সম্পাদকের পাতা

ডলি বেগমের ঐতিহাসিক জয়

নজরুল মিন্টো

স্কারবরো সাউথওয়েস্টে ডলি বেগমের বিজয় শুধু একটি উপনির্বাচনের ফল নয়, এটি কানাডার কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। ১৩ এপ্রিল ২০২৬ সালের ফেডারেল উপনির্বাচনে লিবারেল প্রার্থী ডলি বেগম ২০,১১৪ ভোট পেয়ে ৬৯.৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। ইলেকশনস কানাডার প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, এ আসনে ১৮৮টির মধ্যে ১৮৮টি পোলের ফল গণনা হয়েছে, অর্থাৎ শতভাগ পোল রিপোর্ট করেছে। নিবন্ধিত ৮৫,৭৯৬ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২৮,৭৭৮ জন, ভোটার উপস্থিতি ৩৩.৫৪ শতাংশ। এ আসনের জনসংখ্যা ১,২৩,২৩২।

ডলি বেগমের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে কনজারভেটিভ প্রার্থী ডায়ানা ফিলিপোভা পেয়েছেন ৫,৩০০ ভোট, যা মোট ভোটের ১৮.৪ শতাংশ। এনডিপি প্রার্থী ফাতিমা শাবান পেয়েছেন ১,৭১৪ ভোট, ৬.০ শতাংশ। গ্রিন পার্টির পূজা মালহোত্রা পেয়েছেন ৭১১ ভোট, ২.৫ শতাংশ। স্বতন্ত্র প্রার্থী এপ্রিল ফ্রান্সিসকো পেয়েছেন ৪৩২ ভোট, ১.৫ শতাংশ। পিপলস পার্টির পিটার কুবাকিস পেয়েছেন ২৬৫ ভোট, ০.৯ শতাংশ। ক্রিশ্চিয়ান হেরিটেজ পার্টির ডেভিড ভেডোভা পেয়েছেন ১৪২ ভোট, ০.৫ শতাংশ। সেন্ট্রিস্ট প্রার্থী লায়াল স্যান্ডার্স পেয়েছেন ১০০ ভোট, ০.৩ শতাংশ। এই ব্যবধান স্পষ্ট করে দিয়েছে, স্কারবরো সাউথওয়েস্টে ডলি বেগম শুধু জয়ী হননি, প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেক পেছনে ফেলে শক্তিশালী জনসমর্থন নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন।


বিজয়ের রাতটি ছিল উৎসবমুখর। ডলি বেগমের জয় উদযাপনের জন্য নগরীর QSSIS ব্যাঙ্কুয়েট হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানস্থলে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। নানান জাতিগোষ্ঠীর মানুষ, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে একসঙ্গে উদযাপন করেছেন এই বিজয়। স্কারবরোর বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতা যেন সেদিন এক মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছিল। সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে ডলি বেগম বলেন, “আজ রাতে আমরা এক নতুন সূচনা উদযাপন করছি।” তিনি এই বিজয় উৎসর্গ করেন তার প্রয়াত স্বামী ব্যারিস্টার রিজুয়ান রহমানকে। তার ভাষণের সময় সমর্থকদের উল্লাসে পুরো হল মুখর হয়ে ওঠে।

স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনটি সাবেক লিবারেল এমপি বিল ব্লেয়ারের পদত্যাগের পর শূন্য হয়েছিল। সেই আসনেই ডলি বেগম নতুন প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হলেন। এই জয় ডলি বেগমের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যাত্রারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তিনি অন্টারিও এনডিপির সাবেক ডেপুটি লিডার ছিলেন।প্রাদেশিক রাজনীতিতে স্কারবরোর মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, স্থানীয় সমস্যার গভীর বোঝাপড়া এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা তাকে বড় সুবিধা দিয়েছে। তার প্রচারণা শুধু দলীয় প্রচারণা ছিল না, অনেকের কাছে এটি ছিল স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব, অভিবাসী সমাজের কণ্ঠস্বর এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতীক। ডলি বেগম অন্টারিও প্রাদেশিক পরিষদে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপিপি হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন। এবার কানাডার কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তিনি নতুন ইতিহাস রচনা করলেন। উত্তর আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন নেত্রী হিসেবে তার এই উত্থান শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, অভিবাসী সমাজের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রারও এক উজ্জ্বল মাইলফলক।

