
রাজনীতিতে কখনও কখনও ভোটের দিন আসার আগেই সবচেয়ে বড় লড়াই শুরু হয়ে যায়। ব্যালট বাক্সে কার নাম থাকবে, তার আগেই প্রশ্ন ওঠে কার সদস্য কত, কার সংগঠন কত শক্তিশালী, আর দলের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ। টরন্টোর স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনে ওন্টারিও লিবারেল পার্টির মনোনয়ন প্রতিযোগিতা এখন সেই পরীক্ষার মুখে। এখানে মনোনয়ন শুধু একটি প্রাদেশিক আসনের প্রার্থী নির্ধারণের বিষয় নয়, বরং ওন্টারিও লিবারেলদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, দলীয় পুনর্গঠন এবং তৃণমূল রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
কানাডার জাতীয় দৈনিক গ্লোব অ্যান্ড মেইলে প্রকাশিত লরা স্টোনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনের এই গুরুত্বপূর্ণ মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় জমা পড়া সদস্যপদ আবেদনের প্রায় এক তৃতীয়াংশ বাতিল করেছে ওন্টারিও লিবারেল পার্টি। দলের ভাষ্য, ডুপ্লিকেট নাম, অসম্পূর্ণ তথ্য, ভুল তথ্য এবং যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতির কারণে এসব আবেদন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে লিবারেল এমপি নেট আর্সকিন স্মিথের ক্যাম্পেইন। তাদের অভিযোগ, দলীয় প্রক্রিয়ার নামে অনেক সম্ভাব্য ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
ওন্টারিও লিবারেল পার্টির প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন ম্যাকগ্যারি মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানান, সদস্যপদ আবেদন যাচাইয়ের পর ১,৮০৬টি আবেদন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪১টি ছিল ডুপ্লিকেট এবং ১,২৬৫টি আবেদনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ খসড়া যোগ্য সদস্য তালিকায় রয়েছে ৩,৫৮১ জনের নাম। তবে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে আরও কিছু নাম বাদ পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মনোনয়ন ভোটের আগে সদস্যপদ তালিকা ঘিরে এই হিসাব শুধু সাংগঠনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই বাতিলের পেছনে কয়েক ধরনের কারণের কথা দলীয় মহলে আলোচনায় আছে। প্রথমত, একই ব্যক্তির নামে একাধিক আবেদন পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়ত, অনেক আবেদনে অসম্পূর্ণ বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য ছিল। তৃতীয়ত, কিছু আবেদনকারীর ঠিকানা রাইডিংয়ের বাইরে বলে চিহ্নিত হয়েছে। চতুর্থত, একই ইমেইল বা একই ধরনের অনলাইন পদ্ধতি ব্যবহার করে একসঙ্গে বহু সদস্যপদ আবেদন পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পঞ্চমত, সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কানাডার বাইরের আইপি ঠিকানা থেকেও কিছু সদস্যপদ আবেদন জমা পড়েছে, যা যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সন্দেহ তৈরি করেছে। এসব কারণেই বড় একটি অংশকে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আর্সকিন স্মিথের ক্যাম্পেইন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। ক্যাম্পেইনের মুখপাত্র অ্যালেক্স স্পিয়ার্স বলেন, ১,২৬৫টি সদস্যপদ অবৈধ ঘোষণা করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ এটি মোট আবেদনের প্রায় এক চতুর্থাংশ। তাঁর মতে, দলের নতুন দুই ধাপের ইমেইল ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াই অনেক আবেদনকারীর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই হয়তো সদস্য হতে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু অনলাইনে একাধিক ধাপ পূরণ করা বা ইমেইলের মাধ্যমে সদস্যপদ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া ঠিকভাবে বুঝতে পারেননি।
