সম্পাদকের পাতা

তৃতীয় হয়েও কীভাবে বিশ্বকাপে টিকে থাকা যায়

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ রাতগুলো সবসময়ই আলাদা। একই তারিখে একাধিক শহরে খেলা চলছে। কোথাও গ্যালারি উল্লাসে ফেটে পড়ছে, কোথাও কোচ সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে আঙুলে হিসাব কষছেন, কোথাও খেলোয়াড়েরা শেষ বাঁশির পরও স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে। ম্যাচ শেষ হয়েছে, কিন্তু নিয়তির স্কোরবোর্ড তখনও অসম্পূর্ণ। কারণ বিশ্বকাপে কখনও কখনও একটি গোল শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, অন্য কোনো দলের আশা আর হিসাবও পাল্টে দেয়।

২০২৬ বিশ্বকাপে সেই নাটক আরও বড় হতে যাচ্ছে। এবার শুধু জয়-পরাজয়ের সরল গল্প নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক অঙ্ক। ৩২ দলের পুরোনো কাঠামো বদলে বিশ্বকাপ এখন ৪৮ দলের আসর। দল বেড়েছে, ম্যাচ বেড়েছে, সুযোগও বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এবার গ্রুপে তৃতীয় হয়েও বিশ্বকাপে টিকে থাকার দরজা খোলা থাকছে। সেই দরজার দিকেই এখন ফুটবলপ্রেমীদের অনুসন্ধানী চোখ; পয়েন্ট, গোল ব্যবধান আর সম্ভাবনার খাতায় শুরু হয়ে গেছে নতুন হিসাব-নিকাশ।

১৯৯৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৩২ দলের বিশ্বকাপে গ্রুপের তৃতীয় স্থান মানে ছিল বিদায়। জিতলে আলো, হারলে অন্ধকার। কখনও ড্র করলেও বুক কাঁপত, কারণ শেষ টেবিলে তৃতীয় হয়ে পড়ে থাকা মানে প্রায় নিশ্চিত ঘরে ফেরা। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই পুরোনো হিসাব বদলে দিয়েছে। এবার তৃতীয় হওয়া মানেই শেষ নয়। কখনও কখনও তৃতীয় স্থানও হতে পারে নতুন জীবনের টিকিট।

সাধারণ দর্শক তাই প্রশ্ন করতেই পারেন, তৃতীয় হয়েও আবার দল নকআউটে যায় কীভাবে? অঙ্কটি আসলে খুব কঠিন নয়। শুধু গল্পের মতো করে ভাবলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপে ৪৮ দল ভাগ হয়েছে ১২টি গ্রুপে। প্রতি গ্রুপে ৪টি দল। প্রতিটি দল গ্রুপে তিনটি করে ম্যাচ খেলবে। সব মিলিয়ে এবার বিশ্বকাপে হবে ১০৪টি ম্যাচ। প্রতিটি গ্রুপের প্রথম দুই দল সরাসরি যাবে রাউন্ড অব ৩২-এ। অর্থাৎ ১২ গ্রুপ থেকে ২৪ দল নিশ্চিত। এরপর শুরু হবে নতুন নাটক। ১২টি গ্রুপের তৃতীয় হওয়া ১২ দলের মধ্যে সেরা আট দলও যাবে নকআউটে। বাকি চার তৃতীয় দলকে ফিরতে হবে ঘরে। এখানেই বিশ্বকাপের নতুন অঙ্ক।

ধরা যাক, একটি দল প্রথম ম্যাচে হেরে গেল। ৩২ দলের বিশ্বকাপে এমন হার মানেই দলের ওপর কালো মেঘ নেমে আসত। দ্বিতীয় ম্যাচে ড্র করলে তো আরও চাপ। কিন্তু এবার সেই দল যদি শেষ ম্যাচে জিতে যায়, তার পয়েন্ট দাঁড়াতে পারে ৪। গ্রুপে সে হয়তো তৃতীয় হলো, কিন্তু গল্প শেষ হলো না। তখন তাকে তুলনা করা হবে অন্য ১১ গ্রুপের তৃতীয় দলগুলোর সঙ্গে। যদি তার পয়েন্ট, গোল ব্যবধান ও গোলসংখ্যা অন্যদের চেয়ে ভালো হয়, তাহলে সে নকআউটে উঠে যেতে পারে।

আরেকভাবে বলা যায়, গ্রুপের ভেতর একটি টেবিল আছে, যা আমরা টিভির পর্দায় দেখি। কিন্তু তার বাইরে আরেকটি অদৃশ্য টেবিল আছে। সেখানে বসানো হয় সব গ্রুপের তৃতীয় দলগুলোকে। বিশ্বকাপের নতুন উত্তেজনা অনেকটাই ওই অদৃশ্য টেবিলকে ঘিরে।

