
কেউ বলেন, আমি বাঙালি। কেউ বলেন, আমি বাংলাদেশি। কেউ বলেন, আমি সিলেটি। আবার কেউ একই সঙ্গে সব পরিচয়ই ধারণ করেন। এই বহুস্তর পরিচয়ের ভেতর কোনো সংঘাত থাকার কথা নয়। বরং এখানেই মানুষের ইতিহাসের সৌন্দর্য। মানুষ যেমন নদীর মতো, তার পরিচয়ও তেমন। কোথাও সে সুরমা, কোথাও কুশিয়ারা, কোথাও বরাক। নাম বদলায়, তীর বদলায়, স্রোত বদলায়, কিন্তু জলধারা একই জীবনকে বহন করে।
এই জায়গা থেকেই “সিলেটি না বেঙ্গলি” প্রশ্নটি আসে। এখানে “বনাম” শব্দটি কোনো বিরোধের ঘোষণা নয়, বরং প্রচলিত এক বিভ্রান্তিকে ইতিহাসের আলোয় বোঝার চেষ্টা। প্রথমে প্রশ্নটি খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ইতিহাস, আসাম ও বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র, ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য, ১৯৪৭ সালের গণভোট, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক উত্তাপ, ১৯৬১ সালের বরাকের রক্তাক্ত ভাষা সংগ্রাম, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রবাসী সিলেটিদের বিস্ময়কর অভিযাত্রা।
অনেকেরই প্রশ্ন, সিলেট অঞ্চলের অধিবাসীরা কেন তাঁদের এলাকার বাইরের লোকজনকে “বেঙ্গলি” বলে থাকেন। তাঁরা জানতে চান, সিলেটিরা কি তাহলে বেঙ্গলি নন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে “বেঙ্গলি” শব্দটির কথ্য ব্যবহার এবং সিলেটের প্রশাসনিক ইতিহাসকে পাশাপাশি দেখতে হবে। সিলেটিদের কথ্য ব্যবহারে “বেঙ্গলি” বলতে সাধারণত বাঙালি জাতিসত্তা বা বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়কে অস্বীকার করা হয় না। ঐতিহাসিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে “বেঙ্গলি” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি বা বাংলা প্রদেশের মানুষের অর্থে। সিলেট দীর্ঘদিন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অংশ হলেও প্রশাসনিকভাবে আসামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে সিলেটিদের কাছে “বেঙ্গলি” শব্দটি অনেক সময় বাংলা প্রদেশের মানুষ অথবা সিলেটের বাইরের বাঙালি বোঝানোর কথ্য পরিভাষা হয়ে ওঠে। এই ব্যবহারের সঙ্গে জাতিগত অস্বীকৃতির সম্পর্ক নেই। এটি ইতিহাস, প্রশাসনিক বিভাজন ও সামাজিক অভ্যাসের ফল।
সিলেট মানে শুধু একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয়। বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে, মেঘালয়, আসাম ও ত্রিপুরার সীমানা ঘেঁষে থাকা এই জনপদ বাংলার ভেতরে থেকেও উত্তর পূর্ব ভারতের পাহাড়ি ও নদীবহুল সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। খাসিয়া ও জৈন্তা পাহাড়ের ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই ভূমি যেন এক কাব্যিক ভূগোল। বরাক, সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, জাদুকাটা, পিয়াইন, ধলাই ও খোয়াই নদী শুধু জলধারা নয়, তারা বহন করে মানুষের জীবন, বাণিজ্য, যাত্রা এবং ইতিহাসের ধ্বনি।