স্পিয়ার্স বলেন, যে দল তৃণমূল পর্যায়ে পুনর্গঠনের কথা বলছে, তাদের উচিত নয় সদস্যদের জন্য ভোটের পথ অহেতুক কঠিন করে তোলা। তাঁর বক্তব্য, এসব সদস্য ভোট দেওয়ার প্রতিটি সুযোগ পাওয়ার যোগ্য। তিনি আরও বলেন, মানুষ অন্যায়ভাবে ভোটাধিকার হারাচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন; তারা কাকে সমর্থন করছে, সেটি মুখ্য বিষয় নয়। তাঁর ভাষায়, দলের ভোটার যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। তবে আর্সকিন স্মিথের ক্যাম্পেইন মোট কতজন সদস্য সংগ্রহ করেছিল, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি।
অন্যদিকে ওন্টারিও লিবারেল পার্টির অন্তর্বর্তীকালীন নেতা জন ফ্রেজার এক বিবৃতিতে বলেন, দল একটি স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তাঁর মতে, বড় আকারের সদস্য সংগ্রহ অভিযানে ডুপ্লিকেট বা অসম্পূর্ণ আবেদন থাকা অস্বাভাবিক নয়। সেগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। মনোনয়নের নিয়মগুলো প্রক্রিয়ার সততা রক্ষার জন্যই করা হয়েছে এবং সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে তা একইভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।
স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনটি খালি হয় ওন্টারিও এনডিপির সাবেক ডেপুটি লিডার ডলি বেগমের পদত্যাগের পর। তিনি প্রাদেশিক আসন ছেড়ে ফেডারেল রাজনীতিতে যোগ দেন এবং সম্প্রতি ফেডারেল লিবারেল এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর পদত্যাগের ফলে প্রাদেশিক আসনটি শূন্য হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডকে গ্রীষ্মের মধ্যে এই আসনে উপনির্বাচনের ঘোষণা দিতে হবে।
এই আসনে ওন্টারিও লিবারেল মনোনয়নের লড়াইয়ে মোট চারজন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম নেট আর্সকিন স্মিথ। তিনি বর্তমানে বিচেস ইস্ট ইয়র্ক এলাকার ফেডারেল লিবারেল এমপি। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ওন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতৃত্বের দৌড়েও নামতে পারেন। সে কারণে স্কারবরো সাউথওয়েস্টে মনোনয়ন জয় তাঁর জন্য শুধু একটি আসনের টিকিট নয়, বরং সম্ভাব্য নেতৃত্বের পথে প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তবে তাঁর প্রার্থী হওয়া নিয়ে সমালোচনাও আছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি এখনও ফেডারেল এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এই রাইডিংয়ে তাঁর স্থায়ী বসবাস নেই। আর্সকিন স্মিথ অবশ্য বলেছেন, পাশের বিচেস ইস্ট ইয়র্ক এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে স্কারবরো সাউথওয়েস্টের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের মতে, টরন্টোর পূর্বাঞ্চলের রাজনীতি, নগর সমস্যা এবং স্থানীয় ভোটারদের প্রত্যাশা সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
মনোনয়ন প্রত্যাশী আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী কাদিরা জ্যাকসন। তিনি স্থানীয় আইনজীবী ও সাবেক সমাজকর্মী। ২০২৫ সালের অন্টারিও সাধারণ নির্বাচনে তিনি এই একই আসনে ওন্টারিও লিবারেলদের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃতীয় হয়েছিলেন। তাঁর ক্যাম্পেইনের দাবি, তাদের সংগৃহীত প্রায় ৪০০ সদস্যের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নেই। তাঁর দলও সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, শনিবার অতিরিক্ত পরিচয়পত্র নিয়ে এসে সংশ্লিষ্ট সদস্যরা সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন।
কাদিরা জ্যাকসনের ধারণা, কিছু সদস্যপদ হয়তো একসঙ্গে বা স্থানীয় নয় এমন আইপি ঠিকানা থেকে জমা পড়ায় বাতিল হয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর ক্যাম্পেইন স্থানীয়ভাবে ঘরে ঘরে গিয়ে সদস্য সংগ্রহ করেছে। তাঁর ভাষায়, তিনি কঠিন পথেই কাজটি করেছেন। তিনিও দুই ধাপের ইমেইল ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, অনেকেই বুঝতে পারেননি যে সদস্যপদ নিশ্চিত করতে অনলাইনে আরও কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।