এই অদৃশ্য টেবিলে প্রথম হিসাব পয়েন্ট। এরপর গোল ব্যবধান। তারপর কে বেশি গোল করেছে। তাতেও যদি সমতা থাকে, তখন শৃঙ্খলার হিসাব আসে। ফিফার ভাষায় এটি টিম কন্ডাক্ট স্কোর। হলুদ কার্ড, লাল কার্ড, এমনকি টিম অফিসিয়ালদের আচরণও তখন হিসাবের অংশ হতে পারে। তবু যদি সমতা না ভাঙে, তখন সর্বশেষ ফিফা রেঙ্কিং বিবেচনায় আসবে। অর্থাৎ একটি অপ্রয়োজনীয় ফাউল, একটি হলুদ কার্ড, একটি শেষ মুহূর্তের গোল খাওয়া, সবকিছুই ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

এই ফরম্যাট অনেক দলের জন্য আশার দরজা খুলে দিয়েছে। আগে বড় দলের বিপক্ষে এক ম্যাচে বড় ব্যবধানে হেরে গেলে অনেক সময় বিশ্বকাপের স্বপ্ন সেখানেই ভেঙে যেত। এবারও বড় হার বিপজ্জনক, কিন্তু তবু ফিরে আসার পথ আছে। দ্বিতীয় ম্যাচে লড়াই, তৃতীয় ম্যাচে জয়, আর গোল ব্যবধান সামলে রাখা, এসব মিলিয়ে একটি দল তৃতীয় হয়েও টিকে থাকতে পারে।

এই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ দিনগুলো আরও নাটকীয় হবে। কোনো দল নিজের ম্যাচ শেষ করেও নিশ্চিন্তে হোটেলে ফিরতে পারবে না। তাদের অপেক্ষা করতে হবে অন্য শহরের অন্য ম্যাচের ফলের জন্য। কানাডার কোনো স্টেডিয়ামে ম্যাচ শেষ, কিন্তু ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে মেক্সিকোর কোনো মাঠে। যুক্তরাষ্ট্রের এক শহরে শেষ বাঁশি বেজেছে, অথচ একটি দেশের কোটি মানুষ তাকিয়ে আছে অন্য গ্রুপের স্কোরলাইনের দিকে।

ফুটবল তখন শুধু মাঠের খেলা থাকে না। হয়ে ওঠে পয়েন্টের হিসাব, গোল ব্যবধানের উদ্বেগ, আর অপেক্ষার দীর্ঘ গল্প।

একটি দল তিন ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আরেক দল ৩ পয়েন্ট নিয়েও গোল ব্যবধানের ভরসায় অপেক্ষা করছে। তখন সমর্থকের চোখ শুধু নিজের দলের স্কোরবোর্ডে থাকে না; ছুটে যায় অন্য গ্রুপের ম্যাচেও। যে দলকে কখনও সমর্থন করেনি, সেই দলের একটি গোলেও তখন আনন্দ জাগতে পারে। কারণ সেই গোলই হয়তো অন্য কোনো তৃতীয় দলকে নিচে নামিয়ে নিজের দলের জন্য খুলে দিতে পারে নকআউটের দরজা। এটাই ৪৮ দলের বিশ্বকাপের নতুন মনস্তত্ত্ব।

এই নতুন নিয়মে গ্রুপের শেষ ম্যাচগুলো আরও বেশি খোলা থাকবে। আগে যেখানে দুই ম্যাচ শেষে অনেক দলের বিদায় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যেত, এবার তারা বলতেই পারে, “শেষ ম্যাচটা জিতলে এখনও সম্ভব।” এতে খেলা শেষ পর্যন্ত খোলা থাকবে। দর্শকও শেষ বাঁশি পর্যন্ত টিভির সামনে আটকে থাকবে।

তবে নতুন অঙ্কের সঙ্গে নতুন বিভ্রান্তিও আছে। শুধু নিজের গ্রুপে তৃতীয় হলেই হবে না; তাকিয়ে থাকতে হবে পয়েন্ট, গোল ব্যবধান, গোলসংখ্যা এবং অন্য গ্রুপের ফলের দিকেও। ফলে শেষ বাঁশি বাজার পরও অনেক দলের অপেক্ষা শেষ হবে না।

তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু শক্তির লড়াই নয়, হিসাবেরও লড়াই। এখানে গোল করার মতোই গুরুত্বপূর্ণ গোল না খাওয়া, ম্যাচ জেতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ শৃঙ্খলা ধরে রাখা। কারণ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার অঙ্কে ছোট ভুলও বড় হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বকাপের নতুন হিসাব তাই বলে দিচ্ছে, ফুটবলে পরাজয় সবসময় শেষ কথা নয়, কখনও কখনও তৃতীয় হয়েও টিকে থাকার পথ থাকে।

তথ্যসূত্র:
FIFA World Cup 26 Regulations


Back to top button
🌐 Read in Your Language