
যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সাইবার হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ। পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের একটি সাধারণ পারিবারিক ফ্ল্যাট থেকে কাজ করা এই তরুণ আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে যুক্ত অনলাইন চক্রের মাধ্যমে শত শত মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন হয়েছে।
তাঁর নাম তালহা জুবায়ের। ইংরেজিতে নামটি Thalha Jubair। বয়স বিশ বছর। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক এবং তাঁর পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশে।
২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করেই Transport for London (TfL)-এর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক সংকেত ধরা পড়তে শুরু করে। প্রথমে বিষয়টিকে সীমিত প্রযুক্তিগত সমস্যা বলে মনে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি সাধারণ কোনো ত্রুটি নয়। পরে তদন্তে জানা যায়, সাইবার অপরাধীরা এর আগের দিন, ৩১ আগস্টই সংস্থাটির কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়েছিল।
তারপর শুরু হয় অস্থিরতা। অনলাইন সেবার একটি অংশ বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম জানায়, প্রায় এক কোটি গ্রাহক এ হামলার শিকার হন। যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ তদন্ত সংস্থা (NCA)-র হিসাবে, হামলা ও ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে TfL-এর ক্ষতি হয় ২৯ মিলিয়ন পাউন্ড। প্রায় ২৮ হাজার কর্মীকে কার্যালয়ে গিয়ে নিজেদের পাসওয়ার্ড বদলাতে হয়।
প্রশ্ন ওঠে, এত সুরক্ষার ভেতর ঢুকল কারা? উত্তর খুঁজতে তদন্ত শুরু করে NCA এবং লন্ডন পুলিশ। সেই অনুসন্ধান তদন্তকারীদের নিয়ে যায় পূর্ব লন্ডনের এক তরুণের কাছে।
অনলাইনে তালহার পরিচয় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত Scattered Spider নামের একটি সাইবার অপরাধী নেটওয়ার্কের সদস্য ছিলেন। দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে পূর্ব লন্ডনের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিনে ওয়ালসলে নিজের বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন ওয়েন ফ্লাওয়ার্স। নয় মাস পর, ২০২৬ সালের ২২ জুন উলউইচ ক্রাউন কোর্ট (Woolwich Crown Court) -এ বিচার শুরু হওয়ার দিনই দুজন নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন।
Scattered Spider কোনো প্রচলিত অপরাধী সংগঠন নয়। এর নির্দিষ্ট কার্যালয় নেই। অনলাইনে যুক্ত সদস্যরা বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিভ্রান্ত করে লগইন তথ্য হাতিয়ে নিত, অন্যের ফোন নম্বর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনত এবং পরিচয় যাচাইয়ের নিরাপত্তা পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ঢুকত। জটিল প্রযুক্তির চেয়েও মানুষের বিশ্বাস ও অসতর্কতাকে কাজে লাগানো ছিল তাদের বড় অস্ত্র।
তদন্তে বড় অগ্রগতি আসে ফ্লাওয়ার্সের বাসা থেকে উদ্ধার করা কম্পিউটার পরীক্ষা করার পর। একটি ল্যাপটপে TfL-এর কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগের ছবি এবং হামলার সময় তালহাকে সেই নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে দেখা যায় এমন ভিডিও পাওয়া যায়। হামলার সময় দুজন Telegram-এ নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান করছিলেন। এসব প্রমাণ মিলিয়ে তদন্তকারীরা তাঁদের ভূমিকা শনাক্ত করেন।
তালহার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগের দাবি, তিনি এমন একটি চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যারা বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০টি কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করে। এর মধ্যে অন্তত ৪৭টি প্রতিষ্ঠান ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ১১৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি মুক্তিপণ দিয়েছে বলে মার্কিন নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিচার এখনো যুক্তরাষ্ট্রে চলমান।
মার্কিন তদন্তকারীরা তালহার নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করা একটি সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত ক্রিপ্টো ওয়ালেট থেকে প্রায় ৩৬ মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ করেন। তবে জব্দের আগেই প্রায় ৮ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার অন্য একটি ওয়ালেটে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত একটি খাবারের অর্ডার তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। মার্কিন তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি সার্ভারে থাকা ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে কেনা গিফট কার্ড ব্যবহার করে খাবার অর্ডার করা হয়েছিল। সেই অর্ডার পৌঁছেছিল তালহার অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে। খাবারের অর্ডার থেকে পাওয়া সূত্রটি অন্য ডিজিটাল প্রমাণের সঙ্গে মিলে যাওয়ার পর তদন্তকারীরা তালহার পরিচয় নিশ্চিত করেন এবং দীর্ঘ তদন্তের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করেন।
কম্পিউটারে পাওয়া তথ্য, অনলাইন কথোপকথন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের তথ্য মিলিয়ে তদন্তকারীরা তালহা ও ফ্লাওয়ার্সের বিরুদ্ধে মামলাটি গড়ে তোলেন। আগামী ১৬ জুলাই তাঁদের সাজা ঘোষণার কথা রয়েছে। TfL-এর কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের দায়ে এই দুই তরুণকে কত বছরের সাজা দেওয়া হবে, তা জানা যাবে সেদিন।
তথ্যসূত্র:
The Guardian (June 2026)
National Crime Agency (June 2026)
Transport for London









