সম্পাদকের পাতা

বিশ্বকাপ মাতালেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপে কখনও কখনও একটি দেশকে চিনিয়ে দিতে একজন ফুটবলারই যথেষ্ট। কেপ ভার্দের জন্য এবার সেই মানুষটি একজন ফরোয়ার্ড নন, কোনো ঝলমলে তরুণ নন। তিনি গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা চল্লিশ বছরের এক গোলরক্ষক, যার গ্লাভসে লেগে আছে আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপদেশের সাহস আর স্বপ্ন। তাঁর নাম ভোজিনহা। পুরো নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। বিশ্বকাপের আগে যাঁকে অনেকেই চিনতেন না, সেই মানুষটিই এখন ফুটবল দুনিয়ায় আলোচনার এক বড় নাম। ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায় এসে তিনি নিজের প্রথম বিশ্বকাপ অভিযানে ছোট্ট এক দেশকে পৃথিবীর আলোচনায় তুলে এনেছেন।

কেপ ভার্দে ফুটবলের বড় মানচিত্রে কখনও নিয়মিত উচ্চারিত নাম ছিল না। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপগুলোর এই দেশটির জনসংখ্যা পাঁচ লাখের কিছু বেশি। বিশ্বকাপের আগে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে তারা ছিল ৬৭ নম্বরে। অথচ সেই দেশই প্রথম বিশ্বকাপ অভিযানে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দলের বিপক্ষে ড্র করে, গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। কেপ ভার্দের এই অভিযানের কেন্দ্রে ছিলেন কোচ বুবিস্তা, এক লড়াকু দল, আর গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকা অভিজ্ঞ ভোজিনহা।

ভোজিনহার বয়স চল্লিশ। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, কেপ ভার্দে যখন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করে, তখন তিনি ছিলেন ৩৯; ২০২৬ সালের ৩ জুন তিনি চল্লিশে পা দেন। ফুটবলে চল্লিশ বছর সাধারণত বিদায়ের বয়স। বিশেষ করে এমন এক খেলায়, যেখানে গতি, শক্তি, প্রতিক্রিয়া আর শরীরী সামর্থ্য প্রতিদিন নতুন করে পরীক্ষা দিতে থাকে। কিন্তু গোলরক্ষকের জায়গাটি আলাদা। এখানে শুধু উঁচুতে লাফিয়ে ওঠা বা জোরে ঝাঁপিয়ে পড়াই শেষ কথা নয়; এখানে সময়জ্ঞান, অবস্থান বোঝার ক্ষমতা, প্রতিপক্ষের শরীরী ভাষা পড়ার দক্ষতা এবং মুহূর্তের ভেতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক স্থিরতাও সমান জরুরি। শট কোথায় যেতে পারে, ফরোয়ার্ড কখন দিক বদলাবে, ডিফেন্ডার কখন জায়গা ছেড়ে দেবে, কর্নারের সময় বল কোন পথে নেমে আসবে, এসব আগেভাগে পড়তে পারার মধ্যেই একজন অভিজ্ঞ গোলরক্ষকের আসল শক্তি। ভোজিনহা সেই অভিজ্ঞতারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বিশ্বকাপে তাঁর প্রথম বড় রাতটি এসেছিল স্পেনের বিপক্ষে। ফুটবল শক্তিতে, অভিজ্ঞতায়, তারকায়, ইতিহাসে স্পেনের সঙ্গে কেপ ভার্দের তুলনা চলেই না। কিন্তু ম্যাচের ৯০ মিনিটে তুলনার সব হিসাব বদলে যায়। স্পেন একের পর এক আক্রমণ গড়ে, আর গোলমুখে দাঁড়িয়ে ভোজিনহা ঠেকিয়ে দেন বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক প্রচেষ্টা। ম্যাচ শেষ হয় ০-০। কেপ ভার্দে পায় তাদের প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট। সেই ম্যাচে ভোজিনহা হন ম্যাচসেরা। শেষ বাঁশির পর তাঁর চোখে পানি ছিল; শুধু আনন্দের নয়, দীর্ঘ জীবনের এক জমে থাকা আবেগের পানি। ওই ম্যাচের পর তাঁর সামাজিক মাধ্যমের অনুসারী ৫৬ হাজার থেকে ১৪.২ মিলিয়নে পৌঁছে যায়।