তবে এই উপনির্বাচনের সবচেয়ে বড় জাতীয় তাৎপর্য হলো, ডলি বেগমের বিজয়সহ তিনটি আসনেই লিবারেলদের জয়ের ফলে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সিবিসি নিউজের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কারবরো সাউথওয়েস্টে ডলি বেগম, ইউনিভার্সিটি রোজডেলে ড্যানিয়েল মার্টিন এবং কুইবেকের টেরেবনে তাতিয়ানা অগুস্তের জয় লিবারেলদের আসনসংখ্যা ১৭৪ এ উন্নীত করেছে। এর ফলে হাউস অব কমন্সে কার্নির সরকার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ় অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।

তিনটি উপনির্বাচনের ভোটের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন টেরেবনের লিবারেল প্রার্থী তাতিয়ানা অগুস্তে। তিনি পেয়েছেন ২২,৪৪৫ ভোট, ৪৮.৪ শতাংশ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লক কেবেকোয়ার নাথালি সিনক্লেয়ার দেগানিয়ে পেয়েছেন ২১,৭১৪ ভোট, ৪৬.৮ শতাংশ। ব্যবধান ছিল তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল বড়। গত নির্বাচনে টেরেবন আসনটি এক ভোটের ব্যবধান, পুনর্গণনা এবং আদালতের সিদ্ধান্তের কারণে জাতীয় আলোচনায় ছিল। এবার অগুস্তের জয় কুইবেকে কার্নির প্রভাব এখনও কার্যকর আছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।

ভোটসংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন ডলি বেগম। তিনি পেয়েছেন ২০,১১৪ ভোট। তবে শতাংশের হিসাবে তিন বিজয়ীর মধ্যে সবচেয়ে বড় জয় তারই। ৬৯.৯ শতাংশ ভোট পাওয়া মানে স্কারবরো সাউথওয়েস্টে তিনি শুধু দলীয় সমর্থন নয়, বৃহত্তর সামাজিক আস্থা অর্জন করেছেন। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন ইউনিভার্সিটি রোজডেলের ড্যানিয়েল মার্টিন। তিনি পেয়েছেন ১৯,৯৬১ ভোট, ৬৪.৪ শতাংশ। তার প্রতিদ্বন্দ্বী এনডিপির সেরেনা পার্ডি পেয়েছেন ৫,৮৬৯ ভোট, ১৮.৯ শতাংশ এবং কনজারভেটিভ ডন হজসন পেয়েছেন ৩,৮৪৩ ভোট, ১২.৪ শতাংশ।


লিবারেলদের এই সাফল্যের পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, মার্ক কার্নির নেতৃত্বে লিবারেলরা নিজেদের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার সময় দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাঁচজন বিরোধী রাজনীতিক লিবারেল দলে যোগ দেওয়ায় কার্নির সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ সহজ হয়েছে। তৃতীয়ত, টরন্টোর দুই আসনেই লিবারেলদের ঐতিহাসিক শক্ত ঘাঁটি ছিল, আর স্কারবরো সাউথওয়েস্টে ডলি বেগমের স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা সেই দলীয় ভিত্তিকে আরও প্রসারিত করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এই জয়ের ফলে কার্নির লিবারেল সরকার বিরোধী দলের সমর্থন ছাড়াই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীনতা পাবে।

অন্যদিকে কনজারভেটিভ নেতা পিয়ের পলিয়েভ এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, লিবারেলরা সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বরং দলবদলের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও কানাডার সংসদীয় ব্যবস্থায় দলবদল বৈধ, আর তিনটি উপনির্বাচনে ভোটারদের রায় কার্নির সরকারকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।

ডলি বেগমের জয় স্কারবরো সাউথওয়েস্টের মানুষের আস্থা, অভিবাসী সমাজের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস এবং নারী নেতৃত্বের দৃঢ় উপস্থিতির এক উজ্জ্বল প্রকাশ। একই সঙ্গে এই বিজয় কানাডায় জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প। কানাডার বহুসাংস্কৃতিক গণতন্ত্রে এই উপনির্বাচনের ফল নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। অভিনন্দন ডলি বেগম। অভিনন্দন মার্ক কার্নি। শুভ হোক ডলি বেগমের নতুন যাত্রা। আগামী দিনে তিনি আরও বড় চমক দেবেন, এই আশাবাদ ব্যক্ত করি।

তথ্যসূত্র
Elections Canada (১৪ এপ্রিল ২০২৬)
CBC News (১৪ এপ্রিল ২০২৬)
Reuters (১৪ এপ্রিল ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language