প্রাচীন শ্রীহট্ট ছিল বঙ্গীয় সভ্যতার পূর্বাঞ্চলীয় এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এই অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহু ধারার মিলনে সমৃদ্ধ হয়েছে। বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরুষ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পিতা জগন্নাথ মিশ্র ও মাতা শচীদেবীর আদি নিবাস ছিল সিলেটে। পরবর্তী সময়ে মুসলিম শাসনামলে হজরত শাহজালাল ও তাঁর সঙ্গীদের আগমন সিলেটের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করে। পীর আউলিয়ার দরগাহ, সুফি সাধনা, বৈষ্ণব ভক্তিধারা, লোকবিশ্বাস, কৃষিজীবন, নদীভিত্তিক বাণিজ্য এবং মরমি সংগীত মিলিয়ে সিলেট ধীরে ধীরে এক স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ভূগোল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। হাসন রাজা, রাধারমন দত্ত, শীতালং শাহ ও শাহ আবদুল করিমের মতো মরমিয়া ধারার শিল্পীরা শুধু সিলেটের গর্ব নন, তাঁরা সমগ্র বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।
কিন্তু ঔপনিবেশিক আমলে সিলেটের পরিচয় এক জটিল রাজনৈতিক পথে প্রবেশ করে। ১৮২৪ সালে প্রথম অ্যাংলো বার্মিজ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশরা আসামের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে এগোয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন সিলেটকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে পৃথক করে নবগঠিত আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করে। এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক ছিল না। এটি মানুষের পরিচয়, ভাষা, শিক্ষা, আদালত, চাকরি এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
সিলেটের মানুষ তখন এক অদ্ভুত অবস্থায় পড়ে। ভাষা ও সংস্কৃতিতে তারা বাঙালি, কিন্তু প্রশাসনিকভাবে আসামের অধিবাসী। বাংলা তাদের সাহিত্য, শিক্ষা ও ঘরের ভাষা, অথচ প্রাদেশিক মানচিত্রে তারা বাংলার বাইরে। বাংলা প্রদেশের মানুষ তাঁদের অনেক সময় আসামের লোক হিসেবে দেখতেন। আবার আসামের মূলধারার অহমিয়া সমাজও সিলেটিদের পুরোপুরি নিজেদের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেনি। ফলে সিলেটিদের পরিচয়ে জন্ম নেয় এক দ্বৈততা। তাঁরা বাঙালি, কিন্তু বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্রে নেই। তাঁরা আসামের অধিবাসী, কিন্তু অহমিয়া নন।
এই দ্বৈত অবস্থান থেকেই সিলেটি আত্মপরিচয় আরও শক্তিশালী হয়। “আমরা সিলেটি” এই উচ্চারণ কেবল আঞ্চলিক গর্ব নয়, বরং ইতিহাসের দীর্ঘ টানাপোড়েনের এক উত্তর। একদিকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির টান, অন্যদিকে আসাম প্রশাসনের অভিজ্ঞতা। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে সিলেটিরা নিজেদের নাম আলাদা করে উচ্চারণ করতে শেখে।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় পূর্ববঙ্গ ও আসামকে একত্র করে নতুন প্রদেশ গঠন করা হলে সিলেট আবার বাংলার সঙ্গে প্রশাসনিকভাবে ঘনিষ্ঠ হয়। কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় এবং ১৯১২ সালের নতুন প্রশাসনিক বিন্যাসে সিলেট আবার আসাম প্রদেশের অংশ হয়ে থাকে। এই যাওয়া আসা সিলেটের মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলে। মানচিত্র বদলায়, কিন্তু মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি বদলায় না। প্রশাসন বদলায়, কিন্তু আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন মুছে যায় না।
১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন সিলেট সফর করেন, তখন সিলেট ছিল আসামের অন্তর্ভুক্ত। সিলেটবাসী তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন আপনজন হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
“বাংলার প্রান্তসীমা হতে নির্বাসিতা তুমি,
সুন্দরী শ্রীভূমি!”
