সম্পাদকের পাতা

মিশিগানে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের মেডিকেয়ার কেলেঙ্কারিতে এক বাংলাদেশি

নজরুল মিন্টো

আমেরিকান স্বপ্নের গল্প সাধারণত শুরু হয় পরিশ্রম দিয়ে। কেউ আসে পড়াশোনার জন্য, কেউ আসে নিরাপদ জীবনের আশায়, কেউ আসে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বড় অংশই সেই স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলেছেন সততা, শ্রম ও মেধার আলোয়। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও জনসেবাসহ নানা ক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন সম্মানের সঙ্গে। কিন্তু সেই আলোর পাশে কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনা এসে দাঁড়ায়, যা শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, একটি কমিউনিটির বুকেও অস্বস্তির ছাপ রেখে যায়।

তেমনই এক ঘটনা মিশিগানের ডেট্রয়েট অঞ্চলে। নাম মাশিয়াত রশিদ। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে এসে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবসার নামে এমন এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, যার বাইরে ছিল চিকিৎসার সাইনবোর্ড, আর ভেতরে চলত অদৃশ্য অর্থ শিকারের আয়োজন। রোগীরা আসতেন ব্যথা নিয়ে, কেউ আসতেন ওষুধের আশায়, কেউ ছিলেন দুর্বল, কেউ নির্ভরশীল। সেই দুর্বলতাকেই ব্যবহার করা হতো বিল আদায়ের উপকরণ হিসেবে।

এটি কোনো সাধারণ আর্থিক জালিয়াতির গল্প নয়। এখানে চিকিৎসা, ওপিওড সংকট, ভুয়া বিল, মানি লন্ডারিং, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং অভিবাসী সাফল্যের মুখোশ এক জায়গায় এসে মিশেছে। প্রশ্নটি তাই শুধু আইনি নয়, নৈতিকও। সেবা দেওয়ার নামে একজন মানুষ কত দূর পর্যন্ত মানুষের দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে পারে?

মার্কিন আদালত ও বিচার বিভাগের নথি বলছে, মাশিয়াত রশিদ ছিলেন Tri County Wellness Group নামের একটি বিস্তৃত স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী। তদন্তকারীদের চোখে ধরা পড়ার পর এই নেটওয়ার্ক আর সাধারণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অন্যতম আলোচিত জালিয়াতি, ওপিওড বিতরণ এবং অর্থ পাচার মামলার কেন্দ্রবিন্দু। ২০১৭ সালে গ্রেপ্তার, ২০১৮ সালে অপরাধ স্বীকার এবং ২০২১ সালে ১৫ বছরের কারাদণ্ড, এই ধারাবাহিকতাই খুলে দেয় প্রতারণার পুরো চিত্র।

মেডিকেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচি। মূলত ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের চিকিৎসা সহায়তার জন্য এই তহবিল গড়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় পরিচালিত সেই ব্যবস্থাকেই মাশিয়াত রশিদ ও তাঁর সহযোগীরা অবৈধ আয়ের উৎসে পরিণত করেছিলেন।

মার্কিন বিচার বিভাগ, Department of Justice বা DOJ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাশিয়াত রশিদ মিশিগান ও ওহাইওতে একাধিক পেইন ক্লিনিক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তদন্তে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রেসক্রিপশনের বিনিময়ে রোগীদের ব্যয়বহুল ও চিকিৎসাগতভাবে অপ্রয়োজনীয় ব্যাক ইনজেকশন নিতে বাধ্য করা হতো। চিকিৎসার প্রয়োজনের চেয়ে মেডিকেয়ার থেকে বেশি বিল আদায়ই হয়ে উঠেছিল এই ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।

