সম্পাদকের পাতা

সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে অন্টারিওর তিন উপনির্বাচন

নজরুল মিন্টো

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড আগামী ৫ আগস্ট স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট, হ্যামিল্টন ইস্ট–স্টোনি ক্রিক এবং ইয়র্ক–সিমকো আসনে উপনির্বাচনের ঘোষণা দিতে পারেন। ভোট গ্রহণ হতে পারে ৩ সেপ্টেম্বর। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই প্রার্থী বাছাই ও প্রচারের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।

সাবেক এনডিপি এমপিপি ডলি বেগম এবং প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক মন্ত্রী ক্যারোলিন মালরোনির পদত্যাগে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট ও ইয়র্ক–সিমকো আসন দুটি শূন্য হয়েছে। পিসি পার্টির আরেক মন্ত্রী নিল লামসডেন ৪ আগস্ট রাজনীতি থেকে অবসর নিলে শূন্য হবে হ্যামিল্টন ইস্ট–স্টোনি ক্রিক আসনটিও। তবে তিন আসনের রাজনৈতিক চরিত্র এক নয়। হ্যামিল্টন ইস্ট–স্টোনি ক্রিকে এনডিপি পুরোনো ঘাঁটি ফিরে পেতে চায়, ইয়র্ক–সিমকোতে পিসি পার্টি নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, আর স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে তৈরি হয়েছে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

তবে তিন আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিচ্ছে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট। সেখানে প্রার্থী, দলীয় আনুগত্য, অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব এবং ডলি বেগমের রাজনৈতিক অবস্থান মিলিয়ে একটি জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

পিসি পার্টির প্রার্থী পারিবারিক চিকিৎসক ডা. নূর তরুণ। গ্রেটার টরন্টো এলাকায় তাঁর মালিকানায় ছয়টি চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে তিনি একই আসনে কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী ছিলেন। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জনঅসন্তোষের এই সময়ে পিসি পার্টি তাঁর চিকিৎসক পরিচয় ও পেশাগত অভিজ্ঞতাকে নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগাতে চাইছে।

লিবারেল প্রার্থী আহসানুল হাফিজ একজন ব্যবসায়ী। তাঁর মালিকানায় রয়েছে ৩০টি ডমিনোজ পিৎজা আউটলেট। দলীয় মনোনয়নের চূড়ান্ত দফার ভোটে তিনি সাবেক ফেডারেল লিবারেল এমপি নাথানিয়েল এরস্কিন-স্মিথকে ১৯ ভোটে পরাজিত করেন।

পিসি ও লিবারেল, দুই দলের প্রার্থীই বাংলাদেশি-কানাডীয় কমিউনিটির সদস্য। ফলে কমিউনিটির সব ভোট কোনো একজন প্রার্থীর দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কে কতটা পরিচিত, কোন দলের সংগঠন বেশি শক্তিশালী এবং কার প্রচার সাধারণ ভোটারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়, তার ওপরই ফলাফল অনেকটা নির্ভর করবে।

এনডিপির প্রার্থী ভাড়াটেদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ফাতিমা শাবান। গত বসন্তে একই আসনের ফেডারেল উপনির্বাচনেও তিনি এনডিপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেই নির্বাচনে লিবারেল প্রার্থী ডলি বেগম ৬৯ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন; ফাতিমা শাবানের ভোট ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

তবে ফেডারেল ও প্রাদেশিক নির্বাচনের হিসাব এক নয়। ডলি বেগমের নেতৃত্বে স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের গত তিনটি প্রাদেশিক নির্বাচনে জয় পেয়েছিল এনডিপি। ফলে আসনটিতে দলটির সংগঠন ও সমর্থনের ভিত্তি এখনো রয়েছে। আবাসন, ভাড়াটেদের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে সামনে রেখে জোরালো প্রচার চালাতে পারলে ফাতিমা শাবান এনডিপির আগের সমর্থনের একটি অংশ আবার নিজের দিকে টানতে পারেন।

এই আসনে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটি ডলি বেগমকে ঘিরে। এনডিপি আশা করছে, তাদের সাবেক সহকর্মী প্রাদেশিক উপনির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকবেন। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন লিবারেল নেতা জন ফ্রেজার প্রত্যাশা করছেন, আহসানুল হাফিজের পক্ষে প্রচারে নামবেন তিনি। ফ্রেজারের বক্তব্য সরাসরি: “লিবারেলরা লিবারেলদের সহায়তা করে।”

ডলি বেগম এখনো তাঁর সিদ্ধান্ত জানাননি। তিনি যদি লিবারেল প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামেন, তবে এনডিপির সঙ্গে তাঁর পুরোনো সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হবে। আর নিরপেক্ষ থাকলে লিবারেলদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলতে পারে, দলের প্রার্থীকে সহায়তায় তিনি কেন এগিয়ে এলেন না। অর্থাৎ প্রচারে নামা কিংবা দূরে থাকা, দুই সিদ্ধান্তেরই রাজনৈতিক অর্থ রয়েছে।

