সম্পাদকের পাতা

জাস্টিন ট্রুডো ও কেটি পেরির প্রেমকাহিনি

নজরুল মিন্টো

জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মানুষ কখনও কখনও ভাবে, এ জীবনে বুঝি আর নতুন কোনো বসন্ত নেই। অথচ কোনো এক সন্ধ্যায়, কোনো কনসার্টের আলোয় কিংবা কোনো বিমানবন্দরের ভিড়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়, পৃথিবী যেন আবার নতুন হয়ে উঠেছে। কবিরা বলেন, প্রেম কখনও জানান দিয়ে আসে না। আসে নীরবে, নিঃশব্দে, ধীরে। তারপর একদিন হঠাৎ চারপাশ বদলে দেয়। প্রেম বয়স মানে না। হৃদয়ের ক্যালেন্ডারে সংখ্যার হিসাব থাকে না। সেখানে শুধু লেখা থাকে একসঙ্গে হাঁটার ইচ্ছা, আর নতুন করে জীবনকে অনুভব করার আকুলতা।

জাস্টিন ট্রুডো ও কেটি পেরির গল্পটি যেন তেমনই এক অপ্রত্যাশিত প্রেমের উপাখ্যান। একজন রাজনীতির দীর্ঘ করিডর পেরিয়ে আসা মানুষ, যার জীবনে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, পরিবার, বিচ্ছেদ ও ইতিহাস একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। অন্যজন বিশ্বসংগীতের ঝলমলে নক্ষত্র, যার কণ্ঠে লক্ষ মানুষের উল্লাস, যার মঞ্চে আলো জ্বলে উঠলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে তরুণ হৃদয় নেচে ওঠে। একজন সংযমী ভাষার মানুষ, অন্যজন সুর, রঙ, আগুন আর আবেগের বিস্ফোরণ। তবু কোনো এক অদৃশ্য সন্ধিক্ষণে তাঁদের দুই ভুবন এসে একই আলোর নিচে মিলে গেল।

২০২৩ সালের ২ আগস্ট জাস্টিন ট্রুডো ও সোফি গ্রেগোয়ার তাঁদের ১৮ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানার ঘোষণা দেন। তিন সন্তানের বাবা ট্রুডোর জন্য এটি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, ছিল জনজীবনের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি। একজন প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের সংসারের একান্ত দরজাটি পৃথিবীর সামনে খুলে দেন, তখন সেই ঘোষণা আর কেবল সংবাদ থাকে না, তা হয়ে ওঠে একজন মানুষের অসহায়তার দলিল।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের ৩ জুলাই সংগীতশিল্পী কেটি পেরি ও অরল্যান্ডো ব্লুমও তাঁদের দীর্ঘ সম্পর্কের বিচ্ছেদের খবর জানান। বহু বছরের প্রেম, বাগদান, সন্তান, আলোচিত জীবন, সব মিলিয়ে সেই সম্পর্কও ছিল মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে। কিন্তু আলো যত উজ্জ্বল হয়, তার পেছনের ছায়া তত গভীর হয়। কেটির জীবনেও তখন একটি অধ্যায় শেষ হয়ে আরেকটি অদেখা দরজা ধীরে ধীরে খুলছিল।

২০২৫ সালের ২৮ জুলাই। গ্রীষ্মের শহর মন্ট্রিয়ল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। রেস্তোরাঁর জানালায় হলুদ আলো, দূরে কোথাও স্যাক্সোফোনের মৃদু সুর। সেই সন্ধ্যায় জাস্টিন ট্রুডো ও কেটি পেরিকে দেখা যায় লে ভায়োলিন রেস্তোরাঁয়। খবরের ভাষায় সেটি ছিল একটি ডিনার। কিন্তু গল্পের ভাষায় সেটি ছিল দুই ভিন্ন জীবনের প্রথম প্রকাশ্য সংলাপ।

তার আগে তাঁরা হাঁটেন মাউন্ট রয়্যাল পার্কে। পাহাড়ি পথের সবুজের পাশে দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটছেন। একজনের পেছনে রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘ অধ্যায়, অন্যজনের পেছনে মঞ্চ, আলো, গান আর অন্তহীন সফর। সেদিন তাঁদের কথায় রাজনীতি ছিল না, তারকাখ্যাতির ঝলকও ছিল না। কেউ তখনও জানত না, এই সাধারণ সন্ধ্যাই একদিন একটি আন্তর্জাতিক প্রেমকাহিনির প্রথম অধ্যায় হয়ে উঠবে।