এই পঙক্তি শুধু কাব্যিক আবেগ নয়। এটি সিলেটের ঐতিহাসিক বেদনার ভাষা। “নির্বাসিতা” শব্দটির ভেতর ধরা পড়ে এমন এক জনপদের অনুভব, যা ভাষা ও সংস্কৃতিতে বাংলার অন্তর্গত, অথচ প্রশাসনিক ভাগ্যের কারণে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন।
১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ সিলেটের ইতিহাসে আরেক কঠিন মোড়। ৬ ও ৭ জুলাই ১৯৪৭ সালে সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্ন ছিল, সিলেট কি আসামের সঙ্গে ভারতীয় ইউনিয়নে থাকবে, নাকি পূর্ববঙ্গের সঙ্গে পাকিস্তানে যুক্ত হবে। গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পূর্ববঙ্গ তথা পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার পক্ষে ভোট দেন। কিন্তু ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও সিলেটের চূড়ান্ত অবস্থান তখনও সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়নি।
এই কারণে রেডক্লিফের চূড়ান্ত সীমান্ত ঠিক করার আগে পাকিস্তানের প্রাথমিক মানচিত্রে সিলেট অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইতিহাসের এই অদ্ভুত পরিস্থিতি সিলেটিদের মনে আরেকবার মনে করিয়ে দেয়, তারা যেন মানচিত্রের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক জনপদ। পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে গেছে, ভারত স্বাধীন হয়ে গেছে, কিন্তু সিলেটের ভাগ্য চূড়ান্ত হতে আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। রেডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড প্রকাশিত হয় ১৭ আগস্ট ১৯৪৭ সালে।
বর্তমান সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ পূর্ববঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যদিকে করিমগঞ্জের বড় অংশসহ বরাক উপত্যকার কাছাড় ও হাইলাকান্দি অঞ্চলের বহু সিলেটি ভাষাভাষী মানুষ ভারতের আসামে থেকে যান। সীমান্ত তৈরি হয়, কিন্তু ভাষা, আত্মীয়তা, খাদ্যরীতি ও সামাজিক অভ্যাস সীমান্ত মানে না। ফলে আজও বৃহত্তর সিলেটি সাংস্কৃতিক পরিসর শুধু বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে সীমাবদ্ধ নয়। তা বিস্তৃত বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মনিপুর, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিশ্বের নানা প্রবাসী নগরে।
এই প্রেক্ষাপটে সিলেটিদের “বেঙ্গলি” শব্দ ব্যবহারের ইতিহাস আরও স্পষ্ট হয়। এখানে “বেঙ্গলি” বলতে বাঙালি জাতিসত্তা নয়, বরং ঐতিহাসিক বেঙ্গল প্রদেশের মানুষ বোঝানোর একটি কথ্য অভ্যাস কাজ করেছে। আসামে থাকা সিলেটিদের পরিচয় সংকট আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাঁরা ভাষায় বাঙালি, সংস্কৃতিতে সিলেটি, প্রশাসনিকভাবে ভারতীয় আসামের নাগরিক। এই দীর্ঘ পরিচয় সংকটের শিকড় ঔপনিবেশিক মানচিত্রে।
ভাষার প্রশ্নে সিলেটের ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ। সিলেটি কথ্যরীতি বাংলা ভাষা পরিবারের একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রূপ। এর ধ্বনি, শব্দভান্ডার, উচ্চারণ ও বাক্যগঠনে এমন বৈশিষ্ট্য আছে, যা একে অন্য অনেক আঞ্চলিক বাংলার রূপ থেকে আলাদা করে। কেউ একে বাংলা ভাষার উপভাষা বলেন, কেউ স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে দেখেন। এই বিতর্ক ভাষাবিজ্ঞানীদের। কিন্তু সামাজিক সত্য হলো, সিলেটি ভাষা সিলেটিদের আত্মপরিচয়ের গভীর অংশ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিলেটি নাগরি লিপির গৌরব। বাংলা ভাষার লিখিত ঐতিহ্যে সাধারণত আমরা বাংলা লিপির কথা বলি। কিন্তু সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘদিন সিলেটি নাগরি নামে একটি স্বতন্ত্র লিপি ব্যবহৃত হয়েছে। এতে লোকজ কাব্য, পুঁথি, আধ্যাত্মিক গান, ধর্মীয় উপদেশ, প্রবাদ ও নৈতিক সাহিত্য লেখা হতো। উনিশ শতকে এই লিপিতে বই ছাপা হয়েছে।
