সম্পাদকের পাতা

স্বাধীনতার ২৫০ বছর: আমেরিকা নামের অসমাপ্ত গল্প

নজরুল মিন্টো

২০২৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র তার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্ণ করছে। ১৭৭৬ সালের এই দিনে ফিলাডেলফিয়ায় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১৩টি ব্রিটিশ উপনিবেশ রাজনৈতিকভাবে গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেদের স্বাধীন জাতি হিসেবে ঘোষণা করে। ইতিহাসের মজার তথ্য হলো, স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত কংগ্রেসে গৃহীত হয়েছিল ২ জুলাই, কিন্তু ঘোষণাপত্রের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন হয় ৪ জুলাই। আর যে বিখ্যাত হাতে লেখা পার্চমেন্ট কপিতে ৫৬ জন প্রতিনিধি স্বাক্ষর করেন, তাতে স্বাক্ষর শুরু হয় ২ আগস্ট ১৭৭৬ থেকে। অর্থাৎ আমেরিকার জাতীয় দিবসের গল্পেও আছে ইতিহাসের সূক্ষ্ম বাঁক, বিতর্ক, সাহস আর সময়ের নাটকীয়তা।

যুক্তরাষ্ট্র ৫০টি অঙ্গরাজ্যের দেশ, কিন্তু শুধু প্রশাসনিক মানচিত্র দিয়ে এর পরিচয় শেষ হয় না। আমেরিকার সৌন্দর্য এখানেই যে, এটিকে এক বাক্যে ধরা যায় না। এটি একই সঙ্গে প্রকৃতি, নগরসভ্যতা, জ্ঞান, শিল্প, প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও সম্ভাবনার এক বিস্ময়কর ভূগোল।

সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩৪ কোটি ১৭ লাখ ৮৪ হাজার। এই বিশাল জনসংখ্যার ভেতরে আছে নানা জাতি, বর্ণ, ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও অভিবাসী ইতিহাসের অসংখ্য স্রোত। এক কথায়, আমেরিকার ঘরগুলোর ভেতরে শুধু ইংরেজি নয়, স্প্যানিশ, চীনা, আরবি, বাংলা, হিন্দি, ফরাসিসহ পৃথিবীর অসংখ্য ভাষার শব্দ ভেসে বেড়ায়।

এই বহুভাষিকতা আমেরিকার প্রাণশক্তি। নিউইয়র্কের সাবওয়েতে দাঁড়ালে এক কামরায় পৃথিবীর মানচিত্র দেখা যায়। একজন হয়তো মেক্সিকো থেকে এসেছে, আরেকজন ইয়েমেন থেকে, কেউ পোল্যান্ড থেকে, কেউ বাংলাদেশ থেকে। কেউ ডাক্তার, কেউ ক্যাবচালক, কেউ ছাত্র, কেউ রেস্টুরেন্ট মালিক, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তাদের মুখে আলাদা ভাষা, পেছনে আলাদা জীবনকথা, কিন্তু দিনের শেষে তারা একই আমেরিকান বাস্তবতার ভেতর দিয়ে হাঁটে।

একসময় আমেরিকার কোনো শহরে হঠাৎ একজন বাঙালির দেখা পাওয়া ছিল বড় আনন্দের ঘটনা। সময় বদলেছে। আজ নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিন ও ব্রঙ্কস, নিউ জার্সির প্যাটারসন, মিশিগানের হ্যামট্র্যামিক থেকে শুরু করে জর্জিয়া, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, ভার্জিনিয়া ও কানেকটিকাটসহ নানা অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশিরা এখন আমেরিকার দৃশ্যমান জনগোষ্ঠী। বাংলা সাইনবোর্ড, গ্রোসারি, মসজিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাংলা স্কুল ও কমিউনিটি মেলা মিলিয়ে এসব এলাকা হয়ে উঠেছে একেকটি মিনি বাংলাদেশ। এখন ট্রেনে, বাসে, বিমানবন্দরে কিংবা বিমানের ভেতরেও দু-চারজন স্বজাতি সহযাত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়া আর বিরল ঘটনা নয়।

