
টরন্টোর পূর্বদিকে ডারহাম রিজিয়নের একটি শান্ত জনপদ বোম্যানভিল। এটি ক্ল্যারিংটন মিউনিসিপ্যালিটির অংশ। শহুরে সুবিধা, খোলা আকাশ, সবুজ প্রান্তর ও গ্রামীণ প্রশান্তির মিশেলে বোম্যানভিল বহু পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে নতুন জীবন শুরুর আশ্রয়। ভবিষ্যতে GO ট্রেনের সম্প্রসারণ এই অঞ্চলের যোগাযোগ সুবিধাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।
এমন একটি এলাকাতেই নতুন জীবনযাপনের স্বপ্ন নিয়ে স্কারবরো থেকে বোম্যানভিলে বাড়ি কিনেছিলেন টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখ ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতা মহসিন ভূঁইয়া। ২০২১ সালে তিনি স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনে ফেডারেল কনজারভেটিভ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু যে বাড়ির উঠোনে তিনি পুকুর, হাঁস, কবুতর আর খোলা আকাশের মধ্যে নতুন জীবনের ছবি দেখতে চেয়েছিলেন, সেই বাড়িই এখন ভয়, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক টরন্টো স্টার ৫ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মহসিন ভূঁইয়া ও তাঁর পরিবারের এই সংকটের কথা তুলে ধরেছে। আলাইশা হাশামের লেখা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোম্যানভিলে বসবাসরত ভূঁইয়া পরিবারের বিরুদ্ধে অবৈধ জবাইখানা পরিচালনার মিথ্যা অভিযোগ ওঠার পর থেকে তাঁরা হুমকি, হয়রানি ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের মুখোমুখি হচ্ছেন।
মহসিন ভূঁইয়া গত সামারে স্ত্রী ও তিন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে নিয়ে স্কারবরো থেকে বোম্যানভিলে চলে আসেন। বাড়ির পেছনের পুকুরে তাঁরা হাঁস পালন শুরু করেন। ভবিষ্যতে নিয়ম মেনে হাঁসের মাংস বিক্রির ব্যবসা করার চিন্তাও তাঁদের ছিল। সেই ভাবনা থেকেই কয়েক শ হাঁস এবং কিছু কবুতর পালন শুরু হয়।
ভূঁইয়ার খামারে এখন বিভিন্ন জাতের প্রায় ৫০০ হাঁস রয়েছে। পাশাপাশি আছে কিছু মুরগি, কবুতর ও খরগোশ। এটি কোনো বড় বাণিজ্যিক খামার নয়, বরং অস্থায়ী কাঠামোতে গড়ে ওঠা একটি শখের খামার।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ আগে এক বন্ধু তাঁকে ফেসবুকের একটি পেজের লিঙ্ক পাঠান। সেখানে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, মহসিন ভূঁইয়া অবৈধ জবাইখানা চালিয়ে হালাল মাংস বিক্রি করছেন। অভিযোগটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় হুমকি, বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য, নজরদারি, ছবি তোলা, এমনকি ড্রোন দিয়ে তাঁদের বাড়ির ওপর দিয়ে ভিডিও করার মতো ঘটনা।
ভূঁইয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, অচেনা লোকজন তাঁদের সম্পত্তির ছবি তুলেছে। কেউ কেউ বাড়ির সামনে এসে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট করেছে। ৪ জুলাই শুক্রবার তাঁদের বাড়ির সামনে বিক্ষোভের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আগের রাতেই তা বাতিল করা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে সোমবার বিকেলে। মহসিন ভূঁইয়ার স্ত্রী তখন বাড়িতে একা ছিলেন। ভূঁইয়ার দাবি, তিনজন ব্যক্তি ক্যামেরা হাতে তাঁদের বাড়ির পেছনের উঠানে ঢুকে পড়ে। তাঁর ধারণা, তারা ভেবেছিল বাড়িতে কেউ নেই। তাঁর স্ত্রী পুলিশে ফোন করেন এবং নিজের ফোনের ক্যামেরা দিয়ে তাদের ভিডিও ধারণ করতে থাকেন, যতক্ষণ না তারা গাড়ি নিয়ে চলে যায়।
“আমরা আতঙ্কিত,” টরন্টো স্টারকে বলেন মহসিন ভূঁইয়া। “আমাদের মনে হচ্ছে, এক ধরনের সন্ত্রস্ত অবস্থার মধ্যে রাখা হয়েছে।”
একটি বাড়ি মানুষের কাছে শুধু বসবাসের জায়গা নয়। বাড়ি মানে আশ্রয়, নিরাপত্তা, পরিবারের হাসি, দিনের শেষে ফিরে আসার স্বস্তি। সেই বাড়িই যখন সন্দেহ, নজরদারি, হুমকি ও অপমানের জায়গা হয়ে ওঠে, তখন মানুষের ভেতরের শান্তি ভেঙে যায়। মহসিন ভূঁইয়ার কথায় সেই ভাঙনের বেদনা স্পষ্ট।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ক্ল্যারিংটন মিউনিসিপ্যালিটি ৩০ জুন এক বিবৃতিতে জানায়, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা হলেও সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে কোনো অবৈধ জবাইখানার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। CityNews-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ল্যারিংটন বাই-ল এনফোর্সমেন্ট, অন্টারিওর কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং ডারহাম রিজিয়ন পাবলিক হেলথ সম্পত্তিটি পরিদর্শন করেছে। তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি।
প্রদেশের অ্যাগ্রি ফুড প্রটেকশন ব্রাঞ্চ ১১ জুন ভূঁইয়ার খামার পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে দেখা যায়, তাঁর খামারের জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য, তিনি তা মেনে চলছেন। ভূঁইয়া বলেছেন, তিনি হাঁসের মাংস বিক্রি করেন না। নিয়ম অনুযায়ী তিনি শুধু নিজের পরিবারের খাওয়ার জন্য জবাই করতে পারেন।
