সম্পাদকের পাতা

বিশ্বকাপে অর্থের ছড়াছড়ি, কে কত ডলার পেলেন

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপের পুরস্কার বলতে দর্শকের চোখে সোনালি ট্রফিটিই সবচেয়ে বড়। কিন্তু পুরস্কার বিতরণের আলো ঝলমলে মঞ্চের আড়ালে রয়েছে কোটি কোটি ডলারের প্রাইজমানি, পদক, ব্যক্তিগত সম্মাননা, স্মারক আংটি, দলীয় বোনাস ও স্পন্সরদের নানা প্রণোদনা। এই বিপুল পুরস্কারের ভাগ পেয়েছে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল। এমনকি প্রথম পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলোও খালি হাতে ফেরেনি।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন। ২০১০ সালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোলে প্রথমবার বিশ্বজয়ের যে উৎসব করেছিল দেশটি, ১৬ বছর পর ফেরান তোরেসের গোলে ফিরে এসেছে সেই আনন্দ। এবার ফলাফল ও অংশগ্রহণ বাবদ স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের ঘরে যাচ্ছে ৫ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রস্তুতি সহায়তার আরও ২৫ লাখ ডলার যোগ করলে স্পেনের মোট প্রাপ্তি দাঁড়ায় ৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে চার বছরের ব্যবধানে চ্যাম্পিয়ন দলের মোট প্রাপ্তি বেড়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার।

তবে এই অর্থ রদ্রি, লামিন ইয়ামাল কিংবা অন্য খেলোয়াড়ের হাতে সরাসরি তুলে দেয়নি ফিফা। অর্থটি পাবে রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন। সেখান থেকে টুর্নামেন্টের ব্যয়, খেলোয়াড়দের বোনাস, কোচিং ও সহায়ক কর্মীদের প্রাপ্য এবং ফুটবল উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থ বণ্টন করা হবে।

স্পেনের অধিনায়কদের সঙ্গে দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের আগেই বোনাস চুক্তি হয়েছিল। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ জয়ের জন্য দলের প্রত্যেক খেলোয়াড় কর দেওয়ার আগে প্রায় সাড়ে সাত লাখ ইউরো করে পেতে পারেন। চুক্তি অনুযায়ী ফিফার প্রাইজমানির ৪৫ শতাংশ খেলোয়াড় ও দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টনের কথা রয়েছে। সেই হিসাবে তাঁদের জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ ডলার। খেলোয়াড়, কোচ ও সহায়ক দলের সদস্যদের মধ্যে এই অর্থ কীভাবে ভাগ করা হবে, তার ওপর প্রত্যেকের প্রাপ্তির চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ভর করবে।

স্বর্ণপদকের সঙ্গে স্পেনের খেলোয়াড়েরা পেয়েছেন এমন একটি পুরস্কার, যা বিশ্বকাপে আগে কখনও দেওয়া হয়নি। উত্তর আমেরিকার এনএফএল, এনবিএ, মেজর লিগ বেসবল ও এনএইচএলে চ্যাম্পিয়নদের বিশেষ আংটি দেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। আয়োজক দেশের সেই সংস্কৃতিকে ফুটবলের সঙ্গে মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপজয়ীদের জন্য প্রথমবারের মতো ‘চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’ চালু করেছে ফিফা।

স্পেনের খেলোয়াড় ও কোচিং দলের জন্য তৈরি করা হচ্ছে ৩০টি বিশেষ আংটি। এক পাশে থাকবে বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতীক, অন্য পাশে চ্যাম্পিয়ন স্পেনের পরিচয়। আংটিগুলো পরে প্রত্যেকের মাপ ও পরিচয় অনুযায়ী তৈরি করে দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে ২ হাজার ২৬টি ক্রমিক নম্বরযুক্ত আংটির সীমিত সংস্করণ তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৯৬টি বিশ্বব্যাপী সমর্থকদের জন্য অনুমোদিত স্মারক হিসেবে বিক্রি করা হবে। বিশ্বকাপের পদকের পাশে আমেরিকান ঘরানার এই আংটি এবারের পুরস্কার তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

