
কানাডার পশ্চিম আকাশে আলবার্টা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের নাম। একদিকে রকি মাউন্টেনের বরফঢাকা শিখর, বিস্তীর্ণ প্রেইরি, গমের মাঠ, তেল-বালুর ভাণ্ডার, কাউবয় ঐতিহ্য, ব্যানফ ও জ্যাসপারের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। অন্যদিকে আছে রাজনৈতিক অভিমান, ফেডারেল সরকারের প্রতি ক্ষোভ, জ্বালানি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কানাডার ভেতরেই আলাদা পরিচয় গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা।
আলবার্টা শুধু একটি প্রদেশ নয়। এটি কানাডার অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ইঞ্জিন, একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের জন্য এক সংবেদনশীল পরীক্ষা। বিচ্ছিন্নতা নিয়ে সাম্প্রতিক গণভোট বিতর্ক সেই পুরনো প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে এনেছে। আলবার্টা কি কানাডার ভেতরে থেকে আরও বেশি ক্ষমতা ও মর্যাদা চাইছে, নাকি সত্যিই একদিন কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার পথে হাঁটতে পারে?
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার ভাবনা নতুন নয়। ১৯৮০ দশকে জাতীয় জ্বালানি কর্মসূচি নিয়ে অটোয়ার সঙ্গে আলবার্টার বিরোধ তীব্র হয়। অনেক আলবার্টানের ধারণা, সেই নীতির মাধ্যমে ফেডারেল সরকার প্রদেশটির জ্বালানি সম্পদের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করেছিল, কিন্তু আলবার্টার স্বার্থ যথেষ্ট রক্ষা করেনি।
পরবর্তী সময়ে কার্বন কর, নির্গমন সীমা, পাইপলাইন অনুমোদন, পরিবেশ মূল্যায়ন আইন এবং জ্বালানি রূপান্তর নীতিকে ঘিরে আলবার্টার ক্ষোভ আরও বাড়ে। আলবার্টার অনেক নাগরিক ও রাজনীতিকের অভিযোগ, প্রদেশটি কানাডার অর্থনীতিতে বিপুল অবদান রাখলেও অটোয়া এমন নীতি নেয়, যা আলবার্টার প্রধান অর্থনৈতিক খাতকে দুর্বল করে।
এই ক্ষোভ থেকেই তৈরি হয়েছে পশ্চিমাঞ্চলীয় বঞ্চনার অনুভূতি। অর্থাৎ পশ্চিম কানাডার এক অংশের ধারণা, ফেডারেল রাজনীতিতে তাদের কণ্ঠ যথেষ্ট মূল্য পায় না। এই অনুভূতি কখনো প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি, কখনো বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন হিসেবে সামনে এসেছে।
২০১৯ সালের ফেডারেল নির্বাচনের পর Wexit শব্দটি বেশি আলোচিত হয়। তখন পশ্চিম কানাডার কিছু অংশে, বিশেষ করে আলবার্টা ও সাসকাচুয়ানে, তৎকালীন জাস্টিন ট্রুডো সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার আলোচনা জোর পায়। যদিও জনসমর্থন কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবু বিষয়টি আলবার্টার রাজনীতিতে স্থায়ী আলোচনায় পরিণত হয়।
২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনের পর আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা প্রশ্ন নতুন গতি পায়। প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ ফেডারেল সরকারের কাছে জ্বালানি নীতি, পাইপলাইন প্রবেশাধিকার, নির্গমন সীমা এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেন। তিনি নিজে প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে অবস্থান না নিলেও বলেন, নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে গণভোটের দাবি এলে সেটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
আলবার্টা প্রসপেরিটি প্রজেক্ট এবং বিচ্ছিন্নতাপন্থি কর্মীরা ২০২৬ সালে নাগরিক উদ্যোগে আলবার্টার স্বাধীনতা নিয়ে গণভোটের দাবিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করে। পরিবর্তিত প্রাদেশিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাক্ষরের সংখ্যা কমে আসে। ২০২৬ সালের মে মাসে সংগঠকেরা প্রায় তিন লাখের বেশি স্বাক্ষর জমা দেয়, যা প্রয়োজনীয় সীমার চেয়ে বেশি বলে জানা যায়।
কিন্তু এই উদ্যোগ দ্রুত আইনি জটিলতায় পড়ে। আলবার্টা বিচ্ছিন্নতা বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর চুক্তিভিত্তিক অধিকার। আলবার্টা প্রদেশ হিসেবে ১৯০৫ সালে সৃষ্টি হলেও বহু আদিবাসী চুক্তি তার আগের। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আলবার্টা যদি কানাডা থেকে আলাদা হতে চায়, তাহলে ভূমি অধিকার, স্বশাসন, সম্পদ এবং ফেডারেল সরকারের সঙ্গে আদিবাসীদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে?
