সম্পাদকের পাতা

নিউ ইয়র্কে টিকটক দ্বন্দ্বের ভয়ংকর পরিণতি: সুলতানা রাজিয়া দোষী সাব্যস্ত

নজরুল মিন্টো

আমেরিকার ব্যস্ততম নগরী নিউ ইয়র্ক তখন সন্ধ্যার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছিল। কুইন্সের জ্যামাইকা এলাকায় কেউ দোকান বন্ধ করছিলেন, কেউ বাড়ি ফিরছিলেন, কেউ হয়তো ফোনের পর্দায় চোখ রেখে দিনের শেষ খবর দেখছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ২৭ মার্চের সেই সন্ধ্যায় ১৮১ স্ট্রিট ও হিলসাইড অ্যাভিনিউর কাছে যে ঘটনা শুরু হয়েছিল, তা আর সাধারণ কোনো রাস্তার ঘটনা হয়ে থাকেনি। খাবার কিনে বাড়ি ফেরা মোবারক দেওয়ানকে কেন্দ্র করে সেই রাতের ঘটনা পরে পৌঁছে যায় ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে। আর সেই মামলার রায়ে সামনে আসে সুলতানা রাজিয়ার নাম, টিকটকের দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং কুইন্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিকে অস্বস্তিতে ফেলে দেওয়া এক ভয়ংকর অধ্যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দায় যে ঝগড়া শুরু হয়েছিল কথার আঘাতে, সেটি একসময় বাস্তব জীবনের অপহরণ, নির্যাতন, অপমান এবং প্রতিশোধের মামলায় রূপ নেয় বলে ফেডারেল প্রসিকিউটররা আদালতে তুলে ধরেন। অনলাইনে একজন আরেকজনকে অপমান করা, লাইভে পাল্টা কথা বলা, অনুসারীদের সামনে নিজেদের ক্ষোভ দেখানো, এগুলো এখন অনেকের কাছে দৈনন্দিন দৃশ্য। কিন্তু এই মামলাটি দেখিয়ে দিল, ভার্চুয়াল দুনিয়ার বিষাক্ত ভাষা কখনও কখনও বাস্তব জীবনের দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে। তখন ফোনের পর্দা আর পর্দা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে অপমানের মঞ্চ এবং অপরাধের ছায়া।

ঘটনার কেন্দ্রে মোবারক দেওয়ান। তিনি কুইন্সের বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন সদস্য। তাঁর সঙ্গে সুলতানা রাজিয়া নামে এক নারীর দীর্ঘদিনের টিকটক বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধ ছিল ব্যক্তিগত, তীব্র এবং প্রকাশ্য। প্রসিকিউটরদের বক্তব্য অনুযায়ী, মোবারক রাজিয়া ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ৩০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। রাজিয়া পাল্টা তাঁকে মিথ্যাবাদী ও প্রতারক বলে আখ্যা দেন। কথার লড়াই একসময় লাইভ ভিডিও, মন্তব্য, পাল্টা মন্তব্য ও সামাজিক অপমানের ধারায় ছড়িয়ে পড়ে।

নিউ ইয়র্কের ফেডারেল প্রসিকিউটরদের ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ব্রুকলিন ফেডারেল কোর্টে একটি সংশোধিত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সেখানে সৈয়দ রুবেল আহমেদ, শাহেদ আলম, আবু চৌধুরী, আনজু খান ও সুলতানা রাজিয়ার বিরুদ্ধে এক ভুক্তভোগীকে অপহরণ এবং অপহরণের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। আদালতের নথিতে ওই ভুক্তভোগীকে John Doe-1 নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