DOJ জানায়, পুরো স্কিমটি প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তদন্তে উঠে আসে, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা পদ্ধতি, ভুয়া বিলিং, অবৈধ রেফারেল, কিকব্যাক এবং মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ গোপন করা হয়েছিল। মাশিয়াত রশিদ নিজে চিকিৎসক ছিলেন না। তারপরও তিনি চিকিৎসক ও সহযোগীদের ব্যবহার করে এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে বৈধ স্বাস্থ্যসেবার আড়ালে চলছিল বিলিং নির্ভর প্রতারণা।

২০১৭ সালে গ্রেপ্তারের পর ফেডারেল তদন্তের মুখে ২০১৮ সালে মাশিয়াত রশিদ আদালতে অপরাধ স্বীকার করেন। স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতি, ওয়্যার ফ্রড ষড়যন্ত্র এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে তাঁর দোষ স্বীকারের মধ্য দিয়ে এই নেটওয়ার্কের অপরাধচিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আদালতের কার্যক্রমে দেখা যায়, চক্রটি শুধু মেডিকেয়ারের অর্থ আত্মসাৎ করেনি, যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ ওপিওড সংকটকেও আরও জটিল করেছে। ব্যথা বা ওষুধনির্ভরতার দুর্বল অবস্থায় থাকা বহু রোগীকে এই চক্র অর্থ আয়ের উপকরণে পরিণত করেছিল।

অভিযোগপত্রে উঠে আসে মাশিয়াত রশিদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের চিত্র। প্রতারণার অর্থের সঙ্গে যুক্ত ছিল নগদ অর্থ, বাণিজ্যিক ও আবাসিক রিয়েল এস্টেট, বিলাসবহুল পোশাক, দামি ঘড়ি, ল্যাম্বরগিনি ও রোলস রয়েস ঘোস্টের মতো গাড়ি এবং ডেট্রয়েট অঞ্চলের প্রাসাদোপম বাড়ি। অর্থাৎ রোগীর কষ্ট ও করদাতার অর্থের ওপর দাঁড়িয়েছিল তাঁর আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন।

২০২১ সালের ৩ মার্চ মিশিগানের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালত মাশিয়াত রশিদকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। একই সঙ্গে তাঁকে মেডিকেয়ারের জন্য ৫১ মিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ ফেরত দিতে বলা হয়। আদালত আরও নির্দেশ দেয়, স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত ১১.৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ, বাণিজ্যিক ও আবাসিক রিয়েল এস্টেট এবং অন্যান্য সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে।

এই মামলায় মাশিয়াত রশিদ একা ছিলেন না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই স্কিমের সঙ্গে সম্পর্কিত মামলায় ২১ জনের বেশি আসামি দোষী সাব্যস্ত হন, তাঁদের মধ্যে ১২ জন ছিলেন চিকিৎসক। ফলে ঘটনাটি কোনো ব্যক্তির একক প্রতারণা নয়, বরং একটি বিস্তৃত অপরাধচক্রের চিত্র তুলে ধরে।

সর্বশেষ প্রাপ্ত আদালত নথি থেকে জানা যায়, ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। সরকার তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের উদ্যোগ নেয়। নথিতে উল্লেখ আছে, ৫১ মিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণের বিপরীতে তিনি খুব সামান্য অর্থ পরিশোধ করেছেন। ফলে সাজা ঘোষণার কয়েক বছর পরও অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

বিদেশের মাটিতে সাফল্য শুধু অর্থ, বাড়ি, গাড়ি বা সামাজিক পরিচিতির নাম নয়। তা তখনই সম্মানজনক হয়ে ওঠে, যখন তার ভিত্তি থাকে সততা, নৈতিকতা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায়। মাশিয়াত রশিদের কাহিনি দেখিয়েছে, প্রতারণার অর্থে বিলাসিতা কেনা যায়, কিন্তু মর্যাদা কেনা যায় না। আমেরিকান স্বপ্নের আসল সৌন্দর্য অর্থে নয়, চরিত্রে।

তথ্যসূত্র:
U.S. Department of Justice
United States District Court, Eastern District of Michigan
The Detroit News


Back to top button
🌐 Read in Your Language