
মানুষ কখনো কখনো নিজের দেশ ছাড়ে স্বপ্নের টানে, কখনো নিরাপত্তার খোঁজে, কখনো জীবিকার আশায়। কিন্তু সব দেশত্যাগ একই রকম নয়। কারও যাত্রা শুরু হয় বিমানবন্দরের আলো ঝলমলে টার্মিনাল থেকে, কারও শুরু হয় নদীর চর, পাহাড়ি পথ, অচেনা ভাষা, ভেজা কাপড়, ক্ষুধা, ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে। কাজল আহমেদের গল্প সেই দ্বিতীয় পথের গল্প। এটি কোনো ভ্রমণকাহিনি নয়, কোনো রোমাঞ্চের গল্পও নয়। এটি এক অভিবাসী মানুষের নতুন জীবনের সন্ধানে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।
রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ কাজল আহমেদ। তবে জীবনের বড় অংশ কেটেছে ঢাকায়। নিউ মার্কেটের দোতলায় তাঁর চশমা ও সানগ্লাসের পাইকারি ব্যবসা ছিল। এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। জীবন মোটামুটি চলছিল। কিন্তু ব্যবসার সঙ্গে নানা চাপ, চাঁদাবাজি, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতা একসময় তাঁকে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ব্রাজিলে পৌঁছান। ভিসা নিয়েই গিয়েছিলেন। দেশে থাকতেই শুনেছিলেন, ব্রাজিলে কাপড়ের ব্যবসা ভালো, সেখানে সুযোগ আছে। সেই আশাতেই দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে পা রাখেন।
কিন্তু নতুন দেশে পা রাখলেই ব্যবসা শুরু করা যায় না। ভাষা না জানলে মানুষ যেন চোখ খুলেও অন্ধের মতো হয়ে যায়। তাই কাজল আহমেদ প্রথমে একটি দোকানে চাকরি নেন। উদ্দেশ্য ছিল পর্তুগিজ ভাষা শেখা, বাজার বোঝা, পরিবেশ বোঝা। প্রায় ছয় মাস কাজ করে কিছুটা ভাষা শিখলেন। এরপর একজনের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে ছোট একটি ব্যবসাও শুরু করলেন।
ঠিক তখনই পৃথিবী বদলে গেল। করোনা মহামারি এসে ব্রাজিলের জীবনযাত্রা, ব্যবসা এবং জীবিকার সব হিসাব ওলটপালট করে দিল। লকডাউন শুরু হলো। দোকান বন্ধ। ব্যবসা থেমে গেল। টাকার মান কমে গেল। চারদিকে অনিশ্চয়তা। কাজল আহমেদ দেখলেন, ঘরে বসে থাকা ছাড়া যেন আর কোনো পথ নেই।
ব্রাজিলে তখন বাংলাদেশির সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাঁর ভাষ্যমতে, আড়াই হাজারের মতো। বেশির ভাগই সিলেট অঞ্চলের মানুষ। লকডাউনের পর তাঁদের অনেকেই তখন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। কেউ বলছিলেন, “আমেরিকা চলেন।” কেউ বলছিলেন, “ওখানে গেলে কোনো না কোনোভাবে থাকার ব্যবস্থা হবে।” কেউ আশ্রয়ের কথা বলছিলেন, কেউ আইনি প্রক্রিয়ার কথা, কেউ আবার গ্রীন কার্ডের স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন। অনেকেরই মনে তখন এক বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, ব্রাজিলে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকার চেয়ে আমেরিকায় যাওয়ার চেষ্টা করা ভালো।
কাজল আহমেদের মনে প্রশ্ন জাগল, সবাই পারলে তিনি কেন পারবেন না। তাঁর নিজের ভাষায়, “রিজিক থাকলে পৌঁছে যাব। চেষ্টা আমার, বাকিটা আল্লাহর হাতে।”
তখন ব্রাজিল, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনপথ নিয়ে নানা গল্প ভেসে বেড়াত প্রবাসীদের মুখে মুখে। কেউ বলত, বড় দালালের প্যাকেজে গেলে হাজার হাজার ডলার খরচ হয়, কিন্তু পথ কিছুটা গুছানো থাকে। কেউ বলত, ছোট ছোট ধাপে এগোলে খরচ কম, কিন্তু ঝুঁকি অনেক বেশি। কোথাও কয়েকশ ডলার, কোথাও হাজার ডলার, কোথাও আবার পুরো যাত্রার জন্য কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত লেগে যায়। কারও যাত্রা শেষ হয় কয়েক সপ্তাহে, কারও লাগে কয়েক মাস। কেউ সীমান্তেই আটকে যায়, কেউ জেলে যায়, কেউ পথ হারায়, কেউ আর ফিরে আসে না। তাই এই রুটে আমেরিকায় পৌঁছানো মানে শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া নয়, বরং প্রতিটি সীমান্তে জীবনকে নতুন করে বাজি রাখা।
করোনার কয়েক মাস পর শুরু হলো তাঁর যাত্রা। সঙ্গে ছিল কয়েকটি বাংলাদেশি পরিবার। নারী, পুরুষ, শিশু মিলিয়ে একটি ছোট দল। তাঁদের কারও মুখে দৃঢ়তা, কারও চোখে ভয়, কারও মনে অনিশ্চয়তা।
তাঁরা কোনো একক বড় প্যাকেজ দালালের অধীনে ছিলেন না। ধাপে ধাপে, এক সীমান্ত থেকে আরেক সীমান্ত পর্যন্ত আলাদা আলাদা লোকের মাধ্যমে এগিয়েছেন। তাঁদের পথ ছিল ছিন্নভিন্ন, অনিশ্চিত, প্রতিটি সীমান্তে নতুন মুখ, নতুন ভয়, নতুন ভাষা। কোথাও ১০০ ডলার, কোথাও ২০০ ডলার, কোথাও তার চেয়ে বেশি খরচে সীমান্ত পার হওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