New York Daily News এর প্রতিবেদনে এই John Doe-1 ভুক্তভোগীকেই মোবারক দেওয়ান হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ তিনি খাবার কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। কুইন্সের জ্যামাইকার ১৮১ স্ট্রিট ও হিলসাইড অ্যাভিনিউর কাছে আবু চৌধুরী তাঁকে জোর করে একটি হোন্ডা এসইউভিতে তুলে নেন বলে অভিযোগ করা হয়। এরপর শুরু হয় প্রায় ১৩ ঘণ্টার এক অন্ধকার যাত্রা। তাঁকে কুইন্সের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, মারধর করা হয়, বিবস্ত্র অবস্থায় রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয় এবং এক পর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারান। পরদিন হাসপাতালে তাঁর জ্ঞান ফেরে।

এই মামলার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক হলো, প্রসিকিউটরদের বক্তব্য অনুযায়ী ঘটনাটি শুধু অপহরণে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল অপমানকে প্রকাশ্যে প্রদর্শনের প্রবণতা। আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ যুক্তি দেয়, দেওয়ানকে শারীরিকভাবে আঘাত করা যেমন উদ্দেশ্য ছিল, তেমনি তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করা এবং সেই অপমান অন্যদের দেখানোও ছিল পরিকল্পনার অংশ। আদালতে বলা হয়, সুলতানা রাজিয়া টিকটকে ভুক্তভোগীর অপমানজনক ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওটির ক্যাপশনে তিনি Mental Health Awareness Month লিখেছিলেন এবং সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন বিদ্রূপাত্মক ইমোজি।

একসময় সমাজে অপমান ছিল মুখে মুখে, পাড়ায় পাড়ায়, আড্ডায় আড্ডায়। এখন অপমানেরও দর্শক আছে, লাইভ আছে, কমেন্ট আছে, শেয়ার আছে, অনুসারী আছে। মানুষের ক্ষোভ এখন শুধু নিজের ভেতরে থাকে না; তা মুহূর্তে হাজার মানুষের সামনে মঞ্চ পেয়ে যায়। এই মামলায় ‘বাবা কিং’ নামে পরিচিত এক টিকটক ইনফ্লুয়েন্সারও সাক্ষ্য দেন। তাঁর অনুসারী সংখ্যা ছিল এক লাখের বেশি। তিনি আদালতে বলেন, রাজিয়া ও দেওয়ানের লাইভস্ট্রিমে নিয়মিত তর্ক, গালাগাল এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা ঘটত।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, অপহরণের তিন দিন পর এক ফোনালাপে রাজিয়া গর্ব করে বলেছিলেন, “আমরা তাকে পিটিয়েছি এবং আমরা আমাদের প্রতিশোধ নিয়েছি।” প্রসিকিউটরের যুক্তি ছিল, ভুক্তভোগীকে অপহরণ, মারধর ও অপমান করাই যথেষ্ট ছিল না; রাজিয়া নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন, বাইরের পৃথিবীও যেন সেটি দেখে।

অন্যদিকে রাজিয়ার আইনজীবী সারা স্যাকস আদালতে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেওয়ান বহু বছর ধরে অনলাইনে রাজিয়াকে হয়রানি করছিলেন, তাঁকে অপমান করছিলেন, তাঁর বাড়ির ছবি ছড়িয়েছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ চুরির অভিযোগ তুলেছিলেন। আসামিপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, দেওয়ানকে ধরে নেওয়ার সময় রাজিয়া বিষয়টি জানতেন না। তাঁদের যুক্তি ছিল, ভিডিও পোস্ট করা ভুল হতে পারে, কিন্তু সেটি অপহরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার প্রমাণ নয়।

কিন্তু জুরি শেষ পর্যন্ত প্রসিকিউশনের বক্তব্য গ্রহণ করে। ২০২৬ সালের ২৬ জুন সুলতানা রাজিয়া ও সৈয়দ রুবেল আহমেদের বিচার শেষ হয়। প্রায় দিনব্যাপী পর্যালোচনা শেষে জুরি তাঁদের অপহরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। রায়ের পর প্রসিকিউটররা ব্রুকলিন ফেডারেল কোর্টের বিচারক নিনা মরিসনের কাছে তাঁদের জামিন ছাড়া কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন। তবে বিচারক সেই সিদ্ধান্ত ২০২৬ সালের ২৩ জুলাইয়ের শুনানি পর্যন্ত স্থগিত রাখেন। ফলে রাজিয়া ৫০ হাজার ডলার এবং আহমেদ ১ লাখ ডলারের বন্ডে আপাতত মুক্ত রয়েছেন।

