
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলোর স্কোরলাইন সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়, কিন্তু রেফারির সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা ও মিশরের ম্যাচটি শেষ হওয়ার পরও ফুটবল বিশ্ব যেন ঠিক সেই আলোচনাতেই ডুবে গেছে। কেউ বলছেন এটি বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প, আবার কেউ বলছেন এটি এমন একটি ম্যাচ, যেখানে ফলাফলের চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছে রেফারিং।
ম্যাচে ৩-২ গোলে জয় পেয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। এক্স, ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন ফুটবল ফোরামে হাজার হাজার সমর্থক ম্যাচের কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকেন। বিশেষ করে মিশরের বাতিল হওয়া গোল, আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এবং VAR-এর কয়েকটি হস্তক্ষেপ ঘিরেই সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে মিশরের বাতিল হওয়া গোলটি নিয়ে। মাঠে গোলের সংকেত দেওয়ার পর VAR-এর পরামর্শে রেফারি সিদ্ধান্ত বদলান। ব্যাখ্যায় বলা হয়, গোল হওয়ার আগে আক্রমণের শুরুতে একটি ফাউল হয়েছিল, তাই পুরো আক্রমণটিই বাতিল করা হয়েছে। ফুটবলের আইন অনুযায়ী আক্রমণপর্বে সংঘটিত ফাউল থেকে সরাসরি গোল এলে VAR সেই গোল বাতিলের সুপারিশ করতে পারে। কিন্তু সমর্থকদের একাংশের প্রশ্ন, ঘটনাটি গোলের এত আগে ঘটেছিল যে সেটিকে ভিত্তি করে গোল বাতিল করা কতটা যৌক্তিক।
ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষণে সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক রব গ্রিন বলেন, VAR-এর এমন ব্যবহার নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। অন্যদিকে সাবেক ফিফা রেফারি বিশেষজ্ঞ ড. জো ম্যাকনিকের ব্যাখ্যা, আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি দেওয়া সম্ভব ছিল। অর্থাৎ একই ঘটনাকে ঘিরে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সমর্থক আরও অভিযোগ তুলেছেন যে আর্জেন্টিনার দুটি গোল অফসাইড ছিল এবং মিশর অন্যায্য সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছে। তবে ম্যাচ-পরবর্তী অফিসিয়াল বিশ্লেষণ কিংবা রেফারিদের প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যায় এমন অভিযোগ নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে এগুলো আপাতত সমর্থকদের অভিযোগ হিসেবেই আলোচনায় রয়েছে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, আধুনিক ফুটবলে VAR ভুল কমানোর জন্য এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার কখনও কখনও নতুন বিতর্কও তৈরি করছে। আগে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে কয়েক মিনিট আলোচনা হতো, এখন একটি VAR সিদ্ধান্ত নিয়েই দিনের পর দিন বিতর্ক চলতে থাকে।
মিশরের সমর্থকদের হতাশারও যথেষ্ট কারণ আছে। তারা বিশ্বাস করেন, ম্যাচের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হলে ফলাফলও ভিন্ন হতে পারত। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বক্তব্য, নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং ম্যাচে ফিরে আসার কৃতিত্ব পুরোপুরি দলের লড়াকু মানসিকতার।
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে আবেগ সব সময়ই তুঙ্গে থাকে। প্রিয় দল হারলে সমর্থকের ক্ষোভও স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বিতর্কিত রেফারিং শুধু একটি দলের সঙ্গে নয়, বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের প্রায় সব বড় দলের ম্যাচেই দেখা গেছে। কখনও একটি ভুল সিদ্ধান্ত একটি দলকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করেছে, আবার কখনও একটি সিদ্ধান্ত অন্য দলের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচটিও হয়তো ভবিষ্যতে সেই তালিকায় জায়গা করে নেবে। কারণ এই ম্যাচ শুধু পাঁচটি গোলের গল্প নয়, এটি ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার, রেফারির সিদ্ধান্ত এবং সমর্থকদের আস্থার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। VAR কি সত্যিই ফুটবলে শতভাগ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করছে, নাকি প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের পর নতুন করে আরেকটি বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আজই মিলবে না। তবে এটুকু নিশ্চিত, আর্জেন্টিনা ও মিশরের এই ম্যাচের আলোচনা শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়নি; বরং সেখান থেকেই শুরু হয়েছে আরেকটি দীর্ঘ বিতর্কের।
তথ্যসূত্র:
Associated Press, ৭ জুলাই ২০২৬
The Guardian, ৭ জুলাই ২০২৬
Fox Sports, ৭ জুলাই ২০২৬