দুই দিন পর, ৩০ জুলাই, ট্রুডোকে দেখা গেল কেটি পেরির কনসার্টে। হাজার মানুষের ভিড়ে তিনি গান শুনছেন, গলা মিলাচ্ছেন, “Firework” আর “Teenage Dream” গানের সঙ্গে নিজেকে ছেড়ে দিচ্ছেন। চারদিকে আলো, মঞ্চ থেকে কেটির কণ্ঠ উড়ে আসছে, দর্শকের উল্লাস ঢেউয়ের মতো উঠছে। আর ভিড়ের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, যিনি বহু বছর ধরে দেশের সামনে গম্ভীর ও সংযত ভাষায় কথা বলেছেন, সেই মানুষটি যেন সেদিন গান আর আলোর ভেতর নিজের আরেকটি মুখ খুঁজে পেলেন।

তারপর কিছুদিন কোনো কথাবার্তা নেই, ছবি নেই, ঘোষণা নেই, প্রকাশ্য দৃশ্য নেই। কিন্তু প্রেমের গল্পে নীরবতা কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি কথা বলে। বাইরে থেকে পৃথিবী কিছু দেখে না, অথচ ভেতরে ভেতরে সম্পর্ক নিজের ভাষা তৈরি করে। দূর শহর, আলাদা সময়, ব্যস্ততা, আলো, মঞ্চ, বক্তৃতা, সফর, সবকিছুর মধ্যেও দুটি মানুষ একে অন্যের উপস্থিতি টের পেতে থাকে।

২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারার উপকূলে কেটি পেরির ইয়টে দুজনের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি প্রকাশিত হয়। সমুদ্রের ওপর ভাসমান এক নৌকা, চারপাশে নীল জল, দূরে উপকূল, আর তার ভেতর দুজন মানুষ। সেই ছবির পর তাঁরা আর কেবল গুঞ্জনের চরিত্র রইলেন না। সমুদ্রের নোনা বাতাসে, ক্যামেরার দূর দৃষ্টিতে, পৃথিবী যেন প্রথমবার তাঁদের সম্পর্কের উষ্ণতা স্পষ্টভাবে দেখতে পেল। সেই মুহূর্ত যেন জানিয়ে দিল, জীবনের ভাঙা অধ্যায়ের পরও ভালোবাসা ফিরে আসতে পারে।

২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর। কেটি পেরির ৪১তম জন্মদিন। পৃথিবীর প্রেমের রাজধানী বলে পরিচিত প্যারিস সেদিন যেন তাঁদের জন্য নিজেকে সাজিয়ে রেখেছিল। রাতের প্যারিস রঙিন আলোয় জেগে ছিল। ক্যাবারে শোর দরজার সামনে জমে থাকা ক্যামেরা, অপেক্ষমাণ ফটোগ্রাফার, কৌতূহলী মানুষ। ক্রেজি হর্স প্যারিস থেকে বের হয়ে এলেন কেটি পেরি ও জাস্টিন ট্রুডো। তাঁদের হাত একসঙ্গে ধরা। সেই হাত ধরা ছিল কোনো ভাষণের চেয়ে স্পষ্ট, কোনো ঘোষণার চেয়ে উষ্ণ।

প্যারিসের সেই হাত ধরা হাঁটা যেন তাঁদের সম্পর্ককে নতুন ভাষা দিল। মুহূর্তটি এতটাই সিনেমাটিক যে মনে হয়, কোনো পরিচালক দৃশ্যটি আগে লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু জীবনের কিছু দৃশ্য লেখা থাকে না। সেগুলো হঠাৎ এভাবেই ঘটে যায়।

২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর তাঁদের দেখা যায় জাপানের আসাকুসায়। টোকিওর এই পরিচিত পর্যটন এলাকায় একদিকে জাপানি ঐতিহ্যের ছায়া, অন্যদিকে আধুনিক শহরের ব্যস্ততা। মানুষের ভিড়, সরু রাস্তা, পর্যটকের কৌতূহল, সবকিছুর ভেতর দিয়ে হাঁটছিলেন দুজন। ট্রুডোর গায়ে কালো কোট, মাথায় ক্যাপ। কেটির গায়ে বাদামি লেদার জ্যাকেট, মুখে মাস্ক। কিন্তু মুখ ঢাকা থাকলেও প্রেম ঢাকা থাকে না। কারণ তাঁদের হাত তখনও একসঙ্গে।

আসাকুসার সেই দৃশ্যের পর তাঁদের সম্পর্ক আর গোপন থাকার মতো ছিল না। কিছুদিনের মধ্যেই এই প্রেমের গল্প পৌঁছে যায় আরও এক ভিন্ন মঞ্চে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে।

২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। বরফঢাকা সুইজারল্যান্ড, পাহাড়ের গায়ে আলো, বিশ্বনেতা ও প্রভাবশালী মানুষদের জমায়েত। সেই গম্ভীর মঞ্চে জাস্টিন ট্রুডো বক্তৃতা দিলেন মানবিক কূটনীতি নিয়ে, বিশ্বের সম্পর্কের ভাষা নিয়ে। সামনের সারিতে বসে আছেন কেটি পেরি। তাঁর পোশাকে তারকার আভা, তাঁর উপস্থিতিতে কৌতূহলের ঢেউ।

