
প্রবাসের ব্যস্ত নগরজীবনে মানুষ প্রতিদিন কাজ, সময়, দায়িত্ব আর টিকে থাকার অদৃশ্য হিসাব নিয়ে ছুটে চলে। এই অবিরাম ছুটে চলার ভেতর একটি বইমেলা মানুষকে বইয়ের কাছে বসতে আহ্বান জানায়। নিজের ভাষার দিকে, ফেলে আসা দিনের দিকে, শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ করে দেয়। টরন্টোর বাংলা বইমেলা তেমনই এক আয়োজন।
‘বই বিমুখতা অবক্ষয়ের কারণ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে গত ৩০ ও ৩১ মে ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয় টরন্টো বাংলা বইমেলার ২০তম আসর। অন্যমেলার উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী এ আয়োজন ঘিরে কানাডার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, প্রকাশক, পাঠক ও বইপ্রেমীরা। মন্ট্রিয়ল, অটোয়া, ক্যালগেরি, কিংস্টন, হ্যামিল্টন এবং টরন্টোর আশপাশের শহরগুলো থেকে আগত মানুষের উপস্থিতিতে মেলার প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল এক টুকরো বাংলাদেশ।

টরন্টো বইমেলার কুড়িতম আসরের প্রাক উদ্বোধনী পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ২৯ মে ২০২৬, শুক্রবার। নগরীর ডেন্টোনিয়া পার্কে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মারক স্তম্ভের প্রাঙ্গণে এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। ভাষা স্মারকের সামনে বাংলা বইমেলার সূচনা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। মাতৃভাষার স্মৃতি, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রবাসে বাংলা চর্চার দায় যেন এক জায়গায় এসে মিলেছিল সেই আয়োজনে।

মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় জৈন সোসাইটি অব টরন্টোর নান্দনিক অডিটোরিয়ামে। দুই দিনের এ আয়োজন ছিল পরিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক। স্থানীয় শিল্পীদের নাচ, গান, আবৃত্তি, বিষয়ভিত্তিক আলোচনা এবং নানা সাংস্কৃতিক পর্বে প্রায় দুই শতাধিক অংশগ্রহণকারী মঞ্চকে উদ্দীপ্ত করে রাখেন। মঞ্চ সঞ্চালনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন দিলারা নাহার বাবু, কাজী বাসিত, ফ্লোরা সূচি প্রমুখ। বইয়ের সঙ্গে শিল্প, শিল্পের সঙ্গে ভাষা, আর ভাষার সঙ্গে মানুষের আবেগ মিলেমিশে পুরো আয়োজনকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক আসরে পরিণত করে।

বাংলাদেশ থেকে বইয়ের পসরা নিয়ে উপস্থিত হয় স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাতিঘর, অনন্যা, কথাপ্রকাশ, কবি প্রকাশনী, ইত্যাদি, অভ্র প্রকাশনাসহ আরও অনেকে। স্থানীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও লেখকরাও অংশ নেন এ আয়োজনে। ফলে মেলার স্টলগুলো হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের নতুন ও পুরোনো বইয়ের এক সুন্দর সংযোগস্থল। বহু দূর পেরিয়ে প্রকাশকদের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে, প্রবাসী পাঠকের কাছে বাংলা বইয়ের আবেদন এখনো গভীর।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাও, ফেডারেল এমপি ডলি বেগম, কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ও বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. এএসএম নুরুল্লাহ তরুণ, উদীয়মান রাজনীতিবিদ মোরশেদ নিজাম, স্কারবরো সাউথ ওয়েস্ট আসনের প্রাদেশিক লিবারেল পার্টির মনোনীত প্রার্থী আহসানুল হাফিজসহ অনেকে। স্থানীয় লেখক, সাংবাদিক, সংগীতশিল্পী, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন সংগঠনের নেতা এবং সমাজসেবীরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা বইমেলার প্রধান উদ্যোক্তা শেখ এস আহমেদ সাদীর দীর্ঘদিনের উদ্যোগ ও নিষ্ঠার প্রশংসা করেন। তাঁরা বলেন, প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অনেকে ভবিষ্যতেও এ উদ্যোগে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। দুই দশক ধরে একটি বইমেলা চালিয়ে নেওয়া সহজ কাজ নয়। এর পেছনে থাকে শ্রম, স্বপ্ন, সংগঠনের শক্তি, স্বেচ্ছাসেবীদের আন্তরিকতা এবং কমিউনিটির ভালোবাসা। ২০তম টরন্টো বইমেলাকে সফল করতে যাঁরা প্রাণপণ শ্রম দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাইদা বারী, সায়েদা ফাতেমা, শাপলা শালুক, রিংকি আহমেদ, কাউসার ফেরদৌস এবং জামানা হাসিনা জাফরান।

কুড়িতম বইমেলার এ আয়োজনে বিভিন্ন পর্যায়ে অবদান রাখার জন্য সম্মাননা প্রদান করা হয়। শিল্প, সাহিত্য, সংগঠন, শিক্ষা ও সমাজকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির ধারাকে এগিয়ে নিতে যাঁরা নিয়মিত কাজ করছেন, তাঁদের প্রতি এই স্বীকৃতি ছিল সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ।

অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনায় উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী শাহজাহান কামাল, বাংলাদেশ থেকে আগত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী তামান্না মান্নান, চন্দন পাল ও সারা বিল্লাহ প্রমুখ। তাঁদের পরিবেশনা বইমেলার সাংস্কৃতিক পর্বকে সমৃদ্ধ করে।

আবৃত্তি পর্বেও ছিল উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। অন্যস্বর, বাচনিক ও উত্তরের জানালা আবৃত্তি সংগঠনের পরিবেশনা দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। কবিতার উচ্চারণে মঞ্চে ফিরে আসে বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ও ভাবের গভীরতা। প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য এসব আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে শিশুদের পরিবেশনা বিশেষ প্রশংসা কুড়ায়। বইমেলার সার্থকতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষা, বই ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে। শিশুদের গান, আবৃত্তি ও নৃত্য প্রমাণ করে, কানাডার মাটিতেও বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে ভালোবাসা ও চর্চার মধ্য দিয়ে। শিশুদের এ পর্বটি পরিচালনা করেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ মৈত্রেয়ী দেবী।
বইমেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের পরিবেশনাও ছিল আয়োজনের উল্লেখযোগ্য অংশ। প্রবাসে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উপস্থাপনা অনেকের মনে ফিরিয়ে আনে ক্যাম্পাসজীবনের সাংস্কৃতিক স্মৃতি। যাঁরা একসময় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় সাহিত্য, সংগীত, আড্ডা ও শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের কাছে এসব পরিবেশনা হয়ে ওঠে আবেগঘন পুনর্মিলনের মতো।
নৃত্য পরিবেশনায় ছিল বিপ্লব করের নৃত্যকলা কেন্দ্র এবং অরুণা হায়দারের সুকন্যা নৃত্যাঙ্গন। একক নৃত্য পরিবেশনায় পারমিতা তিন্নি ও অনিন্দিতা রায়ের উপস্থাপনা দর্শকদের মনোযোগ কাড়ে। বাংলা বইমেলার মঞ্চে নৃত্যের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে, বইয়ের সঙ্গে সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার সম্পর্ক গভীর। সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও আলোচনা একসঙ্গে মিলেই একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করে।
টরন্টোর বাংলা বইমেলা শুধু একটি বার্ষিক আয়োজন নয়, এটি শহরটির বাঙালি সাংস্কৃতিক জাগরণেরও প্রতিচ্ছবি। বাংলা সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডের কথা উঠলে ঢাকা ও কলকাতার পর অনেকেই এখন টরন্টোর নাম উল্লেখ করেন। এ শহরে গানের স্কুল, নাচের স্কুল, নাট্যদল, আবৃত্তি সংগঠন, সাহিত্য সংগঠনসহ শিল্পকলার প্রায় প্রতিটি শাখার নিয়মিত কার্যক্রম চোখে পড়ে। এই ধারাবাহিক চর্চাই টরন্টোকে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক নগরীতে পরিণত করেছে।
টরন্টোতে রয়েছে শতাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। প্রতি বছর বিশাল মাঠে খোলা আকাশের নিচে অনুষ্ঠিত হয় বড় বড় মেলা, জমে ওঠে স্ট্রিট ফেস্টিভেল। এছাড়া নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান টরন্টোর বাঙালি জনজীবনকে সারা বছরই সক্রিয় রাখে। সম্প্রতি টরন্টো সিটি করপোরেশন বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা ‘বাংলা টাউন’কে সাংস্কৃতিক জেলা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতি শুধু একটি এলাকার প্রশাসনিক পরিচয় নয়, টরন্টোর বহুসাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির দৃশ্যমান উপস্থিতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি।
এই প্রেক্ষাপটে টরন্টো বাংলা বইমেলার ২০তম আসর আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দশক ধরে এ আয়োজন প্রবাসী জীবনের পরিবর্তিত বাস্তবতার ভেতরেও বাংলা বইকে মানুষের কাছে রাখার চেষ্টা করে এসেছে। নতুন প্রজন্মের হাতে বই তুলে দেওয়া, পাঠক ও লেখকের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা এবং বাংলা ভাষার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষেত্রে বইমেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ‘বই বিমুখতা অবক্ষয়ের কারণ’ প্রতিপাদ্যটিও তাই সময়োপযোগী। কারণ বই থেকে দূরে সরে গেলে মানুষ শুধু পাঠাভ্যাস হারায় না, হারায় চিন্তার গভীরতা ও সংস্কৃতির ভেতরের শক্তিও।
কুড়িতম টরন্টো বাংলা বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয় একটি সুদৃশ্য ও মনোরম স্যুভেনির। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা প্রচ্ছদে সজ্জিত এই স্যুভেনির সম্পাদনা করেন তাপস কর্মকার।

সবশেষে বইমেলার আহ্বায়ক শেখ সাদী আহমেদ স্বেচ্ছাসেবক, অংশগ্রহণকারী, সহযোগী, শিল্পী, প্রকাশক, পাঠক এবং যাঁরা বিভিন্নভাবে এ আয়োজনকে সফল করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে তিনি ২০২৭ সালের ২৯ ও ৩০ মে ২১তম টরন্টো বাংলা বইমেলা আয়োজনের ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয় কুড়িতম বইমেলার দুই দিনের প্রাণবন্ত আয়োজন।
এনএন/ ২ জুন ২০২৬









