সম্পাদকের পাতা

মনোনয়ন জয়ের পর ডা. তরুনের সামনে উপনির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ

নজরুল মিন্টো

অন্টারিও প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির মনোনয়ন ভোটে ডা. এএসএম নূরুল্লাহ তরুনের বিজয় এখন শুধু স্কারবরো সাউথওয়েস্টের স্থানীয় খবর নয়। বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই স্কারবরোর ৪৬৮ ড্যানফোর্থ রোডে অনুষ্ঠিত পিসি মনোনয়ন ভোটে তাঁর বিপুল ব্যবধানের জয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে টরন্টো থেকে কানাডার বিভিন্ন প্রান্তে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন নানা শহরের বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষ। ফেসবুক টাইমলাইন, কমিউনিটি গ্রুপ ও হোয়াটসঅ্যাপ সার্কেল যেন এক রাতেই তরুনময় হয়ে ওঠে। অনেকেই এই বিজয়কে মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি কানাডিয়ানদের দৃশ্যমান অগ্রযাত্রার আরেকটি ধাপ হিসেবে দেখছেন।

এই বিজয়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডের প্রতিক্রিয়ায়। ডা. তরুনকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোর্ড এক বিবৃতিতে তাঁকে “একজন নিবেদিতপ্রাণ পারিবারিক চিকিৎসক এবং সম্মানিত কমিউনিটি নেতা” হিসেবে উল্লেখ করেন। ফোর্ডের ভাষায়, ডা. তরুন স্কারবরো সাউথওয়েস্টের জন্য শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হবেন। এই বিবৃতি শুধু আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয়; এটি পিসি পার্টির নির্বাচনী বার্তারও ইঙ্গিত। স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয়, নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির প্রশ্ন সামনে রেখে দলটি স্কারবরো সাউথওয়েস্টে প্রচারের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনটি রাজনৈতিকভাবে সহজ কোনো ময়দান নয়। ডলি বেগম দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে এনডিপির শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তিনবারের এনডিপি এমপিপি ডলি বেগম পরে ফেডারেল লিবারেল প্রার্থী হয়ে এই আসনের এমপি নির্বাচিত হন। তাঁর প্রাদেশিক আসন শূন্য হওয়াতেই এই উপনির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এনডিপি ইতিমধ্যে ভাড়াটিয়া অধিকারকর্মী ফাতিমা শাবানকে প্রার্থী করেছে। লিবারেলরা প্রার্থী করেছে আহসানুল হাফিজকে, যিনি ডমিনোজ পিজার ৩০টি আউটলেটের মালিক এবং ডলি বেগমের ফেডারেল উপনির্বাচন প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

এই জায়গাতেই আসন্ন লড়াইটি জটিল হয়ে উঠছে। আহসানুল হাফিজ ও ডা. তরুন দু’জনই বাংলাদেশি কানাডিয়ান কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে এনডিপি প্রার্থী ফাতিমা শাবান ভাড়াটিয়া অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চাইছেন। তাঁর বাবা মিশরীয় এবং মা স্লোভাকিয়ান বংশোদ্ভূত। ফলে ভোটের অঙ্ক হবে শুধু দলীয় নয়, কমিউনিটি, শ্রেণি, পেশা, অভিবাসী বাস্তবতা এবং স্থানীয় ইস্যুর মিশ্রণ। পিসি পার্টির জন্য ডা. তরুনের মনোনয়ন তাই একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। একজন চিকিৎসক এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি এমন এক ভোটভিত্তির দরজা খুলে দিয়েছেন, যেখানে পিসি পার্টির প্রবেশ সহজ ছিল না।

তবে এই বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ডা. তরুনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি হলো। মনোনয়ন জেতা এক জিনিস, উপনির্বাচন জেতা আরেক জিনিস। স্কারবরো সাউথওয়েস্টে এনডিপির শিকড় পুরোনো। লিবারেলরা এখানে নতুন শক্তি নিয়ে নামছে। বিশেষ করে আহসানুল হাফিজের প্রার্থিতা বাংলাদেশি কানাডিয়ান ভোটে নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে। আবার ডলি বেগম প্রাদেশিক উপনির্বাচনে কী ভূমিকা নেবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নিউ ডেমোক্র্যাটরা আশা করছে, তাঁদের সাবেক সহকর্মী, যিনি এখন লিবারেল এমপি, এই লড়াইয়ে নিরপেক্ষ থাকবেন। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কমিউনিটি নেটওয়ার্ক এবং পুরোনো সমর্থন অনেক সময় আনুষ্ঠানিক অবস্থানের চেয়েও বেশি কাজ করে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। বৃহস্পতিবার পিসি মনোনয়ন সভার বাইরে লিবারেলরা ডিজিটাল বিলবোর্ড ট্রাক পাঠিয়ে ডাগ ফোর্ডকে আক্রমণ করে। এক সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, “ডাগ ফোর্ড স্কারবরোকে গুরুত্ব দেন না।” আরেকটিতে ফোর্ডের ব্যক্তিগত জেট বিতর্ক তুলে ধরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাঁর সরকারের সিদ্ধান্তকে যুক্ত করা হয়। এতে বোঝা যায়, লিবারেলরা এই উপনির্বাচনকে শুধু স্থানীয় আসনের লড়াই হিসেবে দেখছে না; তারা এটিকে ফোর্ড সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। পিসি শিবিরও বিষয়টি হালকাভাবে নেয়নি। ট্রাক সরানো না হলে পুলিশ ডাকার হুমকির খবরই বলে দেয়, উপনির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

এখন বড় প্রশ্ন, ডাগ ফোর্ড কবে উপনির্বাচন ডাকবেন। আইন অনুযায়ী স্কারবরো সাউথওয়েস্ট উপনির্বাচনের রিট ৩ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে জারি করতে হবে। রিট জারির পর ৩৬ দিনের বেশি দেরি না করে কোনো এক বৃহস্পতিবার ভোটের দিন নির্ধারণ করতে হবে। এই হিসাবে যদি ফোর্ড কয়েক দিনের মধ্যেই রিট জারি করেন, তাহলে ভোট আগস্টের মাঝামাঝি হতে পারে। আর তিনি সময়সীমার শেষ দিকে, অর্থাৎ ৩ আগস্টের কাছাকাছি রিট জারি করলে সর্বশেষ সম্ভাব্য বৃহস্পতিবার হতে পারে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬। তবে প্রকাশিত রাজনৈতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভোট আগামী মাসেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অর্থাৎ আগস্টেই স্কারবরো সাউথওয়েস্টের ভোটারদের সামনে প্রাদেশিক উপনির্বাচনের ব্যালট আসতে পারে।

ডা. তরুনের বিজয় তাই সময়ের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর হাতে খুব বেশি সময় নেই। মনোনয়ন জয়ের উচ্ছ্বাস দ্রুতই তাঁকে মূল নির্বাচনী প্রচারে নিয়ে যাবে। এখন তাঁকে পিসি সমর্থক, বাংলাদেশি কানাডিয়ান ভোটার, অভিবাসী পরিবার, পেশাজীবী শ্রেণি, ছোট ব্যবসায়ী এবং সাধারণ স্থানীয় ভোটারের কাছে একই সঙ্গে পৌঁছাতে হবে। তাঁকে প্রমাণ করতে হবে, তিনি শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রার্থী নন; তিনি পুরো স্কারবরো সাউথওয়েস্টের প্রার্থী।

এনএন/ ১১ জুলাই ২০২৬

 


Back to top button
🌐 Read in Your Language