বাংলাদেশি-আমেরিকানদের পথচলা এখন আর শুধু শ্রম, দোকান, রেস্টুরেন্ট বা ট্যাক্সির গল্পে সীমাবদ্ধ নেই। তারা রাজনীতির দরজায় কড়া নাড়ছেন, অনেকেই ইতিমধ্যে ভেতরে প্রবেশ করেছেন। নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য শাহানা হানিফ বাংলাদেশি অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান; তিনি নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি নারী। জর্জিয়ায় বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হয়ে আসা শেখ রহমান স্টেট সিনেটে জায়গা করে নিয়েছেন; তিনি জর্জিয়া স্টেট সিনেটের প্রথম অভিবাসী ও প্রথম এশিয়ান-আমেরিকান সদস্য, একই সঙ্গে জর্জিয়া আইনসভার প্রথম মুসলিম আইনপ্রণেতা। জর্জিয়াতেই নাবিলা ইসলাম পার্কস, বাংলাদেশি শ্রমজীবী অভিবাসী পরিবারের মেয়ে, ২০২২ সালে স্টেট সিনেটে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস তৈরি করেন। ভার্জিনিয়ার স্টেট সিনেটর সাদ্দাম আজলান সেলিম বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি-আমেরিকান। কানেকটিকাটের এমডি রহমানও বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় এসে স্টেট সিনেটে নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছেছেন।

বাংলাদেশি কীর্তির গল্পও আমেরিকার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। ড. ফজলুর রহমান খান আধুনিক সুউচ্চ ভবন নির্মাণের ধারণা বদলে দিয়েছিলেন; শিকাগোর জন হ্যানকক সেন্টার ও সিয়ার্স টাওয়ার, বর্তমান উইলিস টাওয়ার, তাঁর প্রকৌশল মেধার উজ্জ্বল সাক্ষ্য। শিক্ষাক্ষেত্রে সালমান খান, Khan Academy-র প্রতিষ্ঠাতা, বিনামূল্যে অনলাইন শিক্ষাকে বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিয়েছেন। বিজ্ঞানেও আছে বাংলাদেশি-আমেরিকান দীপ্তি। ড. মাহমুদা সুলতানা NASA-র একজন বিজ্ঞানী। যে দেশ থেকে একদিন মানুষ স্বপ্ন নিয়ে প্লেনে উঠেছিল, সেই দেশের সন্তান আজ মহাকাশযন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজ করছেন।

আমেরিকার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার সম্পদ নয়, তার ডলার নয়, তার সিলিকন ভ্যালি নয়। তার বড় শক্তি হলো মানুষকে নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেওয়ার ক্ষমতা। স্ট্যাচু অব লিবার্টি এই প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক। নিউইয়র্ক বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভাস্কর্য শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি লাখো অভিবাসীর চোখে প্রথম দেখা আশার আলো।

আমেরিকা এমন এক দেশ যেখানে মসজিদের আজান, চার্চের ঘণ্টা, সিনাগগের প্রার্থনা, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, গুরুদুয়ারার লঙ্গর, বৌদ্ধ মঠের ধ্যান আর ধর্মহীন মানুষের মানবিক বিশ্বাস পাশাপাশি জায়গা করে নেয়। এটি এমন এক দেশ যেখানে ঘরে বাংলা, স্কুলে আমেরিকান ইতিহাস, বিকেলে বাস্কেটবল; এই দুই সংস্কৃতির আলো-হাওয়াতেই বড় হয়ে ওঠে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একটি শিশু।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা শুধু একটি দেশের মানচিত্র নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, ভোটের অধিকার, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের সাহস এবং ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন বর্ণের মানুষের সঙ্গে একই সমাজে মর্যাদার ভিত্তিতে বসবাস করার ক্ষমতা। এই দেশ নিখুঁত নয়। তার ভুল আছে, বিভাজন আছে, বিতর্ক আছে; তবু সম্ভাবনা, উদ্ভাবন, অভিবাসন, স্বপ্ন আর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তার গল্প প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে। আমেরিকার আসল সৌন্দর্য এখানেই যে, এখানে মানুষের আশার আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যায়। স্বাধীনতার ২৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র সেই আলো নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে।

তথ্যসূত্র: National Archives; U.S. Department of State, Office of the Historian; America250


Back to top button
🌐 Read in Your Language