সম্পাদকের পাতা

বিচেস–ইস্ট ইয়র্কের উপনির্বাচনে এনডিপির প্রার্থী হতে পারেন মাইক লেইটন

নজরুল মিন্টো

টরন্টোর রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘লেইটন’ নামটি উচ্চারিত হলে আজও অনেকের মনে জেগে ওঠে কমলা রঙের এক ঢেউ। সেই ঢেউয়ের সামনে একসময় ভেঙে পড়েছিল বহু পুরোনো রাজনৈতিক হিসাব। মানুষের কাছে গিয়ে আশার কথা বলা এবং সাধারণ মানুষের রাজনীতিকে সামনে আনার মধ্য দিয়ে জ্যাক লেইটন এনডিপিকে পৌঁছে দিয়েছিলেন ইতিহাসের সর্বোচ্চ উচ্চতায়। তাঁর মৃত্যুর দেড় দশক পর সেই পরিচিত নামটি আবারও আলোচনায় এসেছে।

এবার আলোচনার কেন্দ্রে জ্যাক লেইটনের ছেলে, টরন্টোর সাবেক সিটি কাউন্সিলর মাইক লেইটন। আসন্ন বিচেস–ইস্ট ইয়র্ক ফেডারেল উপনির্বাচনে এনডিপির প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন ৪৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতা ঘিরেই টরন্টোর রাজনৈতিক মহলে নতুন হিসাব শুরু হয়েছে।

২০১৫ সালের পর টরন্টোর কোনো ফেডারেল আসনে জয় পায়নি এনডিপি। বর্তমানে উইনিপেগের পূর্বাঞ্চল থেকে হাউস অব কমন্সে দলটির কোনো প্রতিনিধিও নেই। পার্লামেন্টে মাত্র পাঁচটি আসন নিয়ে নতুন নেতা অ্যাভি লুইসের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ, এনডিপিকে আবার জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করা।

এই অবস্থায় মাইক লেইটনের মতো পরিচিত মুখকে প্রার্থী করতে পারলে এনডিপির জন্য তা হবে বড় রাজনৈতিক অর্জন। তাঁর রয়েছে সুপরিচিত পারিবারিক পরিচয়, দীর্ঘ পৌর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং প্রগতিশীল ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা।

অবশ্য শুধু নামের উত্তরাধিকার নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করে না। কিন্তু ‘লেইটন’ নামটি এনডিপি সমর্থকদের কাছে নিছক একটি পারিবারিক পদবি নয়। এটি অনেকের কাছে আশাবাদ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দলটির সবচেয়ে স্মরণীয় রাজনৈতিক উত্থানের প্রতীক।

মাইক লেইটনের রাজনৈতিক পরিচয়ের শুরু বাবার নাম দিয়ে হলেও নিজের অবস্থান তিনি তৈরি করেছেন দীর্ঘদিনের কাজের মধ্য দিয়ে। ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি টরন্টো সিটি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। প্রথমে ট্রিনিটি–স্পাডাইনা এবং পরে ইউনিভার্সিটি–রোজডেল এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন।

কাউন্সিলর হিসেবে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নগর পরিকল্পনা, সাইকেল লেন সম্প্রসারণ, গণপরিবহন এবং সামাজিক ন্যায্যতার পক্ষে কাজ করেছেন। নগরজীবনকে গাড়িনির্ভরতা থেকে বের করে আরও পরিবেশবান্ধব করার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। ফলে সমর্থকদের কাছে তিনি একজন প্রগতিশীল রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

মাইক লেইটন ফেডারেল রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন লিবারেল প্রার্থী তানভীর শাহনেওয়াজ।বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তানভীর দীর্ঘদিন বিদায়ী এমপি নেট এরস্কিন-স্মিথের কার্যালয়ে কাজ করেছেন। একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনোনয়ন নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি লিবারেল প্রার্থী হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদায়ী এমপির কার্যালয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। এরস্কিন-স্মিথও তাঁকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন।

ফলে সম্ভাব্য লড়াইটিতে একদিকে থাকবেন স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন কাজ করা তানভীর শাহনেওয়াজ, অন্যদিকে টরন্টোজুড়ে পরিচিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য ও সাবেক কাউন্সিলর মাইক লেইটন।

দুজনের রাজনৈতিক শক্তির উৎসও ভিন্ন। তানভীরের পক্ষে থাকবে লিবারেলদের শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান এবং বিদায়ী এমপির বিপুল জনসমর্থনের উত্তরাধিকার। মাইক লেইটনের পক্ষে কাজ করতে পারে তাঁর নিজস্ব পরিচিতি, পৌর রাজনীতির অভিজ্ঞতা এবং লেইটন পরিবারের প্রতি এনডিপি সমর্থকদের আবেগ।

১৯৮৮ সালে নির্বাচনী এলাকা গঠিত হওয়ার পর বিচেস–ইস্ট ইয়র্কে এনডিপি মাত্র দুবার জয় পেয়েছে। সর্বশেষ জয়টি আসে ২০১১ সালে। জ্যাক লেইটনের নেতৃত্বে সৃষ্টি হওয়া ঐতিহাসিক ‘অরেঞ্জ ওয়েভ’-এর সময় ম্যাথিউ কেলওয়ে লিবারেলদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিটি দখল করেছিলেন।

কিন্তু ২০১৫ সালে নেট এরস্কিন-স্মিথ আসনটি আবার লিবারেলদের হাতে ফিরিয়ে আনেন। এরপর টানা চারবার জয়ী হয়ে তিনি এখানে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে এরস্কিন-স্মিথ ৬৭ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। বিপরীতে এনডিপির ভোট নেমে আসে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশে। ২০২১ সালের নির্বাচনে দলটির প্রাপ্ত ভোট ছিল ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ এনডিপিকে শুধু লিবারেল প্রার্থীকে মোকাবিলা করলেই চলবে না, নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ভোটও বড় পরিসরে ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এখনো বিচেস–ইস্ট ইয়র্কের উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেননি। আইন অনুযায়ী আসনটি শূন্য ঘোষণার ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আহ্বান করতে হবে। সে হিসাবে উপনির্বাচন ঘোষণার শেষ সময় ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি। নির্বাচন ঘোষণার পর ৩৬ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে ভোট গ্রহণ করতে হবে।

মাইক লেইটন যদি প্রার্থী হন, তাহলে বিচেস–ইস্ট ইয়র্কের উপনির্বাচন আর একটি শূন্য আসন পূরণের সাধারণ লড়াই থাকবে না। সেটি হয়ে উঠতে পারে লিবারেলদের শক্ত ঘাঁটি রক্ষার পরীক্ষা, এনডিপির টরন্টোয় ফিরে আসার প্রচেষ্টা এবং নতুন প্রজন্মের হাতে লেইটন পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তুলে নেওয়ার এক নাটকীয় অধ্যায়।

Sources: Toronto Star, Elections Canada


Back to top button