
কানাডার রাজনীতিতে পদবির সিঁড়ি সব সময় ওপরের দিকেই ওঠে না। কখনও একজন রাজনীতিক ফেডারেল সংসদ থেকে প্রভিনশিয়াল রাজনীতিতে যেতে চান, কখনও প্রভিনশিয়াল রাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসেন সিটি হলে। কারণ এখানে ক্ষমতার মানদণ্ড শুধু পদমর্যাদা নয়, মানুষের কাছাকাছি থাকা, স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব জায়গায় প্রভাব রাখাও রাজনীতির বড় আকর্ষণ।
এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন আলোচনায় এসেছেন বিদায়ী লিবারেল এমপি নেট এরসকিন-স্মিথ। ২০১৫ সাল থেকে বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক আসনের ফেডারেল এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিক এখন টরন্টো সিটি কাউন্সিলে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন। টরন্টো স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেয়র অলিভিয়া চাওয়ের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক এক বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনা হয়েছে।
এরসকিন-স্মিথ অবশ্য বিষয়টিকে এখনই চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখাতে চান না। তিনি স্টারকে বলেছেন, সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। তাঁর মতে, সিটি হলে জনসেবার সুযোগ মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার একটি ভালো পথ হতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে তিনি এখনও গভীরভাবে ভাবেননি বলেও জানিয়েছেন।
নেট এরসকিন-স্মিথের রাজনৈতিক অবস্থান গত কয়েক মাসে বেশ নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। তিনি বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক থেকে দীর্ঘদিনের লিবারেল এমপি। জাস্টিন ট্রুডোর শেষ সময় এবং মার্ক কার্নির সরকারের শুরুতে তিনি কয়েক মাসের জন্য হাউজিং, ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড কমিউনিটিজ মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ফেডারেল রাজনীতির পর তাঁর নজর ছিল অন্টারিও প্রভিনশিয়াল রাজনীতির দিকে। তিনি স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনে অন্টারিও লিবারেল পার্টির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল প্রভিনশিয়াল রাজনীতিতে প্রবেশ করে ভবিষ্যতে অন্টারিও লিবারেল নেতৃত্বের দৌড়ে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করা। কিন্তু ৯ মে অনুষ্ঠিত মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় ব্যবসায়ী আহসানুল হাফিজের কাছে তিনি মাত্র ১৯ ভোটে হেরে যান। পরে ভোটে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে আপিল করলেও অন্টারিও লিবারেল পার্টির আরবিট্রেশন বোর্ড সেই আপিল খারিজ করে দেয়।
এই পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দেয়। ফেডারেল রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা আগেই ছিল। প্রভিনশিয়াল রাজনীতিতে তাঁর পথও আপাতত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সামনে এখন কয়েকটি সম্ভাবনা। তিনি অন্টারিও লিবারেল নেতৃত্বের চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারেন, বেসরকারি খাতে যেতে পারেন, অথবা টরন্টো সিটি হলে নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারেন।
টরন্টো সিটি কাউন্সিলের বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক আসন এবার খালি হচ্ছে, কারণ বর্তমান কাউন্সিলর ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড মেয়র পদে নির্বাচন করছেন। ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া টরন্টো মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে এ আসনে ইতিমধ্যে একাধিক প্রার্থী নাম লিখিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সিটি কর্মী জেমস ড্যান, স্কুল ট্রাস্টি কেভিন মরিসন এবং সিটিভি সাংবাদিক ন্যাটালি জনসন। এরসকিন-স্মিথ দৌড়ে নামলে এই প্রতিযোগিতার হিসাব নিঃসন্দেহে বদলে যাবে।