দৃশ্যটি অদ্ভুত সুন্দর। একদিকে বিশ্বনীতি, অন্যদিকে প্রেম। মঞ্চে ট্রুডো বলছেন পৃথিবীর কথা, আর সামনের সারিতে বসা কেটি যেন তাঁর নতুন জীবনের ব্যক্তিগত সাক্ষী। ক্ষমতার মঞ্চ থেকে নেমে আসা মানুষটির পাশে এবার আর কোনো রাজনৈতিক উপদেষ্টা নন, একজন পপতারকা। তবু তাঁর উপস্থিতি শুধু গ্ল্যামার নয়। সেখানে ছিল সমর্থন, ছিল পাশে থাকার ঘোষণা।

দাভোসের পর তাঁদের সম্পর্ক আর শুধু জনসম্মুখে দেখা যাওয়ার ঘটনা ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ট্রুডো ধীরে ধীরে কেটির জীবনের পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন। এপ্রিলের শুরুতে তাঁদের আরেকটি ছবি আলোচনায় আসে। কালো স্যুটে ট্রুডো, কালো পোশাকে কেটি। তাঁর হাত ট্রুডোর ল্যাপেলের কাছে, মুখে উজ্জ্বল হাসি। ছবিতে ছিল গ্ল্যামারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। যেন তাঁরা আর পৃথিবীর চোখকে ভয় পাচ্ছেন না। যারা তাকাতে চায়, তাকাক। যারা বিচার করতে চায়, করুক। তাঁদের ভঙ্গিতে ছিল নিজেদের মুহূর্তে ডুবে থাকার অনায়াস স্বস্তি।

১১ এপ্রিল ক্যালিফোর্নিয়ার ইন্ডিও শহরের কোচেল্লা সংগীত উৎসবে তাঁদের দেখা যায় জাস্টিন বিবারের পারফরম্যান্স উপভোগ করতে। কোচেল্লা ভ্যালির মরুভূমির বাতাসে সেদিন ছিল সংগীত, আলো, ধুলো আর তারুণ্যের উল্লাস। সেখানে ট্রুডো ও কেটি নাচছেন, গান শুনছেন, খাবার খাচ্ছেন, হাত ধরে আছেন। রাজনীতির পডিয়াম থেকে বহু দূরে, কিন্তু ক্যামেরার চোখ থেকে দূরে নয়।

২০২৬ সালের ৮ জুন। ট্রাইবেকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। কেটি পেরির কনসার্ট চলচ্চিত্রের ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। নিউ ইয়র্ক এমনিতেই প্রেম, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পুনর্জন্মের শহর। এখানে মানুষ হারায়, খুঁজে পায়, আবার নিজেকে নতুন করে বানায়। সেই শহরের আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় লাল গালিচায় পাশাপাশি দাঁড়ালেন জাস্টিন ট্রুডো ও কেটি পেরি।

প্রিমিয়ারের পর আলোচনায় কেটি পেরি ট্রুডোকে “love of my life” বলে উল্লেখ করেন। এই একটি বাক্য যেন এতদিনের সব গুঞ্জন, ছবি, যাত্রা ও হাত ধরার দৃশ্যকে একসঙ্গে বেঁধে দিল। মন্ট্রিয়লের ডিনার, ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্র, প্যারিসের জন্মদিন, টোকিওর হাত ধরা, দাভোসের বরফ আর কোচেল্লার মরুভূমি যেন এসে মিশল নিউ ইয়র্কের সেই সন্ধ্যায়।

এই সম্পর্ককে কেউ বিস্ময় হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু অনেকেই ভাবেন, এর গভীরে আছে মানুষের চিরন্তন গল্প। ক্ষমতার চূড়ায় দাঁড়িয়েও কেউ নিঃসঙ্গ হতে পারে, খ্যাতির আলোয় থেকেও মানুষের ভেতরে একাকিত্ব থাকতে পারে। তাঁদের মতে, একটি সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও মানুষ নতুন করে কাউকে ভালোবাসতে পারে।

জাস্টিন ট্রুডো ও কেটি পেরির প্রেমকাহিনি তাই শুধু দুই বিখ্যাত মানুষের সম্পর্ক নয়। এটি জীবনের দ্বিতীয় বসন্তের গল্প। এটি সেই সাহসের গল্প, যেখানে মানুষ অতীতকে অস্বীকার করে না, কিন্তু অতীতের কাছে আত্মসমর্পণও করে না। কিছু গল্প শেষ হয়েও শেষ হয় না, শুধু নতুনভাবে শুরু হয়।

এনএন/ ১১ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language