
ডিভি লটারির মাধ্যমে আনসার আহমেদ আমেরিকায় আসেন। সাল ১৯৯৬। বয়স তখন ছাব্বিশ। কাগজপত্র হাতে, বুকভরা কৌতূহল। গন্তব্য পোর্টল্যান্ড, অরিগন। সেখানে তাঁর মামা থাকতেন। আমেরিকার মানচিত্রে অরিগন কোথায়, পোর্টল্যান্ড কেমন শহর, এসব নিয়ে তাঁর তখন খুব বেশি ধারণা ছিল না। শুধু জানতেন, মামা আছেন, আশ্রয় আছে।
আনসারের আমেরিকায় আসার পথটি খুলেছিল এক অদ্ভুত ঘটনাক্রমে। তাঁর মামা ডিভি লটারির জন্য অনেক আত্মীয়স্বজনের নামে আবেদন করেছিলেন। তখন আবেদনপত্রে ছবির বাধ্যবাধকতা ছিল না। একটি ভাঙা টাইপরাইটারে বসে তিনি নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ লিখে আবেদন করেছিলেন। কারও সঠিক জন্মতারিখ জানা ছিল, কারওটা অনুমান করে দেওয়া হয়েছিল। সেই বহু নামের মধ্যে আনসারের নাম উঠে যায়। পরিবারের জন্য সেটি ছিল বিস্ময়, আনসারের জন্য ছিল জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি ঘটনা।
পোর্টল্যান্ডে তখন বাঙালি পরিবার ছিল হাতে গোনা। পরিচিত সমাজ নেই, চেনা মুখ কম, নিজের ভাষায় কথা বলার সুযোগও সীমিত। চারপাশে নতুন রাস্তা, নতুন নিয়ম, নতুন মানুষ। প্রথম দিকে আনসার ক্যালেন্ডারে দাগ দিতেন। আজ একদিন হলো, কাল দুইদিন হবে। প্রতিটি দিন যেন আলাদা করে টের পাওয়া যেত।
আশপাশের পুরোনো প্রবাসীদের জিজ্ঞেস করতেন, “আঙ্কেল, আপনি কত বছর ধরে এখানে আছেন?” কেউ বলতেন দশ বছর, কেউ পনেরো, কেউ বিশ। আনসারের অবাক লাগত। এত দীর্ঘ সময় কীভাবে কেটে যায়! তখন একজন তাঁকে বলেছিলেন, “তুমিও একদিন বুঝবে। সময় কেমন করে চলে যায়, নিজেই টের পাবে না।”
সেদিন কথাটা পুরোপুরি বুঝতে পারেননি আনসার। পরে বুঝেছেন, প্রবাসজীবনে সময়ের হিসাব আসলেই আলাদা। চাকরি, পড়াশোনা, পরিবার, দেশে থাকা আপনজনদের টান, নিজের ভবিষ্যৎ, বিল, ভাড়া, দায়িত্ব, অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে মানুষ একেকটি চাপ সামলাতে সামলাতে হঠাৎ দেখে, বহু বছর পার হয়ে গেছে।
আনসার পড়াশোনা শুরু করেন কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেমে। দুই বছরের অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি শেষ করতে তাঁর লেগে যায় প্রায় চার বছর। কারণ ফুলটাইম পড়াশোনা করার সুযোগ তাঁর ছিল না। নিজের খরচ, পরিবারের দায়িত্ব, থাকার ব্যয়, সবকিছু সামলাতে হতো তাঁকে। কখনো দুইটি ফুলটাইম চাকরি, তার ফাঁকে ক্লাস, আবার সপ্তাহান্তে পড়াশোনা। এভাবেই ধীরে ধীরে তিনি নিজের পথ তৈরি করেন।
তাঁর জীবনে একটি বাক্য খুব গভীরভাবে বসে যায়। “USA মানে শুধু United States of America নয়। USA মানে You Start Again.” এই কথাটি তাঁকে বলেছিলেন একজন অভিজ্ঞ অভিবাসী। তুমি কে ছিলে, দেশে কী করেছ, কত বড় ডিগ্রি ছিল, কী সম্মান ছিল, এখানে এসে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে। এই শিক্ষা তিনি নিজের মামার জীবন থেকেও দেখেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েও তাঁর মামাকে আমেরিকায় এসে কাজ খুঁজতে গিয়ে দোকান গোছানো, মেঝে পরিষ্কার, তাক সাজানো, নানা ছোট কাজ করতে হয়েছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নতুন দেশে এসে জীবনের আরেক বাস্তব পাঠ নিয়েছিলেন।