ব্রাজিল থেকে তাঁদের প্রথম গন্তব্য ছিল পেরু। পেরু সীমান্তে পৌঁছে তাঁরা প্রথমে একটি হোটেলে রাত কাটান। সেখান থেকেই স্থানীয় লোকজন পরবর্তী যাত্রার ব্যবস্থা করে। পরদিন তাঁদের নেওয়া হয় সীমান্তঘেঁষা একটি অস্থায়ী বাসায়। সেখানে শুধু বাংলাদেশি নয়, নানা দেশের অভিবাসী মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন পরবর্তী পথের। এরপর তাঁদের বাসে তুলে দেওয়া হয়। তিন দিন তিন রাতের পথ পেরিয়ে তাঁরা ইকুয়েডরে পৌঁছান। সেখানেও একই চিত্র। নতুন দালাল, নতুন বাসা, রাতের আশ্রয়, ভোরের ডাক, আবার রওনা। সবার চোখে তখন একই প্রশ্ন, সামনে কী আছে? কেউ জানে না, তবু সবাই এগিয়ে যেতে চায়।
প্রতিটি দেশে গিয়ে তাঁরা কোনো না কোনোভাবে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেছেন। কাজল আহমেদের বর্ণনা অনুযায়ী, অনেক জায়গায় মানবিক সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিসেফ, রেড ক্রস বা সহায়ক প্রতিষ্ঠান তাঁদের খাবার, চিকিৎসা পরীক্ষা, সাবান, কম্বল, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। তবে কোথাও তাঁদের কারাগারে ঢোকানো হয়নি, বরং এক ধরনের খোলা শিবিরে রাখা হয়েছে। তাঁরা চাইলে সেখান থেকে বের হতে পারতেন। কারণ কর্তৃপক্ষ জানত, এই মানুষগুলো তাদের দেশে থেকে যাওয়ার জন্য আসেনি, তাদের লক্ষ্য আমেরিকার দিকে এগিয়ে যাওয়া।
ব্রাজিল থেকে পেরু, পেরু থেকে ইকুয়েডর। কাজল আহমেদের দল তখন ধীরে ধীরে দক্ষিণ আমেরিকার ভেতর দিয়ে উত্তরের দিকে এগোচ্ছে। প্রতিটি সীমান্তে নতুন দালাল, নতুন ভয়, নতুন হিসাব। কোথাও বাস, কোথাও ট্যাক্সি, কোথাও পাহাড়ি রাস্তা, কোথাও মোটরসাইকেল। ভাষা নেই, নিশ্চয়তা নেই, তবু পেছনে ফেরার কথাও নেই।
ইকুয়েডর পেরিয়ে তাঁরা কলম্বিয়ার দিকে এগোতে থাকলেন। কলম্বিয়ার এক সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ের ওপর তাঁদের তিন দিন রাখা হয়। সেখানে নানা দেশের অভিবাসী, নানা ভাষা, নানা মুখ। কেউ আফ্রিকা থেকে, কেউ দক্ষিণ আমেরিকার অন্য দেশ থেকে, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ একা। প্রত্যেকের গন্তব্য একটাই, আমেরিকা।
কলম্বিয়ার পথে তাঁদের কখনো বাসে, কখনো ট্যাক্সিতে, কখনো মোটরসাইকেলে চলতে হয়েছে। একসময় পাহাড়ি এলাকায় শতাধিক মোটরসাইকেল দিয়ে মানুষ বহনের দৃশ্য দেখেছেন কাজল আহমেদ। প্রতি মোটরসাইকেলে দুজন করে যাত্রী। রাতের অচেনা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে এক পর্যায়ে তাঁদের সীমান্তের কাছাকাছি নামিয়ে দেওয়া হয়।
কলম্বিয়া থেকে পানামার দিকে যাওয়ার আগে শুরু হয় আরও ভয়াবহ অধ্যায়। প্রথমে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় সমুদ্রপথের দিকে। কোথাও সরকারি স্পিডবোটে টাকা দিয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে। কোথাও আবার অবৈধভাবে অন্ধকার সমুদ্রপথ পেরোনোর আয়োজন করতে হয়েছে। কাজল আহমেদের দল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ছোট নৌকা নয়, বড় তিন ইঞ্জিনের স্পিডবোটে উঠবে। কারণ সামনে ছিল সাগর, ঢেউ, অন্ধকার এবং জীবন আর মৃত্যুর হিসাব।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে তাঁদের স্পিডবোটে তোলা হলো। সবাই গাদাগাদি করে বসে আছে। নারী, শিশু, পুরুষ মিলিয়ে ৩২ জনের মতো মানুষ। অন্ধকার জলরাশির ওপর বোট ছুটতে শুরু করল। কিন্তু এক ঘণ্টা যাওয়ার পরই বিপদ। কলম্বিয়ার পুলিশ সাগরের মধ্যে তাঁদের ঘিরে ফেলে।
অন্ধকার সমুদ্রপথে শুরু হলো পুলিশের জেরা। কে কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে, কাগজপত্র কোথায়, দালাল কে। কেউ ইংরেজি জানলেও মুখ খুলতে চাইছিল না। কারণ কথা বললেই আরও প্রশ্ন, আরও ঝামেলা। প্রায় চল্লিশ মিনিট সাগরেই জিজ্ঞাসাবাদ চলে। এরপর তাঁদের ফিরিয়ে সীমান্তের কাছে থানায় নেওয়া হয়। সারারাত নাম, ঠিকানা, পরিচয়, কাগজপত্র লেখা হয়। ভোরের দিকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
পরদিন আবার একই পথ। আবার সন্ধ্যা। আবার স্পিডবোট। আবার সাগর। এবার পুলিশের হাতে ধরা পড়া হলো না, কিন্তু সাগর যেন নিজেই পরীক্ষা নিতে শুরু করল। ঢেউয়ের আঘাতে পানি এসে পড়ছিল যাত্রীদের গায়ে। বাচ্চারা চিৎকার করছিল। নারী, পুরুষ সবাই আল্লাহকে ডাকছিল। কাজল আহমেদ বলেন, সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, স্পিডবোট ডুবে গেলে আর কেউ খুঁজে পাবে না।
দীর্ঘ সাগরযাত্রার পর তাঁরা পানামার এক উপকূলে পৌঁছান। জায়গাটিকে তাঁরা বলতেন নারকেল গাছতলা। সন্ধ্যার পর সেখানে নামানো হলো। ততক্ষণে সবাই ভিজে একাকার। শরীর ক্লান্ত, মনে তখনও সাগরযাত্রার আতঙ্ক। সেখানে ছিল ছোট ছোট তাবু। ২০ ডলার করে দিয়ে সেই ভেজা কাপড়েই কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ রাত।
সকালে শুরু হলো পানামার জঙ্গলে ঢোকার প্রস্তুতি। গন্তব্য ডেরিয়ান গ্যাপ। পৃথিবীর অন্যতম কঠিন এবং বিপজ্জনক অভিবাসন পথ। কাজল আহমেদের সঙ্গে তখন বাংলাদেশি পরিবারও ছিল। ছোট শিশু ছিল। কেউ পাঁচ বছরের, কেউ সাত, কেউ দশ। এই শিশুদের বহন করার জন্য পথপ্রদর্শকদের অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়েছে।
