজতা অনুভব করেন। গল্পটি ইতিহাসের নির্ভুল দলিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে কফির জন্মগাথা হিসেবে এটি এত সুন্দর যে পৃথিবী আজও তা বলতে ভালোবাসে। ইথিওপিয়া থেকে কফি পৌঁছায় ইয়েমেনে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইয়েমেনের সুফি সাধকেরা দীর্ঘ সময় জেগে ইবাদত করার জন্য কফি পান করতেন। পরে কফি ছড়িয়ে পড়ে আরব জগতে, তুরস্কে, ইউরোপে, আমেরিকায় এবং অবশেষে সারা পৃথিবীতে।

ইস্তাম্বুলের কফিহাউসগুলো একসময় ছিল জ্ঞান, বিতর্ক ও সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র। মানুষ সেখানে বসে রাজনীতি, সাহিত্য, ধর্ম, দর্শন ও দৈনন্দিন জীবন নিয়ে কথা বলত। ইউরোপে কফিহাউসগুলোকে বলা হতো পেনি ইউনিভার্সিটি। এক পেনি দিয়ে কফি কিনে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা শুনত, বিতর্কে অংশ নিত, নতুন চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হতো। লন্ডনের অনেক কফিহাউস থেকে জন্ম নিয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সংবাদপত্র ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। প্যারিসের কফিহাউসগুলোতেও দার্শনিক, লেখক ও বিপ্লবীরা ইউরোপের চিন্তার ইতিহাসে গভীর প্রভাব রেখেছেন।

কফি নিয়ে মজার গল্পেরও শেষ নেই। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার সম্পর্কে বলা হয়, তিনি দিনে ৪০ থেকে ৫০ কাপ কফি পান করতেন। কেউ তাঁকে সতর্ক করে বলেছিলেন, এত কফি বিষের মতো ক্ষতিকর হতে পারে। ভলতেয়ার মজা করে বলেছিলেন, যদি কফি বিষ হয়, তবে তা খুব ধীরে কাজ করছে, কারণ আমি বহু বছর ধরে পান করছি। প্রখ্যাত সুরকার বেটোফেন কফি বানানোর আগে ঠিক ৬০টি কফি বীজ গুনে নিতেন। লেখক, দার্শনিক, শিল্পী, বিপ্লবী, ব্যবসায়ী, প্রেমিক, ভ্রমণকারী, সবাই কোনো না কোনোভাবে কফির টেবিলে এসে বসেছেন।

প্রেমের সঙ্গেও কফির সম্পর্ক বহু পুরোনো। ভিয়েনার বিখ্যাত কফিহাউস সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি দম্পতির গল্প প্রায় কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। লিওপোল্ড হাভেলকা এবং জোসেফিন হাভেলকা প্রেমে পড়েছিলেন, বিয়ে করেছিলেন, আর বিয়ের পরদিনই খুলেছিলেন তাঁদের প্রথম কফিহাউস। পরবর্তীকালে সেই ক্যাফেই ভিয়েনার শিল্পী, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী ও প্রেমিকযুগলের অন্যতম মিলনস্থলে পরিণত হয়। জোসেফিনের হাতে তৈরি জ্যামভর্তি মিষ্টি রুটি ‘বুখটেলন’ এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে বহু মানুষ শুধু সেই স্বাদের জন্য ক্যাফেতে যেতেন। আজও ভিয়েনার কফি সংস্কৃতির আলোচনায় তাঁদের প্রেম ও অংশীদারিত্বের গল্প উচ্চারিত হয়।

গল্পটি আমার ভালো লাগে। কারণ এটি মনে করিয়ে দেয়, কফি শুধু পানীয় নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরিরও একটি মাধ্যম। পৃথিবীর অসংখ্য প্রেম, বন্ধুত্ব, সাহিত্য আন্দোলন, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা হয়েছে কফির টেবিলে বসে। হয়তো এ কারণেই কফিশপগুলো শুধু দোকান নয়, অনেক সময় একটি শহরের সাংস্কৃতিক হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়।