এই মামলার বিস্তার এখানেই শেষ নয়। সরকারি নথিতে ২০২৩ সালের মে মাসে উডসাইডে আরেক ব্যক্তিকে ঘিরে আলাদা অপহরণের অভিযোগও উঠে আসে। ওই ঘটনায় আবু চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী ইফফাত লুবনার বিরুদ্ধে এক ব্যক্তিকে অপহরণ, আটকে রাখা, মারধর, ভয় দেখানো এবং তাঁর পরিবারের কাছে ২০ হাজার ডলার দাবি করার অভিযোগ আনা হয়। এই দ্বিতীয় ঘটনাতেও বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচয়, ভয় দেখানো এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সামনে আসে।

ফেডারেল প্রসিকিউটরদের ভাষায়, অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে একই বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচয়কে অপরাধ সংঘটনের সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এটি খুব গুরুতর কথা। কারণ প্রবাসে কমিউনিটি শুধু ভাষা, খাবার, উৎসব বা পরিচয়ের জায়গা নয়; এটি আস্থার জায়গা। নতুন দেশে কেউ অসুস্থ হলে, কেউ বিপদে পড়লে, কেউ চাকরি হারালে, কেউ ভাষা না জানলে, প্রথমে নিজের কমিউনিটির কাছেই ফিরে আসে। সেই আস্থার ভিত যদি ভয়, প্রভাব, প্রতিশোধ ও সহিংসতায় দাগ পড়ে, তাহলে ক্ষতি শুধু ভুক্তভোগীর নয়; ক্ষতি পুরো সমাজের।

এই মামলার গভীরে তাই একটি সতর্কবার্তা আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিটি শব্দ শুধু শব্দ নয়। প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি ভিডিও, প্রতিটি লাইভ, প্রতিটি মন্তব্য একদিন আদালতের প্রমাণেও পরিণত হতে পারে। হাসির ইমোজি, বিদ্রূপের ক্যাপশন, উত্তেজিত দর্শক, অনুসারীর হাততালি, সবকিছু মিলেই কখনও কখনও মানুষের বিবেককে অবশ করে দেয়।

টিকটকের পর্দা কয়েক সেকেন্ডে বদলে যায়। কিন্তু একটি অপরাধের দাগ বহু বছর থাকে। একটি ভিডিও মুছে ফেলা যায়, কিন্তু আদালতের নথি সহজে মুছে যায় না। এক রাতের প্রতিশোধ শেষ পর্যন্ত কারও স্বাধীনতা, কারও সম্মান, কারও পরিবার, কারও কমিউনিটির মুখচ্ছবি বদলে দিতে পারে। কুইন্সের এই মামলাটি তাই শুধু সুলতানা রাজিয়া, মোবারক দেওয়ান, আবু চৌধুরী বা ইফফাত লুবনার গল্প নয়। এটি আমাদের সময়ের গল্প। এমন এক সময়ের গল্প, যেখানে মানুষ নিজের ক্ষোভকে ক্যামেরার সামনে সাজিয়ে তোলে, অপমানকে বিনোদন বানায়, আর প্রতিশোধকে সাহস বলে ভুল করে। লাইভ তখন আর লাইভ থাকে না। থাকে শুধু আদালত, প্রমাণ, জুরি এবং রায়।

তথ্যসূত্র:
New York Daily News (৫ জুলাই ২০২৬)
U.S. Attorney’s Office, Eastern District of New York


Back to top button
🌐 Read in Your Language