গ্রিন পার্টি স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে সাবেক পৌর কর্মকর্তা মার্ক বেকেরিংকে প্রার্থী করেছে। ২০২৫ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনেও তিনি একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। চার প্রধান দল তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করায় আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগেই সেখানে লড়াইয়ের রূপরেখা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেছে।

হ্যামিল্টন ইস্ট–স্টোনি ক্রিক আসনে লিবারেল পার্টি হাইনো ডোসিংকে প্রার্থী করেছে। ২০২৫ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন।

হ্যামিল্টন ইস্ট–স্টোনি ক্রিক আসনে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৭ সালে। ২০১১ সাল থেকে টানা তিন নির্বাচনে জয় পেয়ে এনডিপি এটিকে নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছিল। কিন্তু কানাডিয়ান ফুটবল লিগের সাবেক তারকা নিল লামসডেন ২০২২ সালে জয়ী হয়ে আসনটি পিসি পার্টির দখলে নেন। সর্বশেষ নির্বাচনে এনডিপি তৃতীয় স্থানে নেমে গেলেও দলটি এখন পুরোনো আসন পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেখছে। তাদের প্রার্থী এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

এই আসনে লড়াই শুধু প্রার্থী বা দলের জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনসংকটের পাশাপাশি ফোর্ড সরকারের সাম্প্রতিক ব্যয়বিতর্কও প্রচারে জায়গা পাবে। হোটেল ব্যয় নিয়ে সমালোচনার মুখে স্ট্যান চোর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ এবং ২ কোটি ৮৯ লাখ ডলারে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ কিনে পরে তা বিক্রি করার ঘটনাও ভোটারদের সামনে তুলে ধরতে চাইবে লিবারেল ও এনডিপি।

হ্যামিল্টনের মতো শ্রমজীবী মানুষের এলাকায় এসব প্রশ্ন সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। তবে অসন্তোষকে ভোটে পরিণত করতে হলে বিরোধীদের বিশ্বাসযোগ্য প্রার্থী এবং সুসংগঠিত প্রচার দুটিই প্রয়োজন হবে। শুধু সরকারের ভুলের ওপর ভর করে হারানো আসন ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

ইয়র্ক–সিমকোর চিত্র তুলনামূলকভাবে সরল। এটি অন্টারিওতে পিসি পার্টির সবচেয়ে নিরাপদ আসনগুলোর একটি। সেখানে ইস্ট গুইলিম্বারির টাউন কাউন্সিলর সুসান লাহেইকে সরাসরি দলীয় প্রার্থী করেছেন প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড। পদত্যাগী এমপিপি ক্যারোলিন মালরোনিও তাঁর নাম সুপারিশ করেছিলেন।

লাহেই স্থানীয় পিসি নির্বাচনী সমিতির সাবেক সভাপতি এবং দীর্ঘদিনের দলীয় কর্মী। ফলে এলাকার দলীয় সংগঠন ও স্থানীয় রাজনীতি তাঁর পরিচিত। এই আসনে নতুন বা অপরিচিত কাউকে নিয়ে ঝুঁকি না নিয়ে পরীক্ষিত একজন দলীয় কর্মীর ওপরই আস্থা রেখেছেন ফোর্ড।

লিবারেল পার্টি সেখানে জর্জিনা ও ইয়র্ক রিজিওনের কাউন্সিলর নাওমি ডেভিসনকে প্রার্থী করেছে। এনডিপি ও গ্রিন পার্টি এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। ইয়র্ক–সিমকোতে লিবারেলদের জয় পাওয়া কঠিন। তবে তারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ভোটের ব্যবধান কতটা কমাতে পারে, সেটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বর্তমানে ১২৪ সদস্যের অন্টারিও আইনসভায় স্পিকার ডোনা স্কেলিসহ পিসি পার্টির সদস্য রয়েছেন ৭৮ জন। এনডিপির ২৬ জন, লিবারেলদের ১৪ জন, গ্রিন পার্টির দুজন এবং স্বতন্ত্র এমপিপি রয়েছেন দুজন। স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট ও ইয়র্ক–সিমকো আসন এখন শূন্য। ৪ আগস্ট নিল লামসডেন পদত্যাগ করলে পিসি সদস্যসংখ্যা ৭৭-এ নেমে আসবে এবং শূন্য আসনের সংখ্যা হবে তিনটি।

উপনির্বাচনে সচরাচর সরকার বদলায় না, কিন্তু বদলে যাওয়া জনমনের আভাস পাওয়া যায়। তাই এই উপনির্বাচনকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ভোটাররা সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে কীভাবে দেখছেন, বিরোধী দলগুলো কতটা সংগঠিত এবং প্রদেশের রাজনীতিতে কোন দল কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলতে পারে এই তিন নির্বাচনের ফলাফলে।


Back to top button