এই চোখের পানির পেছনেও একটি গল্প আছে। তিনি বড় হয়েছেন দাদা-দাদির কাছে। তাঁর মা কাজ করতেন, বাবা ছিলেন সামরিক দায়িত্বে। শৈশবের সেই ঘর থেকেই তাঁর ডাকনাম হয় “ভোজিনহা”। নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঘরের স্নেহ, আপনজনের ডাক আর শৈশবের স্মৃতি। পরে সেটিই হয়ে যায় তাঁর ফুটবল পরিচয়ের অংশ। অ্যাঙ্গোলায় খেলতে গিয়ে যখন আরেকজন জোসিমারের সঙ্গে নামের মিল তৈরি হয়, তখন তিনি নিজের জার্সিতে ভোজিনহা নামটিই বেছে নেন। কারণ তাঁর দেশ তাঁকে সেই নামেই চিনত।

ভোজিনহার পথ কখনও সরল ছিল না। তিনি তরুণ বয়সে কোনো ইউরোপিয়ান মহাতারকা হয়ে ওঠেননি। তাঁর পেশাদার ফুটবলজীবন শুরু হয় দেরিতে। কেপ ভার্দে, পর্তুগাল, অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া, অনেক দেশ, অনেক ক্লাব, অনেক ছোট-বড় অধ্যায় পেরিয়ে তিনি জাতীয় দলের ভরসা হয়েছেন। তাঁর প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে বড় ট্রফি বলতে ২০১৮-১৯ মৌসুমে সাইপ্রিয়ট কাপ। কিন্তু সব ফুটবলারের জীবন ট্রফির সংখ্যায় মাপা যায় না। কারও জীবন মাপা যায় সেই এক রাতে, যখন পুরো দেশ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে।

বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ময়দানে স্পেনের পর উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ ড্র, সৌদি আরবের বিপক্ষে ০-০ ড্র, গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দে একবারও ৯০ মিনিটে হারেনি। সৌদি আরবের বিপক্ষে ভোজিনহা তিনবার গোলের মুখ থেকে দলকে বাঁচান। তারপর আসে আর্জেন্টিনা ম্যাচ। প্রতিপক্ষ শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নয়, সামনে লিওনেল মেসি। এমন ম্যাচে অনেক দল নামার আগেই মানসিকভাবে হেরে যায়। কেপ ভার্দে তা করেনি। ভোজিনহাও করেননি। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে অতিরিক্ত সময়ে হারলেও গোলমুখে থাকা আর্জেন্টিনার আটটি প্রচেষ্টা তিনি ঠেকিয়ে দেন। মেসির ফ্রি-কিক ঠেকানোসহ কয়েকটি মুহূর্তে তিনি ম্যাচে কেপ ভার্দেকে বাঁচিয়ে রাখেন।

নেট দুনিয়ায় তাঁর বয়স নিয়ে যত আলোচনা, তার চেয়ে বড় আলোচনা হওয়া উচিত তাঁর ফুটবল-বুদ্ধি নিয়ে। চল্লিশ বছর বয়সে শরীর আগের মতো সাড়া না দিলেও চোখ যদি সতর্ক থাকে, মাথা যদি পরিষ্কার থাকে, অভিজ্ঞতা যদি সঠিক সময়ে কাজে লাগে, তাহলে একজন গোলরক্ষক এখনও ম্যাচের ভাষা বদলে দিতে পারেন। ভোজিনহা সেটাই দেখিয়েছেন। গোলমুখে তাঁর প্রতিটি প্রতিরোধে ছিল কেপ ভার্দের আত্মবিশ্বাস। তাঁর প্রতিটি নির্দেশে রক্ষণভাগ নতুন করে জেগে উঠেছে। আর তাঁর প্রতিটি ধরা বল যেন ছোট্ট দেশের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসকে একটু শান্ত করেছে।