স্থানীয় পথপ্রদর্শকদের কারও হাতে অস্ত্র ছিল। তাঁদের বলা হয়েছিল, জঙ্গলে ডাকাতি, হামলা, লুটপাটের ঝুঁকি আছে। মানুষের টাকা পয়সা, কাপড়চোপড়, সবকিছু কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। তাই পথপ্রদর্শকরা নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও রাখে।
কাজল আহমেদের কাছে ছিল সামান্য শুকনো খাবার, কিছু খেজুর, বিস্কুট, পানি, ছোট তাবু, কিছু ওষুধ। সাপের ভয় ছিল। মশা, পোকামাকড় এবং বৃষ্টিতে পথ আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আশঙ্কা ছিল। রাতে শোয়ার সময় চারদিকে সাপের ওষুধ ছিটিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল খাবার। পাহাড়ে উঠতে শক্তি লাগে, আর তাঁদের কাছে শক্তি জোগানোর মতো খাবার ছিল না।
জঙ্গলে ঢোকার পর বুঝতে পারলেন, এই পথ শুধু হাঁটার পথ নয়, এটি মানুষের সীমা পরীক্ষা করার পথ। এক পাহাড়ে উঠতে তিন ঘণ্টা, কখনো চার ঘণ্টা। নামতে আবার দুই ঘণ্টা। বৃষ্টি হচ্ছে। পথ পিচ্ছিল। পাশে গভীর খাদ। কোথাও পা ফসকে গেলে আর বাঁচার নিশ্চয়তা নেই।
কাজল আহমেদের দল ১৬টি পাহাড় ডিঙানোর কথা বলেছে। দিনের পর দিন হাঁটা। ঝর্ণার পানি পান করা। সামান্য খেজুর বা বিস্কুট খেয়ে এগিয়ে চলা। কোনো দোকান নেই, লোকালয় নেই, বিশ্রামের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই। শুধু সামনে এগিয়ে চলা। পেছনে ফেরার পথ নেই।
এই জঙ্গলে কাজল আহমেদ মানুষের অসহায়ত্ব দেখেছেন। তিনি পথে প্রাণহানির চিহ্ন দেখেছেন। শুনেছেন, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে গেলে দল অপেক্ষা করতে পারে না। পথপ্রদর্শকও থামে না। কারণ একজনের জন্য পুরো দল ঝুঁকিতে পড়ে। কাজল আহমেদের নিজের হাঁটুতে ব্যথা শুরু হয়। গামবুট পরে হাঁটতে গিয়ে বাম হাঁটুতে আঘাত পান। তিনি বারবার দলের পেছনে পড়ে যাচ্ছিলেন।
এই সময় এক সিলেটি পরিবার তাঁকে অনেক সাহায্য করে। বিশেষ করে ওই পরিবারের এক নারী বারবার তাঁকে টেনে তুলেছেন, সামনে যেতে বলেছেন, পিছিয়ে পড়তে দেননি। সেই নারীর স্বামীও পেছনে নজর রাখতেন। কাজল আহমেদ বলেন, “ওই ভাবী আমাকে না টানলে আমি হয়তো আসতে পারতাম না।”
আড়াই দিন পর তাঁরা পৌঁছান একটি অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে, যাকে তাঁরা বুড়ি ক্যাম্প বলতেন। সেখানে আড়াই ডলারে চিকেন আর রাইস পাওয়া যায়। বহু দিনের ক্ষুধার পর সেই খাবার তাঁদের কাছে ছিল জীবনের স্বাদ। সেখানে ঝর্ণার পানি, গোসলের সুযোগ, শোয়ার জায়গা ছিল। এক ডলার দিয়ে রাত কাটানো যেত।
কিন্তু যাত্রা তখনও শেষ হয়নি। অপেক্ষা করছিল পানামার আর্মি ক্যাম্প, নদীপথ, কুমিরের আতঙ্ক, মশার কামড়, সরকারি শিবির, আবার নতুন সীমান্ত, আবার নতুন দালাল, আবার নতুন ভয়।
ভোরের আলো ফুটলেও কাজল আহমেদের সামনে পথ তখনও পরিষ্কার নয়। পানামার ভয়ংকর জঙ্গল পেরিয়ে আগের দিন তিনি ও তাঁর দল পৌঁছেছিলেন বুড়ি ক্যাম্পে, জঙ্গলের ভেতর অভিবাসীদের জন্য গড়ে ওঠা একটি অস্থায়ী আশ্রয়স্থল। সেখানে সামান্য খাবার, ঝর্ণার পানি আর রাত কাটানোর জায়গা মিলেছিল ঠিকই, কিন্তু এই যাত্রায় বিশ্রাম মানে নিরাপত্তা নয়। এখানে প্রতিটি সকাল শুরু হয় নতুন অজানা নিয়ে। কোথায় যেতে হবে, কে নিয়ে যাবে, কত টাকা লাগবে, সামনে নদী না পাহাড়, ক্যাম্প না আটক কেন্দ্র, কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না।
বুড়ি ক্যাম্পের রাত কাটিয়ে সকাল হতেই তাঁদের আবার প্রস্তুত হতে বলা হলো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে সবাই জিনিসপত্র গুছাতে লাগলেন। কারও হাতে ছোট ব্যাগ, কারও হাতে ভেজা কাপড়, কারও মুখে ঘুমহীন রাতের ছাপ। কাজল আহমেদ তখন বুঝে গেছেন, এই পথে মানুষ শুধু হাঁটে না, প্রতিটি ধাপে নিজের ভেতরের ভয়টাকেও সঙ্গে নিয়ে চলে।
এরপর তাঁদের কাঠের ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তোলা হয়। পাহাড়ি পানির স্রোত, পাথরের ফাঁক, সরু পথ। ২০ ডলার করে দিয়ে নৌকায় বসতে হয়েছে। সেই নৌকা তাঁদের নিয়ে চলল পানামার আর্মি ক্যাম্পের দিকে। ডেরিয়ান গ্যাপ পেরিয়ে পানামায় ঢোকা অভিবাসীদের প্রাথমিক তথ্য, পরিচয় ও শারীরিক অবস্থা সেখানে নথিভুক্ত করা হতো। পরবর্তী চলাচলের ব্যবস্থাও অনেক সময় সেখান থেকেই করা হতো। নৌকাটি এগোতে শুরু করলে চারপাশের জঙ্গল, পানি, পাহাড় আর পাথর যেন একসঙ্গে মনে করিয়ে দিচ্ছিল, এখানে পথ মানুষের ইচ্ছায় চলে না, মানুষকেই পথের নিয়ম মেনে এগোতে হয়। প্রকৃতির এই বিস্তারের ভেতর মানুষ যেন খুব ছোট, খুব অসহায়। নৌকায় বসে থাকা মানুষগুলোর শরীর স্থির, কিন্তু চোখে টান। কে জানে, পরের বাঁকে কী আছে?
