
কানাডার বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম বৃহৎ সংগঠন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব টরন্টোর সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে সভাপতি পদে এগিয়ে থেকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন বিশিষ্ট রিয়েলটর এবাদ চৌধুরী। তিনি ১২৬ ভোটের ব্যবধানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেন। তবে ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো প্যানেল এককভাবে পুরো সংগঠনের নেতৃত্ব পায়নি। ২৯টি পদের মধ্যে রনি, মারুফ ও রাসেল প্যানেল জয় পেয়েছে ২০টি পদে, আর এবাদ, ময়নুল ও বাবুল প্যানেল জয় পেয়েছে ৯টি পদে।
এই ফলাফল এবাদ চৌধুরীর জন্য আনন্দের হলেও, একই সঙ্গে এটি তাঁর নেতৃত্বের জন্য একটি বড় বাস্তবতার বার্তাও বহন করে। তিনি সভাপতি পদে ঘোষিত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর সামনে যে কমিটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি তাঁর একক প্যানেলের নয়। কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ভিন্ন সমর্থনভিত্তি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে এখন তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ পেছনে ফেলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সংগঠন পরিচালনা করা।
তবে অনানুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার পরপরই নির্বাচনকালীন সময়ে এবাদ চৌধুরীর ভূমিকা নিয়ে কমিউনিটির ভেতরে নানা আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে। এগুলোর অনেকটাই নির্বাচনী উত্তেজনার অংশ, আবার কিছু প্রশ্ন নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ আচরণ ও দায়িত্ববোধের সঙ্গেও জড়িত।
প্রথমত, ফলাফল ঘোষণার আগের দিন এবাদ চৌধুরী নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে তিনি নির্বাচনকালীন সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু নির্বাচনের অনানুষ্ঠানিক ফলাফল তাঁর পক্ষে যাওয়ার পর এখন অনেকের প্রত্যাশা, তিনি আগের বক্তব্য ও অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করে নির্বাচন কমিশন, স্বেচ্ছাসেবক এবং সংশ্লিষ্ট সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় দেবেন।
দ্বিতীয়ত, ২২ মে হাঙ্গেরিয়ান সেন্টারের ভোট গণনার জন্য লকার থেকে ব্যালট বাক্স আনাকে কেন্দ্র করে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয় বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত লকার খুলে ব্যালট বাক্স আনা হয় এবং ভোট গণনা দেরিতে শুরু হয়। এ ঘটনা কমিউনিটির ভেতরে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন এবাদ চৌধুরীর উচিত, ঘটনাটি নির্বাচনী উত্তেজনার মধ্যে ঘটেছে বলে ব্যাখ্যা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা। এতে তাঁর নেতৃত্বের দুর্বলতা নয়, বরং পরিপক্বতা ও দায়িত্ববোধ প্রকাশ পাবে।
তৃতীয়ত, ১৮ মে স্পাইসি গ্রিল রেস্টুরেন্টে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন সংখ্যাগত উপস্থাপনায় ভুল করে। ওই ভুলের পর গণনাকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে উত্তেজনা দেখা দেয়। বাইরে অপেক্ষমাণ এবাদ চৌধুরীর অনেক সমর্থক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। এ দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় কমিউনিটির ভাবমূর্তি নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ ঘটনার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সভাপতি হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর এবাদ চৌধুরীর উচিত, এ ঘটনার জন্য কমিউনিটির কাছে দুঃখ প্রকাশ করা এবং তাঁর সমর্থকদের সংযত, দায়িত্বশীল ও শালীন আচরণের জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানানো। নেতৃত্বের মর্যাদা শুধু বিজয়ে নয়, উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মধ্যেও প্রকাশ পায়।
