
রাত তখন সাড়ে নয়টার কাছাকাছি। ফিলাডেলফিয়ার Kingsessing এলাকার রাস্তাগুলো দিনের কোলাহল ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছিল। ঘরের ভেতর কেউ হয়তো রাতের খাবার টেবিলে বসেছে, কারও চোখ হয়তো দরজার দিকে, ডেলিভারি আসার অপেক্ষায়। শহরের এ এক পরিচিত দৃশ্য। দরজার সামনে খাবার পৌঁছে দেওয়া এখন নগরজীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার আড়ালেই কখনও কখনও লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য বিপদ, এমন এক বিপদ যা মানুষের জীবিকার পথকে মুহূর্তে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিতে পারে।
মঙ্গলবার রাতের ফিলাডেলফিয়া এমনই এক ঘটনার সাক্ষী হলো। DoorDash-এর খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে গুলিতে নিহত হলেন বাংলাদেশের রাজশাহীর সন্তান, নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়ার বাসিন্দা মো. মাহফুজুল হক। বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৩। তিনি ছিলেন একজন অভিবাসী শ্রমজীবী মানুষ, যাঁর দিনযাপন ছিল কাজ, পরিবার আর ভবিষ্যৎকে ঘিরে। জীবনের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যিনি মহাসমুদ্রের এপারে ঘর বেঁধেছিলেন, সেই দেশেই এক রাতে তাঁর জীবন থেমে গেল একটি অচেনা দরজার সামনে।
ঘটনাটি ঘটে ফিলাডেলফিয়ার সাউথ আইথান স্ট্রিটের ১০০০ ব্লকে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে নয়টার দিকে সেখানে গুরুতর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাহফুজুল হককে পাওয়া যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে থেমে থাকেনি। তদন্তের শুরুতেই এমন কিছু তথ্য সামনে আসে, যা পুরো ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
পুলিশ সেখানে গিয়ে দেখতে পায়, মাহফুজুল হকের গাড়ি তখনও চালু অবস্থায় ছিল। পাশে পড়ে ছিল DoorDash-এর ডেলিভারি ব্যাগ। সেখান থেকে রাইফেলজাতীয় অস্ত্রের ব্যবহৃত দুটি খোসা উদ্ধার করা হয়। কাছাকাছি কয়েকটি মোবাইল ফোনও পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও একটি রহস্যজনক তথ্য হলো, কিছুটা দূরে খাবারের একটি ব্যাগ পাওয়া যায়। সেটি তাঁর ডেলিভারির সঙ্গে যুক্ত কি না, পুলিশ এখনো নিশ্চিত করেনি। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, মাহফুজুল হক কি সত্যিই একটি সাধারণ ডেলিভারির কাজে সেখানে গিয়েছিলেন, নাকি তাঁকে সেখানে ডেকে নেওয়া হয়েছিল?
তদন্তকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে আরেকটি তথ্য। পুলিশ যে ঠিকানায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি যাচাই করে, সেখানে বসবাসকারীরা জানান, তাঁরা DoorDash-এ কোনো খাবার অর্ডার করেননি। এই একটি তথ্য পুরো ঘটনার চরিত্র বদলে দেয়। সাধারণ ডেলিভারি, ভুল ঠিকানা, ছিনতাই নাকি পরিকল্পিত ফাঁদ, তদন্ত কোন পথে এগোবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ একজন ডেলিভারি কর্মী সাধারণত অ্যাপের নির্দেশনা মেনেই ঠিকানায় যান। অর্ডার না থাকা সত্ত্বেও যদি তাঁকে সেখানে পাঠানো হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্ডারটি কে করেছিল? কেন করেছিল? অর্ডারটি কি ভুয়া ছিল? আর ভুয়া হলে লক্ষ্য কি শুধু ছিনতাই, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো উদ্দেশ্য ছিল?
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে মুখোশধারী তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে খোঁজা হচ্ছে। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা গাঢ় পোশাক পরা ছিল এবং ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তাদের নাম, পরিচয় কিংবা ছবি প্রকাশ করা হয়নি। কোনো গ্রেপ্তারের খবরও পাওয়া যায়নি। এই অনিশ্চয়তাই ঘটনাটিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। কারণ সন্দেহভাজনরা ধরা পড়েনি, আর তাদের উদ্দেশ্যও পরিষ্কার নয়।
মাহফুজুল হক শুধু একজন DoorDash কর্মী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি পরিবারের ভরসা, একজন স্বামী, একজন পিতা, একজন অভিবাসী বাংলাদেশি, যিনি পরিশ্রম করে জীবনের হিসাব মেলাতে চেয়েছিলেন। তাঁর রেখে যাওয়া ১৪ বছর বয়সী সন্তান এখন এমন এক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে, যার কোনো সহজ উত্তর নেই। স্ত্রী হারালেন জীবনসঙ্গীকে। পরিবার হারাল প্রিয় মানুষকে।
স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির সূত্রে জানা যায়, মাহফুজুল হক জীবিকার প্রয়োজনে DoorDash-এর মতো অ্যাপভিত্তিক ডেলিভারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। আমেরিকার বড় শহরগুলোতে হাজার হাজার অভিবাসী এমন কাজের ওপর নির্ভর করেন। কেউ গাড়ি চালান, কেউ খাবার পৌঁছে দেন, কেউ রাতের শহরে অচেনা দরজায় কড়া নাড়েন। কাজটি বাইরে থেকে সহজ মনে হলেও এর ভেতরে থাকে ঝুঁকি। অচেনা রাস্তা, অজানা দরজা, রাতের সময়, নির্জন ব্লক এবং কখনও কখনও নগদ অর্থ বা খাবারের প্রলোভনে লুকিয়ে থাকা অপরাধী চক্র। মাহফুজুল হকের মৃত্যু সেই ঝুঁকিরই নির্মম উদাহরণ।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অ্যাপভিত্তিক কাজের নিরাপত্তা। একজন ডেলিভারি কর্মী যখন কোনো ঠিকানায় যান, তিনি ধরে নেন প্ল্যাটফর্মে থাকা তথ্য সঠিক। কিন্তু যদি ভুয়া অর্ডারের মাধ্যমে কাউকে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় টেনে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, প্ল্যাটফর্মের যাচাই প্রক্রিয়া কতটা নিরাপদ? ডেলিভারি কর্মীরা কি যথেষ্ট সুরক্ষা পান? রাতের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজের ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য কোনো কার্যকর সতর্কবার্তা আছে কি? জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? এই প্রশ্নগুলো এখন শুধু মাহফুজুল হকের পরিবারের নয়; আমেরিকার প্রতিটি অ্যাপভিত্তিক ডেলিভারি কর্মীর।
মাহফুজুল হকের শেষ রাত তাই একটি অপরাধের গল্প, আবার একই সঙ্গে অভিবাসী জীবনের কঠিন বাস্তবতারও গল্প। তিনি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে যাননি। তিনি কোনো সংঘর্ষে জড়াতে যাননি। তিনি শুধু খাবার পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন। অথচ সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা। একটি চালু গাড়ি, একটি ডেলিভারি ব্যাগ, অচেনা একটি ঠিকানা, অর্ডার না করা একটি বাড়ি এবং অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া তিন মুখোশধারী মানুষ, এই কয়েকটি সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে এখন ফিলাডেলফিয়া পুলিশ খুঁজছে সেই রাতের সত্য।
তথ্যসূত্র:
NBC10 Philadelphia, ৮ জুলাই ২০২৬
FOX 29 Philadelphia, ৮ জুলাই ২০২৬