পানামার আর্মি ক্যাম্পে পৌঁছে তাঁদের লাইনে দাঁড় করানো হলো। দীর্ঘ জঙ্গলপথ পেরিয়ে আসা মানুষগুলোর মুখে তখন ক্লান্তির ছাপ, শরীরে অবসাদ, চোখে অনিশ্চয়তা। কর্তৃপক্ষ তাঁদের পরিচয়, যাত্রাপথ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করল। এরপর অন্তত একটি ব্যাপার পরিষ্কার হলো, তাঁরা আর জঙ্গলের ভেতরে আটকে নেই। কিন্তু নিরাপত্তার সেই সামান্য অনুভূতির মধ্যেও কাজল আহমেদ জানতেন, পথ শেষ হয়নি; শুধু বিপদের রূপ বদলেছে।
এরপর তাঁদের খাবারের প্যাকেট দেওয়া হলো। চাল, ডাল, রান্নার সামগ্রী। কেউ কেউ তাবু গেড়ে বসে পড়লেন। কেউ কাঠ জোগাড় করলেন, কেউ আগুন ধরানোর চেষ্টা করলেন, কেউ রান্নায় হাত লাগালেন। দীর্ঘ ক্ষুধা আর ক্লান্তির পর নিজের হাতে রান্না করা সেই খাবার তাঁদের কাছে অমৃতের মতো মনে হয়েছিল।। কিন্তু এই সামান্য স্বস্তিও বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ক্যাম্পজুড়ে মশার উৎপাত ছিল ভয়াবহ। দাঁড়িয়ে থাকলেও কামড়, বসে থাকলেও কামড়, ঘুমাতে গেলেও কামড়। ক্লান্ত শরীরের ওপর যেন আরেক দফা যন্ত্রণা নেমে এল।
রাতে তাবুর ভেতরেও স্বস্তি ছিল না। ঘুম আসছে না, শরীর ব্যথায় ভারী, পায়ে ক্লান্তি, মাথায় চিন্তা। বাইরে অচেনা মানুষের ভিড়, ভেতরে নিজের অজানা ভবিষ্যৎ। কাজল আহমেদ ভাবছিলেন, এত কিছুর পরও কি তিনি সত্যিই আমেরিকা পৌঁছাতে পারবেন? নাকি এই যাত্রা শেষ হবে কোনো এক সীমান্তে, কোনো এক আটক কেন্দ্রে, কিংবা এমন কোনো জায়গায় যেখানে তাঁর নাম কেউ জানবে না?
পরদিন তাঁদের আরেক ক্যাম্পে নেওয়া হলো। সেখানে পৌঁছে তাঁরা দেখলেন, মানবিক সংস্থার লোকজন আগে থেকেই প্রস্তুত। ইউনিসেফ, রেড ক্রস এবং অন্যান্য সহায়ক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অভিবাসীদের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কেউ দিচ্ছে কম্বল, কেউ সাবান, কেউ টুথপেস্ট, ব্রাশ, খাবার প্যাকেট। কোথাও চিকিৎসা পরীক্ষা চলছে, কোথাও ক্ষত বা পোকামাকড়ের কামড়ের জন্য ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
এই সহায়তার পেছনে ছিল একটি কঠিন বাস্তবতা। স্থানীয় প্রশাসন ও মানবিক সংস্থাগুলো জানত, এই পথ দিয়ে হাজার হাজার অভিবাসী পার হয়। তাঁদের মধ্যে থাকে শিশু, নারী, বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ ও দুর্বল যাত্রী। কেউ জঙ্গল পেরিয়ে আসে আহত শরীর নিয়ে, কেউ পানিশূন্যতায় ভেঙে পড়ে, কেউ খাবার না পেয়ে হাঁটার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে। সবাইকে আটকানো সম্ভব নয়, আবার চোখ বন্ধ করাও সম্ভব নয়। তাই পথের কিছু জায়গায় অভিবাসীদের অন্তত বেঁচে থাকার মতো সহায়তা দেওয়া হতো। কাজল আহমেদের ভাষায়, বহু জায়গায় তিনি অচেনা মানুষের সাহায্য পেয়েছেন। কখনো সরকারি ক্যাম্প, কখনো বিদেশি সংস্থা, কখনো স্থানীয় মানুষ, কেউ না কেউ হাত বাড়িয়েছে।
পানামা পেরিয়ে তাঁরা কোস্টারিকা সীমান্তের দিকে এগোলেন। তিন ডলার দিয়ে মিনিবাসে ওঠা। টাকা অল্প, কিন্তু পথ অনিশ্চিত। কোস্টারিকা পেরোতে কয়েক দিন লেগে যায়। কোথাও বাস, কোথাও ট্যাক্সি, কোথাও আবার হাঁটা। একেক দেশে ঢোকা মানে আবার নতুন হিসাব। আবার নতুন লোক, নতুন খরচ, নতুন অনিশ্চয়তা। এক দেশ পার হওয়ার আগেই পরের দেশের আতঙ্ক মাথায় ঢুকে যায়।
এরপর নিকারাগুয়া। তারপর হন্ডুরাস। হন্ডুরাসে স্কুল বাসের মতো বড় বাসে তাঁদের তোলা হয়। বাসটি চলছিল পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে, কখনো আঁকাবাঁকা পথ, কখনো কলাবাগানের ভেতর দিয়ে। রাতের অন্ধকারে বাইরে কী আছে বোঝা যায় না। শুধু বোঝা যায়, গাড়ি চলছে, মানুষ এগোচ্ছে, আর প্রত্যেকেই যার যার বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছে। কেউ সন্তানের হাত ধরে আছে, কেউ ব্যাগ আঁকড়ে, কেউ চোখ বন্ধ করে বসে আছে। কেউ জানে না, পরের চেকপোস্টে কী হবে, সামনে পুলিশ আছে কি না, দালাল কথা রাখবে কি না।
এই পুরো পথে কাজল আহমেদের মনে সব সময় একটি ভয় কাজ করত। তিনি ভাবতেন, ঘুমিয়ে থাকলে দল তাঁকে ফেলে চলে যাবে কি না। কারণ প্রতিটি অস্থায়ী আশ্রয়ে ভোর বা রাতের কোনো এক সময়ে দালাল এসে ডাক দিত। যে ওঠে, সে যায়। যে পিছিয়ে পড়ে, সে পড়ে থাকে। ভাষা না জানা মানুষ হিসেবে তাঁর ভয় ছিল আরও বেশি। দলের বেশির ভাগ সিলেটি হওয়ায় তাঁদের আঞ্চলিক ভাষাও তিনি পুরোপুরি বুঝতেন না। ফলে তিনি নিজেকে আরও বেশি দুর্বল মনে করতেন।
নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা পেরিয়ে তাঁরা মেক্সিকোর দিকে এগোলেন। গুয়াতেমালা থেকে মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছানোর পর ছোট একটি নদী পার হতে হয়েছে। নদীটি বড় নয়, কিন্তু সেই মুহূর্তে সেটি ছিল আরেক রাষ্ট্রের দরজা। নদী পার হলেই নতুন দেশ, নতুন আইন, নতুন বিপদ। এরপর পাহাড়ি পথ, রাস্তা, আবার দালালের বাসা। সেখানে সবাইকে আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়া হলো, পরের ধাপে কে কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে এবং কার সঙ্গে এগোবে।
মেক্সিকোতে ঢোকার পর তাঁদের একটি পিকআপে তোলা হয়। মানুষ এত ঠাসাঠাসি করে বসানো হয়েছিল যে, কারও পা রাখার জায়গা নেই, কারও শরীর সোজা করার সুযোগ নেই। কেউ কারও কাঁধে ভর দিয়ে আছে, কেউ ব্যাগের ওপর, কেউ দাঁড়িয়ে। চারদিকে অস্বস্তি, কিন্তু কেউ অভিযোগ করতে পারে না। কারণ এই পথে অভিযোগের দাম নেই। দালাল যেভাবে চালাবে, সেভাবেই যেতে হয়।
কিছুদূর যাওয়ার পর তাঁদের আমবাগানের ভেতর নামিয়ে দেওয়া হয়। চারপাশে গাছ, মাটির পথ, অচেনা পরিবেশ। আবার হাঁটা শুরু। প্রায় চল্লিশ মিনিট হাঁটার পর একটি মিনিবাস আসে। সবাই তাড়াতাড়ি বাসে উঠে বসে। মনে হচ্ছিল, এবার হয়তো আরেকটি শহরে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু কাজল আহমেদ তখনও জানতেন না, মেক্সিকোর ভেতরেই তাঁর যাত্রার সবচেয়ে দীর্ঘ আটকে পড়ার অধ্যায় অপেক্ষা করছে।
তাঁদের গন্তব্য ছিল তাপাচুলা। মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলে গুয়াতেমালা সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই শহর বহু অভিবাসীর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পথবিন্দু। গুয়াতেমালা থেকে মেক্সিকোতে ঢোকার পর কেউ এখানে কাগজের জন্য অপেক্ষা করে, কেউ দালালের সঙ্গে নতুন কন্ট্রাক্ট করে, কেউ আবার উত্তর মেক্সিকোর দিকে যাওয়ার রাস্তা খোঁজে। কিন্তু তাপাচুলা মানেই নিরাপদ আশ্রয় নয়। সেখানে অভিবাসীদের ওপর নজর থাকে, পুলিশি তৎপরতাও থাকে।
তাপাচুলায় ঢোকার আগেই বিপদ হলো। মিনিবাস চলছিল, সবাই চুপচাপ। কেউ ক্লান্তিতে মাথা নিচু করে আছে, কেউ বাইরে তাকিয়ে। হঠাৎ মেক্সিকোর পুলিশ গাড়িটি ঘিরে ফেলে। পালানোর কোনো সুযোগ ছিল না। কে কোথা থেকে এসেছে, কাগজপত্র কোথায়, কীভাবে ঢুকেছে, এসব জিজ্ঞেস করা হয়। এরপর তাঁদের নামিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হেফাজতে নেওয়া হয়। সঙ্গে থাকা মোবাইল, কাগজপত্র, ব্যক্তিগত জিনিস জমা রাখা হয়। তারপর তাঁদের ঢোকানো হয় ডিটেনশন সেন্টারের ভেতরে, যেখানে আগে থেকেই শত শত অভিবাসী আটকে ছিল।
ভেতরে গিয়ে কাজল আহমেদ দেখলেন, মানুষ আর মানুষ। কেউ গুয়াতেমালা থেকে, কেউ হন্ডুরাস থেকে, কেউ আফগানিস্তান থেকে, কেউ ভারত থেকে, কেউ আফ্রিকার দেশ থেকে। তাঁর ভাষায়, ৭০০ থেকে ৮০০ লোক সেখানে ছিল। জায়গাটির পরিবেশ জেলের মতো কঠোর হলেও সেখানে খাবারের ব্যবস্থা ছিল। তিন বেলা খাবার, গোসলের ব্যবস্থা, শোয়ার ব্যবস্থা, এসি রুম, মাঠ, টিভি, সবই ছিল। কিন্তু ঠান্ডায় গায়ে দেওয়ার মতো তেমন কাপড় ছিল না।
বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে তাঁদের ভিডিও কলে যোগাযোগ করানো হয়। কীভাবে এসেছেন, কোনো দালাল ছিল কি না, কোথা থেকে যাত্রা শুরু করেছেন, এসব জিজ্ঞেস করা হয়। কাজল আহমেদ বলেন, তাঁরা বলেছেন, তাঁরা বড় কোনো প্যাকেজ দালালের মাধ্যমে আসেননি। ধাপে ধাপে, সীমান্ত থেকে সীমান্তে, স্থানীয় লোকের সাহায্যে এসেছেন।
তাঁদের দলের মধ্যে যারা পরিবারসহ ছিল, তাদের অনেককে আগে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কাজল আহমেদসহ কয়েকজন পুরুষকে আটক রাখা হয়। একজন সাত দিন পর ছাড়া পেলেও তিনি এবং আরেকজন ২৫ দিন আটক থাকেন। এই ২৫ দিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে মানসিক চাপের সময়গুলোর একটি। তিনি ভাবতেন, যদি আর ছাড়া না পান? যদি তাঁকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়? যদি এখানেই আটকে থাকেন?