দশ বছর পোর্টল্যান্ডে কাটানোর পর ২০০৬ সালের শেষের দিকে এক বন্ধুর পরামর্শে আনসার চলে এলেন ভার্জিনিয়ায়। পোর্টল্যান্ডের তুলনায় এখানে সুযোগ বেশি, কাজের ক্ষেত্র বড়, সমাজও বড়। আবার শুরু হলো নতুন জীবন। নতুন শহর, নতুন কাজ, নতুন হিসাব। প্রবাসজীবনে একটি দরজা বন্ধ হলে আরেকটি দরজা খুলে যায়। কিন্তু প্রতিটি দরজা খুলতে হয় নিজের হাতে।
এদিকে আমেরিকার অন্য এক প্রান্ত থেকে আরেকটি গল্প শুরু হয়েছিল। সেটি শারমিনের গল্প।
শারমিনও ডিভি লটারিতে আমেরিকায় আসেন। তিনি বাংলাদেশে পড়াশোনা করেছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারে। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। পরিবার জানত, মেয়ে মেধাবী, সাহসী, ভালো করবে। কিন্তু তিনি একা আমেরিকায় পাড়ি দেবেন, এটা বাবা মায়ের পক্ষে সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না।
বাবার মনে ভয় ছিল। ছোট মেয়ে এত দূরের অচেনা দেশে যাবে, নিজের মতো করে থাকবে, এই চিন্তা তাঁকে অস্থির করেছিল। মায়ের মনেও ছিল উদ্বেগ। কিন্তু শারমিনের মনের জোর ছিল অনেক। ভাইবোনেরা পাশে দাঁড়ালেন। তাঁরা বাবা মাকে বোঝালেন, সুযোগটি সহজে আসে না। মেয়ের ওপর ভরসা রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত পরিবারের আশীর্বাদ নিয়েই শারমিন আমেরিকায় পা রাখেন। প্রথমে তিনি ওঠেন নিউ জার্সিতে, তাঁর মামার বাসায়।
আমেরিকান জীবনে শারমিনের প্রথম চাকরি ডানকিন ডোনাটসে, আটলান্টিক সিটির দিকে। প্রথম দিন মামা তাঁকে বাসে করে পথ দেখিয়ে দিলেন। কীভাবে যেতে হবে, কোথায় নামতে হবে, কীভাবে ফিরতে হবে, সব বুঝিয়ে দিলেন। কিন্তু ফেরার পথে ঘটল বিপদ। ভুল স্টপে নেমে গেলেন শারমিন। চারপাশে ক্যাসিনো, আলোকিত রাস্তা, অপরিচিত ভবন, একই রকম মোড়। হাতে ফোন নেই, কারও নম্বর নেই, ঠিকানাও নেই। শুধু বাসার নম্বরের অস্পষ্ট স্মৃতি। সন্ধ্যা নেমেছে। ঠান্ডা বাড়ছে। নতুন দেশে একা এক তরুণী অচেনা শহরের রাস্তায় ঘুরছেন। বুঝতে পারছেন না, এখন কোন দিকে যাবেন। চার ঘণ্টা তিনি এভাবেই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলেন। একসময় এক কোণের একটি দোকান দেখে তাঁর মনে হলো, জায়গাটি তিনি আগে দেখেছেন। সেই দোকানকে চিহ্ন ধরে তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর মামার বাসা খুঁজে পেলেন।
এরপর তিনি মুখোমুখি হলেন আরেক বাস্তবতার। সেটি কাজের বাস্তবতা। ডানকিন ডোনাটসে তাঁকে ঝাড়ু দিতে হয়েছে, মেঝে মুছতে হয়েছে, বাথরুম পরিষ্কার করতে হয়েছে, টেবিল মুছতে হয়েছে। প্রথম দিকে তাঁর খুব কষ্ট হতো। তিনি কাঁদতেন। লজ্জা লাগত। মনে হতো, কোনো বাঙালি দেখে ফেললে কী ভাববে।