তবু অভিযোগ থামেনি। বরং অনলাইন গুজব বাস্তব জীবনের হুমকিতে রূপ নিয়েছে। এখানেই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বিপদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অপ্রমাণিত অভিযোগ, অভিবাসীবিরোধী মনোভাব, মুসলিমবিদ্বেষ এবং স্থানীয় উত্তেজনার বিপজ্জনক মিশ্রণের একটি উদাহরণ।
টরন্টো স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রচারণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন জন মাটন, যিনি ২০০০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ল্যারিংটনের মেয়র ছিলেন। বর্তমানে তিনি মিউনিসিপ্যাল প্ল্যানিং কনসালট্যান্ট। গ্রিনবেল্ট কেলেঙ্কারিতে তাঁকে “মিস্টার এক্স” নামে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং অনৈতিক লবিংয়ের অভিযোগ উঠেছিল।
ফেসবুকে মাটনের পোস্টগুলোতে শত শত লাইক ও মন্তব্য জমেছে। তিনি দাবি করেছেন, ক্ল্যারিংটনসহ অন্টারিওজুড়ে হালাল মাংস বিক্রির জন্য অবৈধ জবাইখানার মহামারি চলছে। তিনি সন্দেহভাজন স্থানের ছবি ও ঠিকানা ফেসবুকে পোস্ট করেছেন, যার মধ্যে ভূঁইয়ার বাড়িও রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মানুষকে আরও তথ্য তাঁকে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে উৎসাহ দিয়েছেন। ক্ল্যারিংটনের মেয়র অ্যাড্রিয়ান ফস্টার ও পৌর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও তিনি ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
২৩ জুন পোস্ট করা এক ভিডিওতে মাটন বলেন, যারা অবৈধভাবে প্রাণী জবাই করছে, তাদের শহর থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে। ১৮ জুন তিনি ব্রিটিশ উগ্র ডানপন্থী কর্মী টমি রবিনসনের কাছে অভিবাসীদের আগমন এবং কমিউনিটির পরিবর্তন মোকাবিলার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন বলে পোস্ট করেন। টরন্টো স্টারের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইনস্টাগ্রামে তিনি গত মাসে বেলফাস্টে অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থনও শেয়ার করেছেন, যেখানে বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
তবে মাটন একাধিক ভিডিওতে নিজেকে বর্ণবাদী বলে অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর উদ্বেগ কেবল প্রাণী নির্যাতন নিয়ে।
মাটনের পোস্টের সঙ্গে আসা মুসলিমবিরোধী ও অভিবাসীবিরোধী মন্তব্য ক্ল্যারিংটন এলাকার অনেক বাসিন্দাকে আতঙ্কিত, ক্ষুব্ধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত বোধ করতে বাধ্য করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস স্থানীয় রাজনীতিবিদদের নিয়ে বৃহস্পতিবার একটি সংবাদ সম্মেলন করে। ক্ল্যারিংটনের মেয়র অ্যাড্রিয়ান ফস্টারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল মহসিন ভূঁইয়ার ঘটনার প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং বৃহত্তর মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় তুলে ধরা।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনলাইন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বাস্তব জীবনে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। ডারহাম রিজিওনাল পুলিশ জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে পোস্ট ও মন্তব্য বাড়ার বিষয়টি তারা লক্ষ্য করছে এবং অভিযোগগুলোর তদন্ত চলছে।
ডেপুটি মেয়র গ্র্যানভিল অ্যান্ডারসন বলেছেন, জন মাটন সাবেক মেয়র হওয়ায় তাঁর বক্তব্যে অনেকের কাছে অতিরিক্ত গ্রহণযোগ্যতার ছাপ তৈরি হতে পারে, যা উদ্বেগজনক। তাঁর ভাষায়, “এটি কমিউনিটিকে আঘাত করছে। এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।”
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় একটি কমিউনিটি সমাবেশের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর বার্তা, ক্ল্যারিংটনে ঘৃণার কোনো স্থান নেই। এই বার্তা শুধু একটি শহরের নয়, আজকের কানাডারও প্রয়োজন। কোনো ধর্ম, জাতি, ভাষা বা অভিবাসী পরিচয়ের কারণে কোনো পরিবার যেন নিজের বাড়িতে নিরাপত্তাহীন বোধ না করে, সেটি একটি সভ্য সমাজের ন্যূনতম প্রত্যাশা।
মহসিন ভূঁইয়া ভয় পাচ্ছেন, কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এই ঘটনা তাঁকে তাঁর নতুন বাড়ি থেকে সরিয়ে দিতে পারবে না।
“এটি একটি অনন্য সম্পত্তি,” তিনি বলেন। “আমি এটি বিক্রি করব না।”
বোম্যানভিলের পুকুরপাড়ে হাঁসের শব্দ, খোলা আকাশ, গ্রামীণ বাড়ির উঠোন আর একটি অভিবাসী পরিবারের স্বপ্ন এখন একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। গুজব কি বিচার হয়ে উঠবে, নাকি প্রমাণ, আইন ও মানবিকতা সমাজকে পথ দেখাবে? মহসিন ভূঁইয়ার ঘটনা তাই শুধু একজন বাংলাদেশি কানাডিয়ানের সংবাদ নয়। এটি আমাদের সময়ের এক সতর্কবার্তা।
তথ্যসূত্র:
Toronto Star, ৫ জুলাই ২০২৬
CityNews Toronto, ২ জুলাই ২০২৬
Municipality of Clarington, ৩০ জুন ২০২৬