তাঁর গল্পের আরেকটি দিক হলো বিনয়। স্পেন ম্যাচের পর তিনি নিজের সাফল্যকে একার বলে নেননি। তিনি বলেছেন, ম্যাচসেরা হওয়া তাঁর জন্য সম্মানের, কিন্তু সতীর্থদের ছাড়া কিছুই সম্ভব ছিল না। এ ধরনের বাক্য অনেক ফুটবলারই বলেন, কিন্তু ভোজিনহার ক্ষেত্রে কথাটি আলাদা শোনায়। কারণ তাঁর পুরো ক্যারিয়ারই একা আলো পাওয়ার গল্প নয়; বরং বহু বছরের পরিশ্রম, দেশের জার্সির প্রতি দায়বদ্ধতা আর ছোট মঞ্চ থেকে বড় মঞ্চে এসে দাঁড়ানোর গল্প।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে মেসির সঙ্গে তাঁর করমর্দন ও সংক্ষিপ্ত কথোপকথনও আলোচনায় আসে। বড় ম্যাচ শেষে পরাজিত দলের একজন গোলরক্ষক যখন প্রতিপক্ষ অধিনায়কের কাছে যান, সেখানে শুধু সৌজন্য থাকে না; থাকে পারস্পরিক সম্মান। ভোজিনহার কথায়, মেসি তাঁকে কেপ ভার্দের সাহসী লড়াইয়ের জন্য অভিনন্দন জানান এবং বলেন, তাঁর দেশের মানুষ তাঁকে নিয়ে গর্ব করতে পারে। এই মুহূর্তটি কেবল একজন তারকার সৌজন্য নয়, ছোট দেশের বড় হৃদয়ের স্বীকৃতিও।

ভোজিনহা এখন শুধু কেপ ভার্দের গোলরক্ষক নন; তিনি এক ধরনের প্রতীক। যে প্রতীক বলে, বয়স শেষ কথা নয়। ছোট দেশ মানেই ছোট স্বপ্ন নয়। বিশ্বকাপের আলো শুধু পরিচিত মুখের ওপর পড়ে না, কখনও তা গিয়ে পড়ে এমন এক মানুষের ওপরও, যিনি দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে একদিন নিজের দেশকে পৃথিবীর সামনে নতুন করে পরিচিত করে দেন। কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে, কিন্তু ভোজিনহার গল্প শেষ হয়নি। তিনি হয়তো আরেকটি বিশ্বকাপ খেলবেন না, হয়তো খেলবেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি যা রেখে গেলেন, তা সংখ্যার চেয়ে বড়। গোলমুখে কয়েকটি দৃঢ় প্রতিরোধ, কয়েক ফোঁটা অশ্রু, কয়েকটি দৃঢ় দৃষ্টি আর একটি দেশের নামকে পৃথিবীর ফুটবল-আলোচনায় তুলে ধরার এক অনন্য মুহূর্ত।

ফুটবলে গোলদাতারা সাধারণত ইতিহাসের প্রথম সারিতে জায়গা পান। কিন্তু কখনও কখনও ইতিহাসের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন একজন গোলরক্ষক। তিনি গোল করেন না, তবু গোলের সমান বড় হয়ে ওঠেন। ভোজিনহা সেই রকম এক চরিত্র। তাঁর গ্লাভসে কেপ ভার্দে শুধু বল ঠেকায়নি, ঠেকিয়েছে অবহেলার পুরোনো ধারণা। তাঁর চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতার ভেতর লুকিয়ে ছিল এক তরুণ দেশের স্বপ্ন। বিশ্বকাপ তাঁকে বিদায় দিয়েছে, কিন্তু ফুটবল তাঁকে মনে রাখবে।

তথ্যসূত্র: FIFA; Reuters; ESPN; Fox Sports


Back to top button
🌐 Read in Your Language