এটি বাংলা ভাষা সংস্কৃতির ইতিহাসেও গর্ব করার মতো এক বিরল ঘটনা। বৃহত্তর বাংলা ভাষাপরিসরের ভেতরে একদিকে প্রমিত বাংলা লিপি, অন্যদিকে সিলেটি ভাষা ও লোকসাহিত্যের জন্য ব্যবহৃত সিলেটি নাগরি। আজ নাগরি লিপি দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হয় না, কিন্তু এটি সিলেটি সংস্কৃতির এক অমূল্য উত্তরাধিকার। গবেষকরা পুরোনো পুঁথি সংগ্রহ করছেন, ডিজিটাল ফন্ট তৈরি করছেন, ইউনিকোডে এর স্থান হয়েছে। এই পুনর্জাগরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষার ইতিহাস শুধু রাষ্ট্রভাষার ইতিহাস নয়, মানুষের ঘরের ভাষা, মাটির ভাষা ও লোকজ জ্ঞানের ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সিলেটের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক গবেষক ও লেখকের মতে, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সিলেট ছিল প্রাথমিক আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার। ১৯৪৭ সালের শেষ দিক থেকেই সিলেটে ভাষা প্রশ্নে অসন্তোষ প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সিলেটের ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের রক্তাক্ত আত্মত্যাগ ভাষা আন্দোলনকে চূড়ান্ত ঐতিহাসিক রূপ দেয়।
এরপর আসে বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের শিলচর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনরত মানুষের ওপর গুলি চালানো হয়। পুলিশের গুলিতে ১১ জন ভাষাশহিদ প্রাণ দেন। তাঁদের মধ্যে কমলা ভট্টাচার্যসহ অনেকেই ছিলেন বৃহত্তর সিলেটি ও বরাকের বাংলা ভাষাভাষী সমাজের সন্তান। এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, সিলেটি পরিচয় কখনও বাংলা ভাষার বিরোধী নয়। বরং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার ইতিহাসে সিলেটি ও বরাকবাসীর রক্ত মিশে আছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সিলেট ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানি ছিলেন সিলেটের বীর সন্তান। তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামরিক সংগঠনকে ঐতিহাসিক মর্যাদা দেয়।
ইতিহাসবিদগণ তেলিয়াপাড়াকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সামরিক সদর দপ্তরের মর্যাদায় দেখেন। হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানের বাংলোতে ৪ এপ্রিল ১৯৭১ সালে সামরিক কর্মকর্তাদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠক থেকেই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত সামরিক রূপ পেতে শুরু করে। ফলে সিলেট মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সামরিক যাত্রারও এক ঐতিহাসিক ভূমি।
সিলেটের অবদান শুধু ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়। প্রবাসের ইতিহাসে সিলেটিরা পথপ্রদর্শক। যখন বাংলার বহু অঞ্চলের মানুষ বিদেশযাত্রায় ততটা অভ্যস্ত ছিলেন না, যখন “ঘরকুনো বাঙালি” কথাটি সামাজিক ধারণা হিসেবে প্রচলিত ছিল, তখন সিলেটিরা অভিবাসনের নানা ধারায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশ জাহাজে লাস্কার হিসেবে কাজ করা বহু মানুষ ছিলেন সিলেট অঞ্চলের। পরে তাঁদের উত্তরসূরিরা যুক্তরাজ্যে বসতি গড়ে তোলেন।