একসময় তাঁরা কয়েকজন মিলে প্রতিবাদ করেন। আফগানিস্তান ও ভারতের কয়েকজনও তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁরা না খেয়ে বসে থাকেন। প্রশ্ন করেন, তাঁদের অপরাধ কী? কেন তাঁদের ছাড়া হচ্ছে না? পরে কাজল আহমেদ অসুস্থতার কথা জানান। তাঁকে আলাদা করে রাখা হয়, ডাক্তার দেখানো হয়, কিছু বিশেষ খাবার দেওয়া হয়। অবশেষে তাঁকে ২০ দিনের একটি কাগজ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, যাতে তিনি তাপাচুলা এলাকায় থাকতে পারেন।
বাইরে এসে তিনি এক পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি আগেই ছাড়া পেয়েছিলেন। তাঁর সহায়তায় কাজল আহমেদ একটি শেয়ার করা রুমে ওঠেন, যার ভাড়া ছিল মাসে ১৬০০ পেসো। এরপর মেক্সিকোতে শরণার্থী হিসেবে আবেদন করেন। প্রায় ২৫ দিন পর তিনি এক বছরের জন্য একটি শরণার্থী কার্ড পান। এই কার্ড থাকলে মেক্সিকোতে পুলিশ সহজে কাউকে আটক করে না।
মেক্সিকোর এক কর্মকর্তা তাঁকে নাকি বলেছিলেন, “আমেরিকা যাবে কেন? এখানে থাকো, আমরা সাহায্য করব।” তাঁকে মাসে ২০০ ডলার সহায়তার কথাও বলা হয়। কিন্তু কাজল আহমেদের মন তখনও আমেরিকার দিকে। তিনি এখানে থাকার আগ্রহ দেখাননি। তাঁর একটাই লক্ষ্য, এত দূর যখন এসেছেন, শেষ সীমান্ত পর্যন্ত যাবেন।
তারপর শুরু হলো কাজলের একা যাত্রা। এবার তাঁর পাশে আগের দল নেই, পরিচিত মুখ নেই, ভাষা বোঝে এমন কেউ নেই। তাপাচুলা থেকে মেক্সিকোর উত্তর সীমান্তের দিকে রওনা হওয়া মানে আবার অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথে পা রাখা। অপেক্ষা করছিল তিন দিন তিন রাতের বাসযাত্রা। হাতে সামান্য টাকা। গন্তব্য মেক্সিক্যালি। কিন্তু তিনি জানতেন না, সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে মাফিয়া আতঙ্কের আরেক অধ্যায়।
মেক্সিকোর তাপাচুলায় প্রায় এক মাস কাটানোর পর কাজল আহমেদ বুঝলেন, এখানে থেমে থাকলে তাঁর লক্ষ্য পূরণ হবে না। মেক্সিকো তাঁকে এক বছরের শরণার্থী কার্ড দিয়েছে, থাকার প্রস্তাবও এসেছে, কিন্তু তাঁর মন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। এত দেশ, এত সীমান্ত, এত ভয় আর অনিশ্চয়তা পেরিয়ে এসে শেষ গন্তব্যের আগে থেমে যাওয়ার কথা তিনি ভাবতে পারছিলেন না। এবার তাঁকে যেতে হবে মেক্সিকোর উত্তর সীমান্তের দিকে। পথ দীর্ঘ, সঙ্গী নেই, সবকিছু অচেনা, তবু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন।
১৮০০ পেসো দিয়ে তিনি বাসের টিকিট কাটলেন। গন্তব্য মেক্সিক্যালি। মেক্সিকোর দক্ষিণ থেকে উত্তর সীমান্তের দিকে দীর্ঘ বাসযাত্রা। তিন দিন তিন রাতের পথ। তখন তাঁর কাছে টাকা প্রায় শেষ। আমেরিকায় থাকা এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। সেই বড় ভাই ১২০০ ডলার পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। তাপাচুলায় যে বাসায় তিনি ছিলেন, সেই বাসার মালিকের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে টাকা গ্রহণ করা হলো। কিছু দেনা শোধ করলেন, কিছু টাকা পেসোতে ভাঙালেন, কিছু ডলার সঙ্গে রাখলেন। তারপর কাজল আহমেদ রওনা হলেন মেক্সিক্যালির পথে।
দীর্ঘ বাসযাত্রার পর মেক্সিক্যালিতে নেমে কাজল আহমেদ বুঝলেন, এত দূর এসে তিনি যেন আরেক অচেনা ফাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে গেছেন। শরীর ক্লান্ত, মাথা ভার, হাতে সামান্য টাকা। চারপাশে সবকিছু অপরিচিত। শুধু জানতেন, এই শহরের কোনো এক প্রান্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তের দিকে এগোতে হবে। কিন্তু কোন পথ নিরাপদ, কোন পথ বিপজ্জনক, কার ওপর ভরসা করা যায়, কিছুই তাঁর জানা নেই।
অসহায় অবস্থায় তিনি একটি হোটেলে ওঠেন। রিসেপশনের এক নারী মোবাইল অনুবাদের মাধ্যমে তাঁর কথা বোঝার চেষ্টা করেন। কাজল তাঁকে জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তের দিকে যেতে চান। কথা শুনে ওই নারী তাঁকে সতর্ক করলেন। বললেন, তিনি ভুল এলাকায় চলে এসেছেন। জায়গাটি বিপজ্জনক। এখানে মাফিয়া গ্রুপের প্রভাব আছে। ভুল মানুষের হাতে পড়লে অপহরণ, মুক্তিপণ কিংবা আরও বড় বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে। কাজল আহমেদ তখন বুঝলেন, আমেরিকা যত কাছে মনে হচ্ছে, বিপদও তত কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।
হোটেলের ওই নারী তাঁকে সেদিন আশ্রয় দিলেন এবং সাহায্যের চেষ্টা করলেন। পরে এক ট্যাক্সি ড্রাইভারকে ডাকা হলো। ট্যাক্সি ড্রাইভার সীমান্তের কথা শুনে জানাল, ওই পথে দেয়াল আছে, পথ বিপজ্জনক। ওপরে উঠিয়ে দিলেও নিচে নামা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সে তাকে সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারবে, কিন্তু নিরাপদে পার করানোর নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। কাজল আহমেদ আবার অনিশ্চয়তায় পড়ে গেলেন। এত পথ পেরিয়ে এসে তিনি বুঝতে পারছিলেন, শেষ সীমান্তের কাছাকাছি এসেও ভুল সিদ্ধান্ত জীবন বদলে দিতে পারে।
