সম্পাদকের পাতা

যে কিশোর বদলে দিচ্ছেন ফুটবলের ভবিষ্যৎ

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। ডালাসের বিশাল স্টেডিয়ামে লাল জার্সির ঢেউ। একদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স, যে দল গত দুই আসরের ফাইনাল খেলেছে। অন্যদিকে ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন স্পেন। ডান প্রান্তে বল পেলেন লামিন ইয়ামাল। সামনে অভিজ্ঞ ফরাসি রক্ষণ। বল নিয়ন্ত্রণে রেখে তিনি ভেতরের দিকে এগোতেই তাঁকে থামাতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনল ফ্রান্স। সেই আক্রমণ থেকে পাওয়া পেনাল্টিতে গোল করেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। খুলে যায় স্পেনের ফাইনালে ওঠার পথ।

কিছুক্ষণ পর ইয়ামাল নিজেও বল পাঠিয়েছিলেন জালে। অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। হতাশা পেছনে ফেলে তিনি আবার বল চাইলেন, আবার প্রতিপক্ষের দিকে এগোলেন। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে ২–০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল স্পেন। সাত ম্যাচের ছয়টিতে গোল না খাওয়া দলটির এই দুর্দান্ত অভিযানে আক্রমণভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন সদ্য উনিশে পা দেওয়া ইয়ামাল।

জন্মদিনের পরদিনই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, আর সেই ম্যাচ জিতে নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই ফাইনালে পৌঁছে যাওয়া। এমন উপহার পৃথিবীর খুব কম ফুটবলারই পেয়েছেন। তবে লামিন ইয়ামালের জীবনে বয়স ও অর্জনের হিসাব কখনোই সাধারণ নিয়ম মেনে চলেনি। অধিকাংশ কিশোর যখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করে, তখন তিনি বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে খেলছেন। অন্য তরুণেরা যে বয়সে কিংবদন্তিদের ছবি ঘরের দেয়ালে টাঙায়, সেই বয়সেই ইয়ামালের ছবি নিয়ে নতুন প্রজন্ম স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

তাঁর পুরো নাম লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। জন্ম ২০০৭ সালের ১৩ জুলাই, কাতালোনিয়ায়। মরক্কান বাবা ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনির মায়ের সন্তান ইয়ামাল বড় হয়েছেন মাতারোর রোকাফোন্ডা এলাকায়। বার্সেলোনার পর্যটনকেন্দ্রিক চাকচিক্যের বাইরে অবস্থিত এই শ্রমজীবী জনপদেই ফুটবলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর হতে থাকে।

বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে বেড়ে ওঠা ইয়ামালের মূল দলে অভিষেক হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে, বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর ২৯১ দিন। ২০২৪–২৫ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি ১৮ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ২১টি গোল। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, তিনি এখন শুধু সম্ভাবনাময় কিশোর নন, বার্সেলোনার আক্রমণের অন্যতম প্রধান ভরসা। মাঠের সাফল্যের সঙ্গে বেড়েছে তাঁর বাজারমূল্যও। উনিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবলারদের কাতারে জায়গা করে নেন।

স্পেনের জার্সিতেও তাঁর আগমন হয়েছিল রেকর্ড ভাঙার মধ্য দিয়ে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জর্জিয়ার বিপক্ষে ১৬ বছর ৫৭ দিন বয়সে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক করেন ইয়ামাল এবং গোলও করেন। সেই ম্যাচেই তিনি স্পেনের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় ও সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হয়ে ওঠেন। এরপর ইউরো ২০২৪ তাঁকে সম্ভাবনাময় কিশোর থেকে বিশ্বতারকায় পরিণত করে।

সেই আসরের সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল ফ্রান্স। স্পেন পিছিয়ে পড়ার পর বক্সের বাইরে বল পেয়েছিলেন ইয়ামাল। সামনে ছিলেন আদ্রিয়াঁ রাবিও। সামান্য জায়গা তৈরি করে বাঁ পায়ে এমনভাবে বলটি বাঁকিয়ে পাঠালেন যে গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁর পক্ষে সেটি নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি। পোস্টে লেগে বল জালে ঢুকে যায়। ওই গোলের মাধ্যমে তিনি ইউরোর ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হন। পরে সেটি প্রতিযোগিতার সেরা গোল নির্বাচিত হয়। ফাইনালে নিকো উইলিয়ামসের গোলেও সহায়তা করেন ইয়ামাল। স্পেন শিরোপা জেতে, আর তিনি নির্বাচিত হন প্রতিযোগিতার সেরা তরুণ খেলোয়াড়।

দুই বছর পর বিশ্বকাপে তাঁর ওপরও বড় প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামে স্পেন। পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে তাঁর নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে একে ইয়ামালের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে বর্ণনা করেন। সেই জয়ে ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে ওঠে স্পেন। বেলজিয়ামকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছানোর পর ফ্রান্সের বিপক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইয়ামাল। তাঁর আদায় করা পেনাল্টি থেকেই এগিয়ে যায় স্পেন এবং শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করে ফাইনালের টিকিট।

লামিন ইয়ামালের গল্প অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের জন্য বিশেষ অনুপ্রেরণার। ভিন্ন সংস্কৃতি ও শিকড়ের উত্তরাধিকার নিয়ে বেড়ে ওঠা ইয়ামাল আজ স্পেনের নতুন প্রজন্মের এক উজ্জ্বল মুখ।

উনিশ বছরেই লামিন ইয়ামাল যে পথ পাড়ি দিয়েছেন, অনেক বড় খেলোয়াড় পুরো ক্যারিয়ারেও সেখানে পৌঁছাতে পারেন না। তবে ফুটবলবিশ্ব ইতিমধ্যেই বুঝে গেছে, নতুন যুগের সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি লেখা হচ্ছে তাঁর পায়ে।

তথ্যসূত্র:
Associated Press (July 14, 2026)


Back to top button
🌐 Read in Your Language