স্পেন অবশ্য মূল বিশ্বকাপ ট্রফিটি চিরদিনের জন্য নিজের কাছে রাখতে পারবে না। প্রায় সাড়ে ছয় কিলোগ্রাম ওজনের ১৮ ক্যারেট সোনায় তৈরি মূল ট্রফির মালিক ফিফা। বিজয়ী দল পুরস্কার বিতরণী ও নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতায় সেটি ব্যবহার করার পর ফিফা তা ফিরিয়ে নেয়। চ্যাম্পিয়ন ফেডারেশনকে দেওয়া হয় সোনায় মোড়ানো একটি প্রতিরূপ। তবে খেলোয়াড়দের গলায় পরিয়ে দেওয়া স্বর্ণপদক এবং নতুন চ্যাম্পিয়নশিপ আংটি তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবেই থেকে যাবে।

স্পেনের পর সবচেয়ে বড় অঙ্ক পেয়েছে রানার্সআপ আর্জেন্টিনা। ফলাফল ও অংশগ্রহণ বাবদ আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। প্রস্তুতি সহায়তার ২৫ লাখ ডলার যোগ করলে তাদের মোট প্রাপ্তি দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। খেলোয়াড়েরা পেয়েছেন রৌপ্যপদক। ২০২২ সালে রানার্সআপ ফ্রান্স পেয়েছিল ৩ কোটি ডলার।

তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ইংল্যান্ড ফলাফল ও অংশগ্রহণ বাবদ পেয়েছে ৩ কোটি ডলার এবং খেলোয়াড়েরা পেয়েছেন ব্রোঞ্জপদক। প্রস্তুতি সহায়তাসহ দেশটির মোট প্রাপ্তি ৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। চতুর্থ হওয়া ফ্রান্স পেয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার; প্রস্তুতি সহায়তাসহ তাদের মোট প্রাপ্তি ৩ কোটি ৫ লাখ ডলার। পঞ্চম থেকে অষ্টম স্থানে থাকা প্রতিটি দল পেয়েছে ২ কোটি ডলার, নবম থেকে ষোড়শ স্থানের প্রতিটি দল ১ কোটি ৬০ লাখ, ১৭তম থেকে ৩২তম স্থানের দলগুলো ১ কোটি ২০ লাখ এবং ৩৩তম থেকে ৪৮তম স্থানের প্রতিটি দল পেয়েছে ১ কোটি ডলার।

এর বাইরে বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য ৪৮টি দলের প্রত্যেককে আরও ২৫ লাখ ডলার দিয়েছে ফিফা। ফলে প্রথম পর্বে বিদায় নেওয়া একটি দেশও অন্তত ১ কোটি ২৫ লাখ ডলার নিয়ে ফিরেছে। ২০২২ সালে ৩২ দলের কাতার বিশ্বকাপে ফলাফলভিত্তিক মোট প্রাইজমানি ছিল ৪৪ কোটি ডলার। এবার ৪৮ দলের প্রতিযোগিতায় দলগুলোর জন্য অর্থ ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার মোট বরাদ্দ বেড়ে প্রায় ৮৭ কোটি ১০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।

দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি বিশ্বকাপের মঞ্চে কিছু খেলোয়াড় পেয়েছেন ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। স্পেনের খেলার গতি ও ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে দলকে শিরোপা এনে দেওয়া রদ্রি জিতেছেন সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল। ২০২২ সালে এই পুরস্কার উঠেছিল আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির হাতে। চার বছর পর মেসির চোখের সামনে সেই সম্মান গেল তাঁর প্রতিপক্ষ অধিনায়কের কাছে।

ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ১০ গোল করে জিতেছেন গোল্ডেন বুট। ২০২২ সালে আট গোল করেও তিনিই সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে দুইবার গোল্ডেন বুট জয়ের অনন্য কীর্তি গড়লেন এমবাপ্পে। তাঁর দল চতুর্থ হলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারাবাহিক গোলদাতার স্বীকৃতি নিয়ে ফিরছেন।