একদিন তাঁর ভারতীয় ম্যানেজার তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, “আমি ম্যানেজার হয়েও এসব কাজ করি। এটাকে কাজ হিসেবে দেখতে হবে। এখানে কোনো কাজ ছোট নয়।” কথাগুলো শারমিনকে বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করে। ধীরে ধীরে তিনি বুঝলেন, কাজের মর্যাদা আছে। এখানে নারী পুরুষের কাজ আলাদা করে দেখা হয় না। যে কাজ সৎ, সেই কাজ সম্মানের।
আনসার ও শারমিনের পরিচয় ভার্জিনিয়ায়। দুজনের আমেরিকায় আসার পথ আলাদা হলেও অভিজ্ঞতার জায়গায় মিল ছিল অনেক। দুজনেই ডিভি লটারিতে এসেছেন, দুজনের হাতেই ছিল গ্রিন কার্ড। তাই কাগজপত্রের অনিশ্চয়তা তাঁদের ছিল না। কিন্তু তাতে জীবন সহজ হয়ে যায়নি। কাজ, পড়াশোনা, নিজের পেশাগত অবস্থান তৈরি করা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, সবকিছুই ছিল কঠিন।
শারমিন তখন ভার্জিনিয়ায় তাঁর মামাতো বোনের বাসায় থাকতেন। সেখানেই আনসারের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। পরিচয়টি ধীরে ধীরে পারিবারিক আলোচনায় এগোয়। দুজনই একই ধরনের অভিবাসী বাস্তবতার ভেতর দিয়ে এসেছেন। দুজনের সামনেই তখন নিজেকে গড়ে তোলার সময়। পরে আনসারের মা আমেরিকায় আসেন। পরিবারের সম্মতি ও উপস্থিতিতেই তাঁদের বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়।
বিয়ের পর শারমিন-আনসারের জীবন আনন্দভ্রমণ বা অবকাশ দিয়ে শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল কাজের সময়সূচি মিলিয়ে। একজন কাজে গেলে অন্যজন ফিরতেন। একজন ঘরে থাকলে অন্যজন বের হতেন। সংসার ছিল, কিন্তু একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ ছিল খুব কম। নতুন জীবনের শুরুতে তাঁদের সামনে ছিল ভাড়া, বিল, কাজ, ক্লান্তি, দায়িত্ব আর ভবিষ্যতের হিসাব।
এই চাপের মধ্য দিয়েই আনসার ও শারমিন নিজেদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। আনসার সফটওয়্যার টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। শারমিন এগিয়ে যান ডাটাবেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দিকে। যদিও তাঁর পড়াশোনা ছিল সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারে, কিন্তু আমেরিকায় এসে তিনি পেশার পথ বদলেছেন। নতুন দক্ষতা শিখেছেন, নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করেছেন।
এর মধ্যে তাঁদের সংসারে একে একে আসে তিন মেয়ে। তখন সংগ্রামের ধরন আরও বদলে যায়। চাকরি, পড়াশোনা, সংসার, সন্তান, ঘর, রান্না, স্কুল, বেবিসিটার সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে। বাংলাদেশি পরিবারের মতো পাশে খালা, ফুফু, নানি, দাদি ছিল না। কাজের সময় সন্তানদের বেবিসিটারের কাছে রেখে যেতে হয়েছে। নিজেদের হাতে ঘর ও সন্তানদের দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে।
এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শারমিন ও আনসার আজ নিজেদের অভিজ্ঞতাকে দেখেন শিক্ষার জায়গা থেকে। তাঁরা চান, নতুন প্রজন্ম জানুক, প্রথম প্রজন্মের জীবন সহজ ছিল না। অনেকেই বিদেশে থাকা আত্মীয়দের বাড়ি, গাড়ি, স্বাচ্ছন্দ্য দেখে ভাবে, বিদেশের জীবন খুব সহজ। অথচ যে মানুষ আজ স্থির অবস্থানে আছে, তার পেছনে কত বছরের কাজ, অপেক্ষা, হিসাব ও আত্মসংযম আছে, সেটি বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
আনসারের বক্তব্য সরল। আমেরিকা সম্ভাবনার দেশ, এখানে সুযোগ আছে, কিন্তু সুযোগকে কাজে লাগাতে হয়। ধাপ না পেরিয়ে উপরে উঠতে গেলে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। প্রথম ধাপ, দ্বিতীয় ধাপ, তৃতীয় ধাপ পেরোতে হয়। সময় লাগতে পারে, কিন্তু দেরিতে পৌঁছানো না পৌঁছানোর চেয়ে ভালো।
আনসারের এই পর্যবেক্ষণের ভেতরে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী জীবনের একটি বড় সত্য লুকিয়ে আছে। প্রথম প্রজন্ম কষ্ট করে, দ্বিতীয় প্রজন্মের পথ কিছুটা সহজ হয়, তৃতীয় প্রজন্ম আরও কিছুটা স্বস্তি পায়। কিন্তু এই সহজ পথ তৈরি হয় কারও দীর্ঘ সংগ্রামের ওপর দাঁড়িয়ে। যারা সাইকেলে চড়ে বরফের ভেতর কাজে গেছে, যারা শিশুকে বেবিসিটারের কাছে রেখে রাতের শিফটে গেছে, যারা কান্না চেপে বাথরুম পরিষ্কার করেছে, যারা দুই চাকরির ফাঁকে পড়াশোনা করেছে, তারা শুধু নিজের জীবন বদলায়নি। তারা পরের প্রজন্মের জন্য মাটি শক্ত করেছে।
শারমিনের অভিজ্ঞতা এই গল্পে আরেকটি মাত্রা যোগ করে। নারী হিসেবে আমেরিকায় এসে তিনি দেখেছেন, কাজ করলে সম্মান আছে। তবে জীবনের প্রতিটি জায়গা কাগজের নিয়মে চলে না। মানুষকে নিজের আত্মবিশ্বাস, বুদ্ধি ও বাস্তবজ্ঞান নিয়ে চলতে হয়। তিনি মনে করেন, শুধু শিক্ষিত হলেই হবে না, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। বইয়ের জ্ঞান যেমন দরকার, তেমনি দরকার বাস্তবজ্ঞান।
এই গল্পের বড় শিক্ষা হলো, জীবন কাউকে সহজে জায়গা দেয় না। কিন্তু যারা ভেঙে পড়ে না, যারা নিজেদের বদলাতে পারে, যারা ছোট কাজকে অপমান মনে না করে শেখার পথ বানায়, যারা সন্তানদের জন্য নিজের কষ্টকে অর্থপূর্ণ করে তোলে, শেষ পর্যন্ত তারাই নতুন দেশে নিজেদের ঠিকানা তৈরি করে।
শারমিন ও আনসার সেই ঠিকানা তৈরি করেছেন। শুধু নিজেদের জন্য নয়, তাঁদের সন্তানদের জন্য, পরিবারের নতুন প্রজন্মের জন্য, এবং প্রবাসে পা রাখতে চাওয়া অসংখ্য মানুষের জন্য। তাঁদের অভিজ্ঞতা বলে, আমেরিকা স্বপ্নের দেশ হতে পারে, কিন্তু সেই স্বপ্ন কারও হাতে তৈরি হয়ে আসে না। তাকে গড়তে হয় ধৈর্য, পরিশ্রম, সততা এবং সাহস দিয়ে।
তথ্যসূত্র: প্রবাসী টিভি যুক্তরাষ্ট্র
কৃতজ্ঞতা: সোহেল মাহমুদ