আমার নিজের জীবনেও কফির সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য ছোট ছোট স্মৃতি আছে। বিমানবন্দরে বসে এক কাপ কফি হাতে দূরের শহরের কথা ভেবেছি। অচেনা দেশে কফির দোকানে বসে মানুষের ভাষা না বুঝেও তাদের হাসি বুঝেছি। শহর থেকে শহরে কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কফিশপের টেবিলে। ল্যাপটপে ধ্যানমগ্ন হয়ে কোনো লেখা আটকে গেলে কফির চুমুকেই কখনো শব্দের তালা খুলেছে। আবার কফির কাপ হাতে মনে হয়েছে, জীবনের গল্পগুলো অনেক সময় এমন ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই জন্ম নেয়।

ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের সিভেট নামের ছোট এক ধরনের প্রাণী পাকা কফি চেরি খায়। সেই বীজ সংগ্রহ করে পরিষ্কার করা হয়, শুকানো হয়, ভাজা হয় এবং তৈরি হয় কপি লুয়াক।

ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে গিয়ে কফি সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা ছিল অন্যরকম। বালির সবুজ পাহাড়ি অঞ্চলে একদিন একটি কফি বাগানে গিয়ে শুনলাম Kopi Luwak এর গল্প। সিভেট নামের ছোট এক ধরনের প্রাণী পাকা কফি চেরি খায়। তার পরিপাকতন্ত্রে থাকা এনজাইম কফি বীজের স্বাদে বিশেষ পরিবর্তন আনে। পরে সেই বীজ সংগ্রহ করে পরিষ্কার করা হয়, শুকানো হয়, ভাজা হয় এবং তৈরি হয় কপি লুয়াক। প্রথমবার শুনে মনে হয়েছিল কেউ বুঝি রসিকতা করছে। কিন্তু বাস্তবে প্রক্রিয়াটি দেখে বুঝলাম, মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি কত বিচিত্র পথে এগিয়েছে।

বালি দ্বীপের Kopi Luwak এর প্রস্তুতির বিভিন্ন ধাপের একটি।

বিলাসী কফির আকর্ষণ আলাদা। কারণ এটি শুধু স্বাদের বিষয় নয়, অভিজ্ঞতার বিষয়। যেমন কেউ বিরল চা সংগ্রহ করে, কেউ পাহাড়ি অঞ্চলের বিশেষ মধু খোঁজে, তেমনি কেউ কেউ বিরল কফি চেখে দেখতে চায়। এক কাপ কফির জন্য ৬০ ডলার দেওয়া হয়তো কারও কাছে পাগলামি। আবার কারও কাছে সেটিই জীবনের আনন্দ। মানুষ আসলে টাকার বিনিময়ে সবসময় বস্তু কেনে না। অনেক সময় মানুষ স্মৃতি কেনে, গল্প কেনে।

আমার কাছে কফি তাই শুধু পানীয় নয়। কফির সঙ্গে আমি একটি গল্প খুঁজি, একটি অভিজ্ঞতা খুঁজি, একটি শহরের স্পন্দন খুঁজে বেড়াই। পৃথিবীর কোথাও কোনো ছোট্ট ক্যাফেতে যদি কখনো এমন এক কাপ কফি সামনে আসে, যার মধ্যে ইতিহাস, বিজ্ঞান, শিল্প, ভ্রমণ ও মানুষের জীবন একসঙ্গে মিশে আছে বলে মনে হয়, মূল্য যতই হোক, আমি সে কাপটি হাতে তুলে নেব। কারণ আমি জানি, কফির স্বাদ হয়তো একসময় মিলিয়ে যাবে, কিন্তু সেই মুহূর্তটি স্মৃতিতে থেকে যাবে আজীবন।

এনএন/ ৯ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language