এরপর এক বন্ধুর মাধ্যমে আরেকজনের যোগাযোগ পেলেন তিনি। সেই যোগাযোগ থেকে জানা গেল, তাঁকে পেছনের দিকে আরেক সীমান্ত এলাকায় যেতে হবে। ট্যাক্সিতে করে প্রায় তিন ঘণ্টা পথ ফিরে গেলেন কাজল আহমেদ। সেখানে একজন স্থানীয় যুবক তাঁকে পথ দেখাল। সামনে শুকনো নদীর চর, কোথাও সামান্য পানি, ছোট কালভার্টের মতো একটি জায়গা, দূরে সীমান্তরক্ষী। প্রথমবার এগোতে গিয়ে মেক্সিকোর পুলিশ টহল দেখতে পেয়ে তিনি ফিরে আসেন। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করেন। তারপর আবার সাহস করে এগিয়ে যান।
সেই মুহূর্তে তাঁর ভেতরে ভয়ও ছিল, আনন্দও ছিল। এত দূর এসে শেষ পদক্ষেপের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই কয়েক মিনিটেই হয়তো তাঁর জীবনের পথ বদলে যাবে। যদি আটক করে? যদি ফেরত পাঠায়? যদি আর ফোন করার সুযোগ না থাকে? সীমান্তের দিকে এগোনোর আগে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়। তিনি বললেন, “আমি এখন ঢুকছি। এরপর হয়তো কথা হবে না।” এরপর ফোনের কথা থেমে যায়, কিন্তু পথ থামে না। তিনি আবার এগিয়ে যান। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত, আর পেছনে পড়ে থাকে দীর্ঘ কয়েক মাসের ক্ষুধা, ভয়, জঙ্গল, সাগর আর ডিটেনশন সেন্টারের স্মৃতি।
অবশেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে পৌঁছান। কাজল আহমেদ আগেই জেনেছিলেন, আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে সীমান্তে পৌঁছালে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে উপস্থাপন করতে হয় এবং সেখান থেকেই আশ্রয় আবেদনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। পথে অন্য অভিবাসী ও পরিচিতজনদের কাছ থেকেও তিনি এ কথাই শুনেছিলেন। তাই সীমান্তে পৌঁছে তিনি নিজেই সীমান্তরক্ষীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর সঙ্গে তখন ভেনেজুয়েলাসহ বিভিন্ন দেশের আরও কয়েকজন অভিবাসী ছিলেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর সীমান্তরক্ষীরা তাঁদের গাড়িতে তুলে অ্যারিজোনার একটি সীমান্তরক্ষী কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে শুরু হয় নিয়মিত প্রক্রিয়া। নাম ঠিকানা নেওয়া হলো, সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র পরীক্ষা করা হলো, কাগজপত্র দেখা হলো এবং প্রাথমিক কিছু প্রশ্ন করা হলো। তখন কাজল আহমেদের গায়ে ছিল শুধু একটি শর্টস ও একটি গেঞ্জি। পকেটে ছিল সামান্য টাকা। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা শরীর তখন ক্লান্তিতে প্রায় ভেঙে পড়ার মতো।
তাঁকে রাখা হলো একটি ঠান্ডা ঘরে। গায়ে দেওয়ার জন্য দেওয়া হলো পাতলা একটি কম্বল। শারীরিকভাবে তিনি ভালো বোধ করছিলেন না। দুশ্চিন্তা এবং ঘুমহীনতার চাপ শরীরকে ভেঙে দিয়েছিল। পরে তাঁকে ডাক্তার দেখানো হলো, খাবার দেওয়া হলো। ভয় ছিল, কিন্তু তার ভেতরেই ছিল সামান্য আশার আলো। তিনি অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এসে পৌঁছেছেন। পরদিন আবার তাঁকে ডাকা হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কেন এসেছেন, কোথায় যাবেন, কার কাছে উঠবেন, পরিবার কোথায়, এসব জানতে চাওয়া হয়। কাজল আহমেদ স্পষ্টভাবে জানান, তিনি নিউইয়র্কে যাবেন এবং সেখানে তাঁর এক বন্ধুর বাসায় উঠবেন।
কাজল আহমেদের ভাষ্যমতে, তাঁর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং দীর্ঘ যাত্রার কথা শুনে কর্মকর্তাদের আচরণ ছিল সহানুভূতিপূর্ণ। এতদিনের পথে তিনি দেখেছেন ভয়, অনিশ্চয়তা, দালালের কঠোরতা, সীমান্তের চাপ এবং মানুষের অসহায়তা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আচরণ তাঁকে এক ধরনের বিস্ময়ের মুখে দাঁড় করায়। তিনি ভাবেননি, এমন অবস্থায় কেউ তাঁর দিকে মানবিক চোখে তাকাবে। একজন কর্মকর্তা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে নাকি জিজ্ঞেস করেন, “তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?” প্রশ্নটি শুনে কাজল আহমেদ যেন মুহূর্তের জন্য থমকে যান। তিনি শুধু বলেন, এই অবস্থায় তিনি আর থাকতে পারছেন না, তাঁকে যেন ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর তাঁকে চিকিৎসক দেখানো হয়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়। তাঁর পুরোনো কাপড় ধুয়ে ইস্ত্রি করে ফেরত দেওয়া হয়। কয়েক দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র তৈরি করে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কাজল আহমেদের কাছে এটি শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ কঠিন পথ পেরিয়ে প্রথমবারের মতো মানবিক আচরণের স্পর্শ পাওয়ার অভিজ্ঞতা।
এরপর তাঁকে অ্যারিজোনার একটি বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সীমান্তরক্ষী কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছে কাজল আহমেদ ভেবেছিলেন, হয়তো এবার পথ কিছুটা সহজ হবে। কিন্তু মুক্ত আকাশের নিচেও তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আরেক অনিশ্চয়তা। তাঁকে বলা হলো, টিকিট করে নিজের গন্তব্যে চলে যেতে। তাঁর গন্তব্য নিউইয়র্ক। কিন্তু নিউইয়র্কের ফ্লাইটের টিকিট পাওয়া যাচ্ছিল না। কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হলে হোটেলে থাকতে হবে, আর হোটেলে থাকলে হাতে থাকা শেষ সামান্য টাকাও শেষ হয়ে যাবে। পকেটে তখন প্রায় কিছুই নেই। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আকাশপথ নয়, বাসেই নিউইয়র্ক যাবেন। ট্যাক্সিতে করে তিনি বাস টার্মিনালে গেলেন এবং ৩৬৫ ডলার দিয়ে নিউইয়র্কের দূরপাল্লার বাসের টিকিট কাটলেন। তিন দিন তিন রাতের পথ। টিকিট কাটার পর তাঁর হাতে বাকি থাকল অতি সামান্য টাকা। খাবার কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা ছিল না, গরম কাপড় ছিল না, মোবাইলে ঠিকমতো যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল না। তবু তিনি জানতেন, এখন আর থামার উপায় নেই। যেভাবেই হোক, নিউইয়র্কে পৌঁছাতেই হবে।
