সম্পাদকের পাতা

স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে এবার সবার দৃষ্টি প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ শিবিরে

নজরুল মিন্টো

স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আবারও অন্টারিও রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। টরন্টোর পূর্ব প্রান্তের এই রাইডিং শুধু একটি নির্বাচনী আসন নয়, এটি এখন অভিবাসী মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, সামাজিক অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। লেক অন্টারিওর কাছাকাছি বিস্তৃত এই জনপদে আছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযুদ্ধ, ছোট ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনের হিসাব, নতুন অভিবাসীদের আশা, বহু সংস্কৃতির সহাবস্থান এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির দৃশ্যমান উপস্থিতি। তাই এখানে কোনো নির্বাচন, উপনির্বাচন এলেই তা শুধু দলীয় রাজনীতির ঘটনা থাকে না, কমিউনিটির ভেতরেও তৈরি করে প্রত্যাশা ও আলোচনার নতুন ঢেউ।

এখানে রাজনীতি কেবল ভোটের বাক্সে সীমাবদ্ধ থাকে না। মসজিদ, স্কুল, গ্রোসারি স্টোর, রেস্টুরেন্ট, ক্রিকেট মাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পারিবারিক আড্ডা পর্যন্ত রাজনীতির আলোচনায় যুক্ত হয়ে যায়। কারা মানুষের পাশে দাঁড়াবে, কারা সরকারি সেবার জটিলতা কমাবে, কারা ছোট ব্যবসায়ীদের কথা বলবে, কারা নতুন প্রজন্মকে মূলধারায় এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে, এসব প্রশ্ন এখানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে আছে।

এই রাইডিংয়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে ডলি বেগমের সাফল্যের পর। মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন নারী প্রথমে অন্টারিও পার্লামেন্টে এমপিপি হিসেবে এবং পরে ফেডারেল রাজনীতিতে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হওয়ায় স্কারবরো সাউথওয়েস্ট এখন শুধু একটি স্থানীয় আসন নয়, বরং বহুসাংস্কৃতিক কানাডার রাজনীতিতে সম্ভাবনার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

গত ৯ মে অন্টারিও লিবারেল পার্টির মনোনয়নযুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক চমক দেখা যায়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আহসানুল হাফিজ লিবারেল মনোনয়ন লাভ করেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তিনি পরাজিত করেন ফেডারেল রাজনীতির পরিচিত মুখ নাথানিয়াল এরস্কিন স্মিথকে।

এই বিজয় কমিউনিটিতে নতুন উৎসাহ তৈরি করেছে। অনেকের কাছে এটি শুধু একজন প্রার্থীর মনোনয়ন নয়, বরং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের রাজনৈতিক সক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তবে নির্বাচনী লড়াই এখানেই থেমে নেই। এনডিপি ফাতিমা শাবানকে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এখন সবার দৃষ্টি প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির দিকে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, দলটি কাকে সামনে নিয়ে আসবে। এই আলোচনার কেন্দ্রেই উঠে এসেছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মোরশেদ নিজামের নাম।

মোরশেদ নিজাম একজন চার্টার্ড প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট, সংক্ষেপে CPA। তিনি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সফল অভিবাসী, দীর্ঘদিনের স্কারবরোবাসী এবং প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত। পেশাগত দক্ষতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং কমিউনিটির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে অনেকে পিসির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখছেন।

অভিবাসী জীবনের বাস্তবতা মুরশেদ নিজামের কাছে কোনো বইয়ের তত্ত্ব নয়। কানাডায় এসে নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলা, পেশাগত স্বীকৃতি অর্জন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করা এবং একই সঙ্গে কমিউনিটির কাজে যুক্ত থাকা, এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের জীবনের জটিলতা কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। তিনি কানাডায় এসে CPA Ontario সম্পন্ন করেন এবং বর্তমানে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্টিং প্র্যাকটিস পরিচালনা করছেন।

একজন হিসাববিদ হিসেবে তিনি সংখ্যার ভাষা বোঝেন। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে বোঝেন খরচের চাপ, করের ভার, নীতিনিয়মের জটিলতা এবং ছোট ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনের লড়াই। আর একজন কমিউনিটি সংগঠক হিসেবে তিনি বোঝেন, মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে কেবল বক্তব্য দিলেই হয় না, মাঠে থাকতে হয়, পাশে থাকতে হয়, কাজের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়।

স্কারবরোতে দীর্ঘদিন বসবাসের অভিজ্ঞতায় মোরশেদ নিজাম স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ কাছ থেকে দেখেছেন। বিশেষ করে অন্টারিও সরকারের বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে অনেক সময় দীর্ঘ বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের ভাষ্য, এই বাস্তবতা থেকেই তিনি স্কারবরো এলাকায় ServiceOntario সেবার পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা শুরু করেছেন।

কমিউনিটি সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও মোরশেদ নিজামের উপস্থিতি দৃশ্যমান। তিনি স্কারবরো বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত আছেন। জোসেফ ব্র্যান্ট পাবলিক স্কুলে তিনি সাবেক কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। টরন্টো বাংলা স্কুলের চিফ প্যাট্রন হিসেবেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। জানা যায়, যে স্কুলটি একসময় মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সেটি এখন শতাধিক শিক্ষার্থীর একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। খেলাধুলার সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। বেঙ্গল স্ট্রাইকার্স ক্রিকেট ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তরুণদের খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন।

মোরশেদ নিজামের অগ্রাধিকারের আরেকটি ক্ষেত্র হলো মূলধারার পেশায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। টরন্টো পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ জননিরাপত্তা ও জরুরি সেবার বিভিন্ন খাতে তাঁদের অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে তিনি কাজ করতে চান। এছাড়া স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য একটি আধুনিক কনভেনশন সেন্টার নির্মাণের ভাবনাও তাঁর অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

স্কারবরো সাউথওয়েস্টের বাতাসে এখন নির্বাচনের উত্তাপ। রাস্তার মোড়ে, কফিশপে, কমিউনিটি আড্ডায় এবং সামাজিক মাধ্যমে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টি কাকে বেছে নেবে? যদি মোরশেদ নিজাম পিসি মনোনয়ন পান, তাহলে এ রাইডিংয়ে লিবারেল ও পিসি, দুই প্রধান দলের প্রার্থীই হবেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। এতে স্কারবরো সাউথওয়েস্টের আসন্ন নির্বাচনী লড়াই আরও জমে উঠবে। এখন শুধু অপেক্ষা, পিসি শিবির শেষ পর্যন্ত কোন নামটি সামনে আনে। সেই নাম ঘোষণার পরই বোঝা যাবে, স্কারবরো সাউথওয়েস্টের নির্বাচনী গল্পটি সাধারণ লড়াই থাকবে, নাকি নতুন নাটকীয় মোড় নেবে।

এনএন/ ১১ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language