এই কারণেই আলবার্টার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও তাদের সংগঠন আদালতে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে। তাদের বক্তব্য, আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা শুধু প্রাদেশিক ভোটের বিষয় নয়। কারণ এর সঙ্গে আদিবাসীদের চুক্তিভিত্তিক অধিকার, ভূমির দাবি, স্বশাসন এবং কানাডার ফেডারেল সরকারের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। তাই তাদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া এমন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া আইনগত ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
২০২৬ সালের ১৪ মে Court of King’s Bench এর Justice Shaina Leonard বিচ্ছিন্নতাপন্থি নেতা Mitch Sylvestre এর স্বাক্ষরভিত্তিক আবেদন আটকে দেন। আদালত বলেন, আলবার্টা সরকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ছাড়াই এমন একটি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চেয়েছে, যা তাদের চুক্তিভিত্তিক অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে। আদালত আরও উল্লেখ করেন, আলবার্টার নাগরিক উদ্যোগ আইনের অধীনে সাধারণ নাগরিকদের স্বাধীনতা গণভোট শুরু করার ক্ষমতা নেই।
রায়ের পর প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, আলবার্টা গণভোট করতে চাইলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। অন্যদিকে প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ আদালতের রায়কে আইনগতভাবে ভুল এবং অগণতান্ত্রিক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি এবং বিচ্ছিন্নতাপন্থি নেতা Mitch Sylvestre রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আদালত, সংবিধান ও আদিবাসী অধিকারের বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
তবে কোনো প্রদেশ শুধু একটি প্রাদেশিক গণভোটে জিতে কানাডা থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে না। কানাডার সুপ্রিম কোর্টের কুইবেক বিচ্ছিন্নতা সংক্রান্ত মতামত এবং Clarity Act অনুযায়ী, বিচ্ছিন্নতার জন্য স্পষ্ট প্রশ্ন, স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং পরে ফেডারেল সরকার ও অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে সাংবিধানিক আলোচনা প্রয়োজন। নাগরিকত্ব, সীমান্ত, মুদ্রা, আদিবাসী চুক্তি, জাতীয় ঋণ, পেনশন, বাণিজ্য, পাইপলাইন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মতো বিষয়ও তখন নতুন করে আলোচনায় আসবে।
বিভিন্ন সাম্প্রতিক জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আলবার্টায় বিচ্ছিন্নতার পক্ষে ক্ষোভ থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনো কানাডার ভেতরে থাকার পক্ষে। অনেক আলবার্টান স্বাধীন দেশ চান না, কিন্তু অটোয়ার বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা দিতে চান। তাই গণভোটের দাবি অনেক সময় বিচ্ছিন্নতার চেয়ে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ক্যালগারিতে শিল্প খাতের কার্বন মূল্য নির্ধারণ নিয়ে নতুন চুক্তির ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। এটি গত নভেম্বর কার্নি ও প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথের মধ্যে স্বাক্ষরিত জ্বালানি সমঝোতার অংশ। এই সমঝোতার মাধ্যমে অটোয়া ও আলবার্টা দেখাতে চাইছে, মতবিরোধ থাকলেও কানাডার কনফেডারেশনের ভেতরেই সমাধানের পথ খোঁজা সম্ভব।
আলবার্টার এই বিতর্ককে শুধু কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠনের স্লোগান বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর ভেতরে আছে দীর্ঘদিনের প্রাদেশিক ক্ষোভ, অর্থনৈতিক আত্মমর্যাদার প্রশ্ন, সম্পদ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুরনো অভিমান এবং কানাডার ফেডারেল কাঠামোতে পশ্চিমাঞ্চলের অবস্থান নিয়ে গভীর বিতর্ক। অর্থনৈতিক অবদান যখন রাজনৈতিক স্বীকৃতির সঙ্গে মিল খুঁজে পায় না, তখন সেই অভিমান কখনো প্রাদেশিক অধিকারের দাবি হয়, কখনো অটোয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়, আবার কখনো বিচ্ছিন্নতার ভাষায় প্রকাশ পায়।
শেষ পর্যন্ত আলবার্টা আলাদা হবে কি না, সেটিই একমাত্র প্রশ্ন নয়। বড় প্রশ্ন হলো, কানাডা কি তার ভেতরের ভিন্ন অঞ্চল, অর্থনীতি, ইতিহাস ও পরিচয়কে সমান মর্যাদায় ধারণ করতে পারবে? একটি দেশ শুধু সংবিধানের কাগজে টিকে থাকে না। একটি দেশ টিকে থাকে পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা, আস্থা এবং একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার ইচ্ছায়।
তথ্যসূত্র:
The Globe and Mail, ১৪ মে ২০২৬
The Guardian, ১৪ মে ২০২৬
The Wall Street Journal, ১৪ মে ২০২৬