এই কঠিন মুহূর্তেই আবার তাঁর জীবনে এক অচেনা মানুষের হাত বাড়ল। বাস টার্মিনালে তিনি দেখলেন, এক বৃদ্ধা নারী বসে বাইবেল পড়ছেন। কাজল আহমেদ সাহস করে তাঁর কাছে গেলেন। ভাঙা ভাষা আর ইশারা দিয়ে নিজের অবস্থা বোঝালেন। বৃদ্ধা নারী তাঁর কথা শুনলেন এবং কোনো প্রশ্ন না করে, কোনো সন্দেহ না দেখিয়ে, টার্মিনাল থেকে ৬০ ডলার দিয়ে তাঁকে একটি কম্বল কিনে দিলেন। সেই কম্বল শুধু ঠান্ডা থেকে বাঁচার জিনিস ছিল না, কাজল আহমেদের কাছে সেটি ছিল অচেনা দেশে মমতার প্রথম উষ্ণ স্পর্শ। দীর্ঘ বাসযাত্রাতেও এই নারী তাঁকে পানি, বিস্কুট ও খাবার কিনে দিয়েছেন। মাঝপথে নিজের গন্তব্যে নামার আগে তিনি তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন, আর কয়েকটি স্টপেজ পর নিউইয়র্ক আসবে। বৃদ্ধা নারী নেমে যাওয়ার পরও কাজল আহমেদ পুরোপুরি একা হয়ে যাননি। বাসে থাকা আরেক দম্পতি তাঁর পাশে দাঁড়ান। নিউইয়র্কে পৌঁছে তাঁরা তাঁর বন্ধুকে ফোন করেন, ৬৫ ডলার দিয়ে ট্যাক্সি ডেকে দেন এবং ব্রুকলিনে বন্ধুর বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। কাজল আহমেদের দীর্ঘ যাত্রায় এই মানুষগুলোর সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাঁরা পরিচিত ছিলেন না, নিজ দেশের মানুষও ছিলেন না। কিন্তু সেই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা হয়ে উঠেছিলেন আত্মার আত্মীয়। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, মানবতার কোনো দেশ নেই, মমতার কোনো সীমানা নেই।
নিউইয়র্কে বন্ধুর বাসায় পৌঁছে কাজল আহমেদ প্রথমবার নিজেকে কিছুটা নিরাপদ মনে করেন। কয়েক দিন বিশ্রাম নিয়ে শরীর কিছুটা সামলে নিলেন। কিন্তু নিউইয়র্কে বিশ্রামের সময় দীর্ঘ হয় না। এখানে বেঁচে থাকতে হলে কাজ চাই, আয় চাই, মাথার ওপর ছাদ ধরে রাখার মতো টাকা চাই। তাই আবার শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। প্রথমে তিনি একটি বাঙালি রেস্টুরেন্টে কাজ পেলেন। নতুন দেশ, অনিশ্চিত কাগজপত্র, ভাষা ও নিয়মকানুনের অজ্ঞতা, সব মিলিয়ে তিনি তখন খুবই দুর্বল অবস্থানে। নিউইয়র্কে যেখানে ন্যূনতম মজুরি অনেক বেশি, সেখানে তাঁকে ঘণ্টায় মাত্র ৮ ডলার দেওয়া হলো। প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না। ২৫ দিন তিনি সেই কাজ করলেন। এরপর আরেক রেস্টুরেন্টে গেলেন। সেখানে ১০ ডলারের কথা বলে শেষ পর্যন্ত ৮ ডলার দেওয়া হলো। সাত দিন পর সেই কাজও ছেড়ে দিতে হলো। পরে এক বন্ধুর সহায়তায় তিনি তুলনামূলক ভালো একটি কাজে যুক্ত হন।
কাজল আহমেদের পরিবার তখনও তাঁর কাছে নেই। স্ত্রী, সন্তান, প্রিয়জন দূরে। কাগজপত্রের প্রক্রিয়া চলছে। তাঁর মনে সবসময় প্রশ্ন, কবে স্থায়ী হবেন, কবে পরিবার আনতে পারবেন, কবে এই অনিশ্চয়তার শেষ হবে।
তিনি বলেন, আমেরিকায় এলেই জীবন সহজ হয়ে যায়, এই ধারণা ভুল। এখানে কাজ আছে, কিন্তু সংগ্রামও আছে। বাসাভাড়া, খাবার, ফোন, যাতায়াত, কাগজপত্র, সবকিছু মিলিয়ে খরচ অনেক। নতুন আসা মানুষের জন্য শুরুটা খুব কঠিন। অনেকেই ভাবে, আমেরিকায় পা রাখলেই ডলার আর ডলার। বাস্তবে এখানে প্রতিটি ডলারের পেছনে ঘাম আছে, সময় আছে, একাকী সহ্য করা কষ্ট আছে।
ব্রাজিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে কাজল আহমেদের মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৩২০০ ডলার। অঙ্কটি শুনতে খুব বেশি মনে না হলেও এর সঙ্গে ছিল ক্ষুধা, জঙ্গল, পাহাড়, সাগর, ডিটেনশন সেন্টার, ভাষার সমস্যা, শারীরিক কষ্ট এবং মানসিক চাপ। তিনি বলেন, “টাকা কম গেছে, কিন্তু কষ্ট গেছে প্রচুর।”
কাজল আহমেদের গল্প কোনো সাহস দেখানোর গল্প নয়। এটি সতর্কতার গল্প। তিনি চান না কেউ তাঁর গল্প শুনে এই পথে বেরিয়ে পড়ুক। কারণ তিনি বেঁচে ফিরেছেন বলে সবাই ফিরবে, এমন নয়। কেউ পথেই হারিয়ে যায়, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে, কেউ সাগরে ডুবে যায়, কেউ জঙ্গলে আটকে যায়, কারও গল্প আর কেউ জানে না।
কাজল আহমেদের গল্প কোনো সাহস দেখানোর গল্প নয়। এটি সতর্কতার গল্প। তিনি চান না কেউ তাঁর গল্প শুনে এই পথে বেরিয়ে পড়ুক। কারণ তিনি বেঁচে ফিরেছেন বলে সবাই ফিরবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কেউ পথেই হারিয়ে যায়, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে, কেউ সাগরের ঢেউয়ে তলিয়ে যায়, কেউ জঙ্গলের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। যারা আর ফিরে আসে না, তাদের নাম কেউ জানে না; তাদের অসমাপ্ত গল্প বাতাসে ভেসে থাকে, অচেনা কোনো সীমান্তের ওপারে।
তথ্যসূত্র: প্রবাসী টিভি যুক্তরাষ্ট্র
কৃতজ্ঞতা: সোহেল মাহমুদ