আরেক প্রার্থী আহসানুল হাফিজ, যিনি ওন্টারিও জুড়ে ৩০টি ডোমিনো’স পিৎজা স্টোর পরিচালনা করেন। তাঁর ক্যাম্পেইন ম্যানেজার টেড লজকো জানিয়েছেন, তাঁদের সংগৃহীত কিছু সদস্যের নামও চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় পাওয়া যায়নি এবং বিষয়টি দলীয় পর্যায়ে পর্যালোচনার জন্য জানানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, দলের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বাকি প্রশ্নগুলোর সমাধান হবে এবং যোগ্য প্রত্যেক সদস্য ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। ব্যবসায়ী ও সংগঠক হিসেবে আহসানুল হাফিজের পরিচিতি এই মনোনয়ন লড়াইয়ে তাঁকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে।
এদিকে ওন্টারিও এনডিপি ইতোমধ্যে ফাতেমা শাবানকে স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে। তিনি এর আগে ফেডারেল নির্বাচনে এনডিপির প্রার্থী ছিলেন। প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভরা এখনও তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। ফলে লিবারেল মনোনয়ন যিনি পাবেন, তাঁকে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ উপনির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। ডলি বেগমের প্রস্থানের পর এই আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ নতুনভাবে গড়ে উঠছে।
এই মনোনয়ন লড়াইয়ের বড় প্রেক্ষাপট হলো ওন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব সংকট। গত জানুয়ারিতে বনি ক্রম্বি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করার পর থেকে দলটির কোনো স্থায়ী নেতা নেই। জন ফ্রেজার বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৮ সালে ডগ ফোর্ডের প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভদের কাছে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ওন্টারিও লিবারেলরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। দলটি এখন প্রাদেশিক আইনসভায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং গত কয়েক বছরে একাধিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।
ওন্টারিও লিবারেলরা আগামী ২১ নভেম্বর নতুন নেতা নির্বাচন করবে। সেই প্রেক্ষাপটে স্কারবরো সাউথওয়েস্টের মনোনয়ন লড়াই স্থানীয় রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে বড় রাজনৈতিক অর্থ বহন করছে। নেতৃত্বের সম্ভাব্য দৌড়ে আর্সকিন স্মিথের নাম আলোচনায় থাকায় এই আসনের মনোনয়ন জয় তাঁর জন্য ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নেতৃত্বের সম্ভাব্য দৌড়ে সাবেক ফেডারেল ক্যাবিনেট মন্ত্রী দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত নবদীপ বেইনসকেও শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাস্টিন ট্রুডো সরকারের সময় তিনি উদ্ভাবন, বিজ্ঞান ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ফেডারেল রাজনীতি ছাড়ার পর তিনি করপোরেট জগতে প্রভাবশালী অবস্থানে যান এবং রজার্স কমিউনিকেশনসের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার হিসেবে কাজ করেন। রাজনীতি, ব্যবসা, করপোরেট নেতৃত্ব এবং দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির সঙ্গে তাঁর বিস্তৃত যোগাযোগ তাঁকে সম্ভাব্য নেতৃত্বের দৌড়ে একটি ওজনদার নাম করে তুলেছে। তিনি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, ৮ মে রজার্স কমিউনিকেশনসের উচ্চপদস্থ চাকরি ছাড়বেন। রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে তাঁর সম্ভাব্য নেতৃত্বে নামার প্রস্তুতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
আগামী ৯ মে ২০২৬, শনিবার, স্থানীয় Birchmount Park Collegiate Institute-এ মনোনয়ন সভায় দলের সদস্যরা স্কারবরো সাউথওয়েস্টের পরবর্তী ওন্টারিও লিবারেল প্রার্থী নির্বাচন করবেন। ভোটগ্রহণ চলবে সকাল ১১টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত।
তথ্যসূত্র:
The Globe and Mail, মে ২০২৬
Ontario Liberal Party statement See less