কারণ বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক তাঁর জন্য অপরিচিত কোনো রাজনৈতিক ভূখণ্ড নয়। গত ফেডারেল নির্বাচনে তিনি এই আসনে প্রায় ৪০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন, যা মোট ভোটের প্রায় ৬৮ শতাংশ। স্থানীয় ভোটারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক, সংসদীয় অভিজ্ঞতা এবং হাউজিং ইস্যুতে তাঁর অবস্থান তাঁকে সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী করে তুলতে পারে।
কানাডার রাজনীতিতে এ ধরনের পথ পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে মিউনিসিপ্যাল রাজনীতি অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির চেয়েও সরাসরি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। টরন্টোর বর্তমান মেয়র অলিভিয়া চাও নিজেই দীর্ঘদিন সিটি কাউন্সিলে কাজ করেছেন, পরে ফেডারেল এমপি হয়েছেন এবং ২০২৩ সালে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আবার সিটি হলে ফিরে এসেছেন। মন্ট্রিয়লের সাবেক মেয়র ডেনিস কোদেরও একসময় ফেডারেল লিবারেল এমপি ও মন্ত্রী ছিলেন। টরন্টোতেও জিম ক্যারিজিয়ানিস দীর্ঘদিন স্কারবরো-এজিনকোর্টের ফেডারেল এমপি থাকার পর সিটি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাইক কোলের মতো রাজনীতিকও দীর্ঘ প্রভিনশিয়াল ক্যারিয়ারের পর টরন্টো সিটি কাউন্সিলে এসেছেন।
সুতরাং ফেডারেল এমপি থেকে সিটি কাউন্সিলে আসা কানাডার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পদাবনতি হিসেবে দেখা হয় না। বরং অনেক সময় এটি ভিন্ন ধরনের ক্ষমতার জায়গায় ফিরে আসা। অটোয়ায় নীতি তৈরি হয়, কুইন্স পার্কে আইন হয়, কিন্তু রাস্তা, ট্রানজিট, পার্ক, বাড়িভাড়া, জোনিং, হাউজিং অনুমোদন এবং নাগরিক সেবার দৈনন্দিন বাস্তবতা অনেক সময় সিটি হলেই নির্ধারিত হয়।
এরসকিন-স্মিথের সম্ভাব্য প্রার্থিতা আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ফেডারেল হাউজিং মন্ত্রী হিসেবে খুব অল্প সময় দায়িত্ব পালন করলেও সাশ্রয়ী আবাসন, মাল্টিপ্লেক্স এবং নগর ঘনত্ব বৃদ্ধির পক্ষে বরাবরই সরব ছিলেন। টরন্টোতে হাউজিং সংকট এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি। মেয়র অলিভিয়া চাও দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হলে তাঁর প্রশাসনে হাউজিং ইস্যুতে অভিজ্ঞ কাউন্সিলরের প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে অনেক সিটি হল পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এরসকিন-স্মিথ সিটি কাউন্সিলে এলে অলিভিয়া চাওয়ের সম্ভাব্য দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেতে পারেন।
তবে রাজনীতিতে সম্ভাবনা আর সিদ্ধান্ত এক জিনিস নয়। নেট এরসকিন-স্মিথ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেননি। ২৫ জুন ইস্ট ইয়র্কে তাঁর ফেডারেল রাজনীতি থেকে বিদায় উপলক্ষে সমর্থকরা একটি বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ওই সময়ের মধ্যে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কিছুটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
নেট এরসকিন-স্মিথ এখন রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অটোয়ার সংসদ ভবন ছেড়ে তিনি কি এবার টরন্টো সিটি হলের পথে হাঁটবেন, নাকি প্রভিনশিয়াল রাজনীতির দরজায় আরেকবার কড়া নাড়বেন, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তিনি যে পথই বেছে নিন, তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ টরন্টোর পূর্বাঞ্চলের স্থানীয় রাজনীতি এবং লিবারেল রাজনীতির ভেতরের হিসাবকে নতুন করে আলোচনায় আনবে।
তথ্যসূত্র:
দৈনিক টরন্টো স্টার (১৬ জুন ২০২৬)