যুক্তরাজ্যে সিলেটিরা শুধু অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে থাকেননি। তাঁরা রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, কমিউনিটি সংগঠন, সংবাদমাধ্যম, স্থানীয় রাজনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইস্ট লন্ডন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টারসহ যুক্তরাজ্যের বহু শহরে সিলেটিরা বাংলা পরিচয়কে দৃশ্যমান করেছেন। আজ যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার, কাউন্সিল, মেয়রাল পদ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বহু মানুষের সাফল্যের পেছনে সিলেটি সমাজের শক্তিশালী উপস্থিতি অনস্বীকার্য। কমিউনিটি পর্যায়ে প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে সিলেটি বংশোদ্ভূত মেয়র ও কাউন্সিলরদের সংখ্যা কয়েক শতাধিক। কেউ কেউ এই সংখ্যা ৫০০ এর বেশি বলে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও সিলেটিদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে “ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট” নামে পরিচিত দক্ষিণ এশীয় খাবারের ব্যবসায় বহু সিলেটি উদ্যোক্তা পথিকৃৎ ভূমিকা রাখেন। কমিউনিটি ইতিহাসে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম দিককার ভারতীয় রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতির বিস্তারে সিলেটিদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অনেক গবেষক দেখিয়েছেন, “ইন্ডিয়ান” নামের আড়ালে বহু রেস্টুরেন্টের শ্রম, রান্না ও ব্যবসা পরিচালনায় ছিলেন সিলেটি অভিবাসীরা।
কানাডায়ও সিলেটিদের পথিকৃৎ ভূমিকা স্মরণযোগ্য। টরন্টোর প্রবাসী ইতিহাসে Royal Bengal নামে একটি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের কথা প্রবীণ কমিউনিটি সদস্যরা উল্লেখ করেন, যা একজন সিলেটি উদ্যোক্তার হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে জানা যায়। ১৯৭১ সালে এই রেস্টুরেন্টকে ঘিরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কানাডার প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপিপি এবং প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফেডারেল এমপি ডলি বেগম সিলেটেরই মেয়ে।
প্রবাসে সিলেটিরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে সফল হননি। তাঁরা ভাষা, সংস্কৃতি, পারিবারিক কাঠামো, খাদ্যসংস্কৃতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব রেখেছেন। তাঁরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, গ্রামে বাড়ি করেছেন, স্কুল মসজিদ মাদ্রাসা হাসপাতাল নির্মাণে সহায়তা করেছেন, আবার নতুন দেশে নাগরিক নেতৃত্বও গড়ে তুলেছেন। প্রবাসে বাংলা সংবাদমাধ্যম, রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিষ্ঠায় সিলেটি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। সিলেটি প্রবাসী জীবন তাই শুধু অভিবাসনের গল্প নয়। এটি শিকড় ও বিশ্বায়নের মিলিত ইতিহাস।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের আলোকে “সিলেটি বনাম বেঙ্গলি” প্রশ্নটি নতুনভাবে দেখা দরকার। সিলেটিরা বাঙালি নন, এমন কথা ইতিহাস সমর্থন করে না। আবার সিলেটিদের আলাদা আঞ্চলিক পরিচয় নেই, সেটিও সত্য নয়। সিলেটিরা বাঙালি পরিচয়ের ভেতরে এক স্বতন্ত্র ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সত্তা বহন করেন।
তাই “সিলেটি না বেঙ্গলি” বলে কোনো সংঘাত তৈরি করা ইতিহাসের প্রতি অন্যায়। বরং বলা উচিত, সিলেটি পরিচয় বাঙালি পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে। সিলেট বাংলা ভাষাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র উচ্চারণ, দিয়েছে নাগরি লিপির বিরল ঐতিহ্য, দিয়েছে মরমি সংগীত, দিয়েছে ভাষা সংগ্রামের অধ্যায়, দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমি, আর প্রবাসে বাংলা পরিচয়ের পতাকা বহন করেছে প্রথম সারির অভিযাত্রী হয়ে।
এনএন/ ৭ জুন ২০২৬