স্পেনের উনাই সিমন পেয়েছেন সেরা গোলরক্ষকের গোল্ডেন গ্লাভস। পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে। প্রতিপক্ষের আক্রমণের সামনে শেষ প্রহরী হয়ে দাঁড়ানো সিমনের হাতে তাই উঠেছে গোলরক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মান। ২০২২ সালে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।

সেরা তরুণ খেলোয়াড় হয়েছেন স্পেনের পাউ কুবারসি। চার বছর আগে কাতারে একই পুরস্কার পেয়েছিলেন আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ। বিশ্বকাপের এই পুরস্কারটি কেবল একটি টুর্নামেন্টের স্বীকৃতি নয়; অনেক সময় এটি ভবিষ্যতের বড় তারকার আগমনী বার্তাও দেয়। ২০১৮ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পে সেরা তরুণের পুরস্কার পেয়েছিলেন, পরে তিনিই টানা দুই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জিতলেন।

খেলোয়াড়সুলভ আচরণ, শৃঙ্খলা এবং প্রতিপক্ষ ও রেফারির প্রতি সম্মানের জন্য ফিফা ফেয়ার প্লে পুরস্কার পেয়েছে নেদারল্যান্ডস। ২০২২ সালে পুরস্কারটি পেয়েছিল ইংল্যান্ড।

স্পেনের খেলোয়াড়দের প্রাপ্তির গল্প এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপজয়ী দলকে বরণ করে নিতে মাদ্রিদে আয়োজন করা হয়েছে রাজকীয় ও সরকারি সংবর্ধনা এবং বিজয় শোভাযাত্রা। সোমবার দেশে ফেরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের স্বাগত জানাতে বিপুলসংখ্যক সমর্থক মাদ্রিদের পথে নেমেছেন। তবে স্প্যানিশ সরকার বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আলাদা নগদ পুরস্কার কিংবা মূল্যবান উপহারের নিশ্চিত ঘোষণা প্রতিবেদনটি তৈরির সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

স্পেনের খেলোয়াড়েরা ব্যক্তিগত স্পন্সরদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত অর্থ বা উপহার পেতে পারেন। কোনো খেলোয়াড়ের চুক্তিতে বিশ্বকাপ জয়, গোল্ডেন বল, গোল্ডেন বুট কিংবা নির্দিষ্টসংখ্যক গোলের জন্য আলাদা বোনাস থাকতে পারে। বিশ্বকাপ জয়ের পর তাঁদের বিজ্ঞাপনমূল্য ও নতুন চুক্তির অঙ্কও বাড়তে পারে। তবে এসব চুক্তি সাধারণত ব্যক্তিগত ও গোপনীয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ঘোষণা না করা পর্যন্ত সেগুলোর নির্দিষ্ট অঙ্ক জানা যায় না।

এই বিশ্বকাপের অর্থ খেলোয়াড় ও জাতীয় ফেডারেশনেই থেমে থাকছে না। বাছাইপর্ব এবং মূল প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড় ছেড়ে দেওয়া ক্লাবগুলোর জন্য ফিফা আলাদা করে ৩৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ক্লাব বেনিফিটস তহবিল রেখেছে। অর্থাৎ রদ্রি, ইয়ামাল কিংবা এমবাপ্পেকে বিশ্বমঞ্চে পাঠানো বর্তমান ক্লাব এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব ক্লাবের হয়ে তাঁরা খেলেছেন, সেসব ক্লাবও খেলোয়াড় গড়ে তোলার স্বীকৃতি হিসেবে অর্থ পাবে।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান পুরস্কারটির কোনো দাম লেখা থাকে না। সেটি হলো নামের পাশে চিরদিনের জন্য যুক্ত হওয়া একটি পরিচয়: বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। অর্থ একদিন খরচ হয়ে যাবে, পদকের রংও সময়ের সঙ্গে ম্লান হতে পারে; কিন্তু সেই পরিচয় থেকে যাবে ফুটবলের ইতিহাসে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

তথ্যসূত্র: ফিফা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স।


Back to top button