চতুর্থত, ভোটগ্রহণ ও গণনার কাজে যে তরুণ তরুণীরা সহযোগিতা করেছিলেন, তাঁদের ভূমিকা নিয়েও নির্বাচনকালীন সময়ে এবাদ চৌধুরী আপত্তি তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের নিয়ে কিছু অশোভন মন্তব্য হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ নতুন প্রজন্মের তরুণ তরুণীরা যখন স্বেচ্ছায় কমিউনিটির কাজে যুক্ত হন, তখন তাঁদের উৎসাহিত করা উচিত, নিরুৎসাহিত করা নয়। তাঁদের কাজ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে সেটি শালীন ভাষায়, প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে এবং প্রমাণভিত্তিকভাবে তোলা যেত। এখন সভাপতি হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর এবাদ চৌধুরীর দায়িত্ব হবে এসব তরুণ তরুণীর আস্থা ফিরিয়ে আনা। তাঁদের এবং তাঁদের অভিভাবকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা তাঁর জন্য দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের প্রতি কেউ যেন অযথা অভিযোগের আঙুল না তোলে, সে বিষয়ে কমিউনিটির নেতৃবৃন্দকেও সচেতন থাকতে হবে।
পঞ্চমত, ভোটগ্রহণ সহজ করতে অনলাইনে ভোট গ্রহণের একটি প্রস্তাব ছিল বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। জানা যায়, অন্য দুই প্যানেল এ প্রস্তাবে সমর্থন দিলেও এবাদ চৌধুরী এতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন, অনলাইনে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে আরও বেশি ভোটার নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন। এ বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবাদ চৌধুরীর উচিত হবে এ বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া। তিনি বলতে পারেন, অনলাইন ভোট গ্রহণের বিষয়ে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও প্রস্তুতি না থাকায় তিনি তখন আপত্তি জানিয়েছিলেন। তবে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর ভোটব্যবস্থা, অনলাইন ভোটিং এবং প্রয়োজনে ইভিএম পদ্ধতি চালু করবেন বলে অঙ্গীকার করতে পারেন। নতুন কমিটির উচিত হবে আবেগ নয়, বাস্তবতা, স্বচ্ছতা ও ভোটারদের সুবিধা বিবেচনা করে ভবিষ্যতের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
ষষ্ঠত, কমিউনিটির ভেতরে আরেকটি আলোচনা রয়েছে যে এবাদ চৌধুরী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাইরের পরামর্শের ওপর বেশি নির্ভর করেন। এ অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, একজন সভাপতির জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায় ও দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সভাপতিকেই নিতে হয়। এবাদ চৌধুরীকে মনে রাখতে হবে, সংগঠনের চালকের আসনে বসলে স্টিয়ারিং নিজের হাতেই রাখতে হয়।
এবাদ চৌধুরী এখন বিজয়ের আনন্দে আছেন। তিনি তাঁর সহকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে মনে রাখতে হবে, নির্বাচনকালে তাঁর বক্তব্য, তাঁর অভিযোগ, তাঁর সমর্থকদের আচরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত নানা ভাষ্য অনেকের মনে অস্বস্তি ও কষ্ট তৈরি করেছে। বিশেষ করে যারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদের পরিবারগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানা যায়। একজন সভাপতি হিসেবে এখন তাঁর দায়িত্ব হবে সেই আস্থার ক্ষত মেরামত করা।
এই নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়েছেন, তাঁরা এখন আর কোনো প্যানেলের নন। তাঁরা সবাই জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি, সিলেটবাসীর প্রতিনিধি। যে যে প্যানেল থেকেই নির্বাচিত হোন, সভাপতি হিসেবে এবাদ চৌধুরীর দায়িত্ব তাঁদের সবাইকে আপন করে নেওয়া। কাউকে সন্দেহের চোখে নয়, সহযোগীর চোখে দেখতে হবে।
নির্বাচন মানুষকে আলাদা করে, নেতৃত্ব মানুষকে এক করে। এবাদ চৌধুরীর সামনে এখন সেই সুযোগ। তিনি চাইলে সংগঠনের সব বিভাজন দূর করে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনকে নতুন আস্থা ও মর্যাদার জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত সভাপতি হওয়া কোনো গন্তব্য নয়। এটি দায়িত্বের শুরু। এখন দেখা যাবে, এবাদ চৌধুরী কেবল নির্বাচনে জিতেছেন, নাকি নেতৃত্বের পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে পারেন।
এস এম/ ২৪ মে ২০২৬









